বিপিএলের ঢাকে কাঠি পড়ছে আজ থেকে। বছর ঘুরে আবারো ফিরে এসেছে আসরটি। এবার মাঠে গড়াচ্ছে চতুর্থ কিস্তি। শিরোপা জয়ের রেসে সাত ফ্র্যাঞ্চাইজি দল। গত আসরের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস, বরিশাল বুলস, ঢাকা ডায়নামাইটস, রংপুর রাইডার্স, চিটাগং ভাইকিংসের সঙ্গে এবার নতুন দুটি দল রাজশাহী কিংস ও খুলনা টাইটানস। এদের মধ্যে কার মুখে ফুটবে শেষ হাসি? জবাবটা সময়সাপেক্ষ হলেও নাফিসা কামালের চোখে এবারের চ্যাম্পিয়ন— কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস!
‘উইন অর উইন’ অর্থাৎ ‘জয় অথবা জয়’— এমন স্লোগান নিয়েই বিপিএলের গত আসরে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস। সেবার দলটির মূল আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের সীমিত ওভারের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতুর্জাকে ঘিরে। প্লেয়ার্স ড্রাফটে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়ে ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লায় পাড়ি জমান মাশরাফি। লিগের প্রথম দুই আসরে যার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল ঢাকা, সেই মাশরাফির হাতে দলের দায়িত্বভার তুলে অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন ভিক্টোরিয়ানসের কর্ণধার নাফিসা কামাল।
একদিকে মাশরাফির সামনে টানা তিনবার শিরোপা জয়ের হাতছানি, অন্যদিকে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে ‘ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস’ থেকে ‘ঢাকা ডায়নামাইটস’-এ রূপান্তরিত হওয়া ঢাকার শিরোপা অক্ষুণ্ন রাখার চ্যালেঞ্জ— বিপিএল থ্রির ডামাডোলে এ যেন বাড়তি উন্মাদনার রসদ। অবশ্য শেষ অবধি জয়ের হাসি ফুটে উঠেছিল মাশরাফির মুখেই। ফাইনালে বরিশাল বুলসকে ৩ উইকেটে হারায় ভিক্টোরিয়ানস। চওড়া মুখের হাসিতে ‘ম্যাশ’ হয়ে ওঠেন বিপিএলের একমাত্র অধিনায়ক, যিনি টানা তিন আসরেই তুলে নিলেন শিরোপা জয়ের স্বাদ।
কিন্তু এ পথের শুরুটা মোটেও মধুর ছিল না। বাড়তি ব্যাটসম্যান, নাকি বোলার— শুরুর দিকে দলীয় একাদশে সঠিক সমন্বয় ঘটাতে এমনই গোলকধাঁধায় বন্দি থাকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটি। বাড়তি একজন ব্যাটসম্যান খেলাতে গেলে কাটা পড়ত একজন বোলার। আবার পাঁচজন বোলার নিয়ে খেলতে গেলে ব্যাটিং লাইনআপে পাওয়া যেত ছয় ব্যাটসম্যানকে। মাঝে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার আসহার জাইদির উত্থানে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় মাশরাফিরা।
তাই এবারের আসরে সেই ভুল থেকে মুক্তি পেতে প্রায় এক মাস আগে থেকে খেলোয়াড়দের নিয়ে বিকেএসপির মাঠে কন্ডিশনিং ক্যাম্প করেছেন ভিক্টোরিয়ানস কোচ মিজানুর রহমান বাবুল। দেশী-বিদেশী খেলোয়াড়ের মধ্যে হূদ্যতা গড়ে তোলার পাশাপাশি দলের সঠিক কম্বিনেশন অন্বেষণ করে যাচ্ছেন তিনি। ‘সেরা একাদশে খেলবে— এমন চারজন দেশী খেলোয়াড়কে নিয়ে আমরা কন্ডিশনিং ক্যাম্প করেছি। কিন্তু বিদেশী ও জাতীয় দলে যারা খেলেন, তাদের সবাইকে একসঙ্গে পাইনি। মাত্র দুদিন হলো, পুরো দলকে একসঙ্গে পেয়েছি। এখান থেকে কম্বিনেশনটা গড়তে শুরু করব। ভালো ফলাফলের জন্য একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিটা খুব দরকার’— কথাগুলো বললেন কোচ বাবুল।
গতবার অনেকটা সমন্বয়হীন ও গড়পড়তা দল নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় এবার শিরোপা ধরে রাখার চাপ অনুভব করছেন ভিক্টোরিয়ানস কোচ ও দলের সব খেলোয়াড়। অবশ্য এ চাপটাকে আনন্দচিত্তেই গ্রহণ করেছে পুরো দল। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে শিরোপা ধরে রাখা সম্ভব হবে বলেই মনে করেন বাবুল, ‘গতবারের চ্যাম্পিয়ন বলেই তা ধরে রাখার বাড়তি একটা চাপ আছে, যার সিংহভাগই রয়েছে আমার কাঁধে। তাছাড়া খেলোয়াড়দের ওপরও রয়েছে প্রত্যাশার বাড়তি চাপ। যদিও কোচিং স্টাফ বা খেলোয়াড়দের এগুলো নিয়েই কাজ করতে হয়। এটা এমন কোনো ব্যাপার না। পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করে যেতে পারলে শিরোপা ধরে রাখা সম্ভব।’
সাম্প্রতিক সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটের সেরা পারফর্মারদের নিয়ে দল গুছিয়েছে কুমিল্লা। মাশরাফির চৌকস নেতৃত্বের সঙ্গে ইমরুল, লিটন, আল-আমিন জুনিয়রদের মতো ইনফর্ম ক্রিকেটারদের উন্মেষ ঘটিয়েছে তারা। তাই শিরোপা ধরে রাখার মিশনে দেশী খেলোয়াড়দের ওপরই পুরো আস্থা কোচ বাবুলের। অন্যদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজির কর্ণধার নাফিসা কামালের মুখে শোনা গেল উল্টো সুর। গতবারের চেয়েও এবার কম চাপ অনুভব করছেন বলে জানান তিনি। নাফিসার ভাষায়, ‘এবার আমাদের চাপ কম। কারণ গতবার যে ভুলত্রুটি করেছি, তা শুধরালেই চলবে। দেশী-বিদেশী দুটোতেই আমার অনেক পুরনো খেলোয়াড় আছে। তাই একটা স্বস্তির জায়গা আছে।’
প্রথম দুই আসরে সিলেট রয়্যালসের হয়ে সাফল্যের মুখ না দেখলেও বাবা লোটাস কামালের অনুপ্রেরণায় ক্রিকেটের নিজ জন্মভিটা কুমিল্লার ফ্র্যাঞ্চাইজি গ্রহণ করেন নাফিসা। নিজের পরিচয় নিয়ে নাফিসা বলেছিলেন, ‘আমি কুমিল্লার মেয়ে, দাদার বাড়ি কুমিল্লায়।’ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নাম অনুসারে দল গড়লেন ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস’। সত্যিই ভিক্টোরিয়ানসই বটে, তা না হলে প্রথম আসরেই এত সাফল্য যে পায়নি আর কোনো দল!






