বণিক বার্তা ও নভোএয়ারের উদ্যোগে ‘দেশীয় এয়ারলাইনসের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০ ডিসেম্বর ২০১৬। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্রোড়পত্র আকারে উপস্থাপন করা হলো—
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের এভিয়েশন খাতের পথচলা শুরু বাংলাদেশ বিমানের হাত ধরে। এর পর বাংলাদেশের স্থানীয় বেসরকারি এভিয়েশনের যাত্রা এবং তা প্রায় এক দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী এয়ারলাইনস ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয় সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে। বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী এভিয়েশন ব্যবসার ২০ বছরের যাত্রায় এ পর্যন্ত মোট নয়টি এয়ারলাইনস কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়। তবে অপেশাদারি মনোভাব, পুরনো উড়োজাহাজ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পরিকল্পনা, এভিয়েশন ব্যবসায় অনভিজ্ঞতা, দুর্বল পরিচালনা, প্রতিকূল সরকারি নীতিসহ নানা প্রতিকূলতায় কৈশোর পেরোনোর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ছয়টি এয়ারলাইনস। চালু থাকা রিজেন্ট, নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও ব্যবসায়িকভাবে এখনো সুবিধা করতে পারেনি। তারা অনেক চেষ্টা করছে স্থানীয় বাজারে ভালো করতে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ভালো করার একটা চেষ্টা অব্যাহত আছে। কিন্তু তাদের কিছু সমস্যা রয়েছে। সে বিষয়গুলো নিয়েই মূলত আজকের আলোচনা। আশা করছি, এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথগুলো আরো স্পষ্ট হবে।
আমাদের মাঝে আজ উপস্থিত আছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জনাব রাশেদ খান মেনন, এমপি। তিনি বেশ উত্সাহের সঙ্গে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। কেননা তিনি চাইছেন সরাসরি উপস্থিত থেকে এভিয়েশন খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিতপূর্বক তা সমাধানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।
আমি বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। যারা আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন, তারা সবাই কথা বলবেন। উপস্থিত সবাই এভিয়েশন খাতে যুক্ত আছেন বহুদিন থেকে। আজ দুটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপিত হবে। জনাব নজরুল ইসলাম প্রথমে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করবেন। পরবর্তীতে জনাব মফিজুর রহমান, নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিনি একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করবেন।
নজরুল ইসলাম
অভ্যন্তরীণ সিভিল এভিয়েশন খাতের ৪৫ বছর হয়েছে। আর যদি পুরো সিভিল এভিয়েশন খাতের কথা বলি, তবে সেটি ১৯১৯ সালে যাত্রা করে। সেটি এখনো ১০০ বছর হয়নি। শিগগিরই তা পূর্ণ হবে। তাতে করে দেখা যায়, আমাদের এভিয়েশন খাত একেবারেই নতুন নয়। আমাদের পথ চলার অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা আমাদের এভিয়েশন খাতের পথ চলাকে দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। এক. ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯৫ এবং দুই. ১৯৯৫ থেকে চলতি সময়।
প্রথম পর্যায়ে অর্থাত্ ১৯৭২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এ দেশে এভিয়েশন মানেই ছিল বিমান। তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। মনোপলি করে রেখেছিল পুরো খাত। ব্যবস্থাপনা ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত। সেবার মান নিয়ে গর্ব করার কিছু ছিল না। উপরন্তু ফ্লাইট বাতিল, যাত্রা বিলম্ব, নিম্নমানের যাত্রীসেবা, ইউনিয়নিজম, কোটি কোটি টাকা লোকসান ইত্যাদি ছিল বিমানের ইমেজ। এ দেশে এভিয়েশন ব্যবসা নিয়ে ছিল একটা নেগেটিভ ইমেজ।
১৯৯৫ সালে বেসরকারি খাতে বিমান চলাচল শুরু হলেও যাত্রা সুখকর ছিল না। তিন লাখ অভ্যন্তরীণ যাত্রী ছিলেন তখন। এর পর ২০০৪ সালে জিএমজি যখন আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রা করে এবং ঢাকা-কলকাতা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করে, তখন অভ্যন্তরীণ যাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় লাখ। আমাদের গেজেট ছিল না তখন। আমরা অনেক কষ্টে একটি গেজেট তৈরি করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিই কীভাবে কাজ করব। এর পর জিএমজি বন্ধ হয়ে যায়। বীমা বাতিল হয়। ১৩ শতাংশ বাজার কমে যায়। পরবর্তীতে নভোএয়ার, রিজেন্ট এয়ার এবং ইউএস বাংলাসহ বিমান তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু করে। বাজারে ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমরা দেখেছি। অর্থাত্ চাহিদা আছে।
আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরতে চাই।
এয়ারলাইনসের প্রধান খরচ হলো রক্ষণাবেক্ষণে। সেখানে আমরা বেসরকারি বিমান কোম্পানিগুলো কী পেয়েছি? আমাদের জন্য কোনো হ্যাঙ্গার নেই বিমানবন্দরে। বিমানকেও দেখি নিজস্ব হ্যাঙ্গার থাকা সত্ত্বেও তারা বিদেশে যায় মেরামতের জন্য। অথচ আমাদের সেই সক্ষমতা থাকলেও নিজস্ব কোনো হ্যাঙ্গার নেই। বিদেশে বিমান মেরামত করাতে আমাদের খরচ অনেকাংশে বেড়ে যায়।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ উড়োজাহাজ আমদানি। এইচএস কোড ৮৮০১-০২ অনুযায়ী বিভিন্ন উড়োজাহাজ আমদানিতে শুল্কহার শূন্য করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সব দেশেই পুরনো উড়োজাহাজ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনের ক্ষেত্রে ২০ বছর পুরনো যাত্রীবাহী, ৩০ বছর পর্যন্ত পণ্যবাহী ও ৩৫ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ বিমান আমদানীর অনুমতি দিয়ে একটি আদেশ জারি আছে। কিন্তু আমদানি নীতিতে বা কোনো এসআরও দ্বারা পুরনো উড়োজাহাজ আনার ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন নেই, সেহেতু ক্যাবের আদেশবলে আমদানিকৃত উড়োজাহাজ ছাড় করাতে একটি জটিল প্রক্রিয়ায় যেতে হয়। এতে অনেক ব্যয় বাড়ে।
এইচএস কোড ৮৮০৩ অনুযায়ী, বিভিন্ন উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও এইচএস কোড ৮৪০৭ অনুযায়ী বিমানের ইঞ্জিন আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে এইচএস কোড ৮৪.০৯.১০-এর মাধ্যমে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ছাড় করাতে এইচএস কোড ৮৮০৩ প্রয়োগ ভিন্নভাবে প্রবাহিত করা হয়। কাস্টমস জানে যে, বিমানের যন্ত্রাংশ অন্য কোথাও ব্যবহার করা হয় না, তার পরও তারা আমাদের হয়রানি করে।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ বিমানের যন্ত্রাংশ ত্বরিত ছাড় করা। বিমানের যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় বিভিন্ন সময়। তখন আমাদের বিমানগুলো সার্ভিসে থাকে না। যাকে আমরা বলি এওজি (এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড)। সারা বিশ্বে এওজিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কাস্টমস জটিলতায় তা ছাড় পেতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যাত্রীদের আস্থা নষ্ট হয়।
প্রশিক্ষণ একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। অথচ আমাদের দেশে কমার্শিয়াল পাইলট ৬০০ জন। লাইসেন্সড ইঞ্জিনিয়ার আরো কম। আমাদের একাডেমিক দুর্বলতা আছে। আমাদের এভিয়েশন সেক্টরে বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নেই। বিমানের একটি ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি আছে কিন্তু সেটি না থাকার মতোই।
ফ্লাইং একাডেমিতে যে ফুয়েল ব্যবহার করা হয়, সেটির দাম লিটারপ্রতি ২৫০ টাকা। এটি সাধারণ জেট ফুয়েলের থেকে চার গুণ। প্রশিক্ষণ বিমানের ক্ষেত্রে এখনো ভ্যাট চালু আছে।
ক্যাবের চার্জ একটি চ্যালেঞ্জ। ভারতসহ অনেক দেশেই দেশী এয়ারলাইনসগুলোর স্বার্থে এ চার্জ ভিন্ন। কোনো কোনো দেশে আবার ছাড় দেয়া হয়। সম্প্রতি ক্যাবের বিভিন্ন চার্জের ওপর ভ্যাট আরোপ করার সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে। এটি হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
মফিজুর রহমান

‘দেশীয় এভিয়েশন খাতের বর্তমান সমস্যা এবং সম্ভাবনা’ শীর্ষক বিষয়টি খুবই সময়োপযোগী। আমি আগের বক্তার সঙ্গে মিলিয়ে কিছু সম্পূরক বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।
বাংলাদেশে বেসরকারি এভিয়েশনের দুই দশকের অভিযাত্রা। আমাদের অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লা বেশি ভারী। এই দায়ভার সম্মিলিতভাবে সবারই। যাত্রার শুরুতে আমরা যে সমস্যায় নিমজ্জিত ছিলাম, যাত্রার দুই দশক পরও একই সমস্যার চোরাবালিতে নিমজ্জিত। বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রোগ্রামে বহুল আলোচিত। আমাদের কিছু আন্তরিক উদ্যোগের অভাবে যে তিমিরে আমরা ছিলাম, এখনো তা-ই আছি। আমাদের দেশীয় এয়ারলাইনসে সমস্যা বহুমুখী। কিন্তু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এর সমাধান জরুরি। তাই আমার বক্তব্য শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য করণীয় সুপারিশগুলোর ওপর সীমিত রাখতে চাই।
ভার্জিন এয়ারলাইনসের সিইও স্যার রিচার্ড ব্র্যানসনের একটি উক্তি উল্লেখ করে বলতে চাই, ‘আপনি যদি বিলিয়নেয়ার থেকে মিলিয়নেয়ার হতে চান, তাহলে নতুন একটি এয়ারলাইনস চালু করুন।’ কথাটি হয়তো হাস্যকর কিন্তু আমরা জানি, এয়ারলাইনস খাত যতই জৌলুসপূর্ণ মনে হোক না কেন, পৃথিবীর খুব কম এয়ারলাইনসই লাভের মুখ দেখেছে। যদি সারা বিশ্বের কথা বলি, তাহলে বলতে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং ও রিয়েল এস্টেট হচ্ছে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় খাত, এর পরই এয়ারলাইনস। কিন্তু রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্টের ইনডেক্সে ৫০টি খাতের মধ্যে এয়ারলাইনস হলো ৪৯তম। আর আমাদের দেশের এয়ারলাইনসগুলো পরিচালনার জন্য ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যা প্রকট। বিশেষত আমাদের এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের হ্যাঙ্গার নেই। এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পর্কিত। কিন্তু এই অতি আবশ্যক বিষয়ই ‘বাংলাদেশ বিমান’ ব্যতীত বাংলাদেশের অন্য বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর নেই। ফলে সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি পড়ছে হুমকির মুখে। এটি সমাধানের জন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু অবকাঠামোগত সমস্যাই নয়, আর্থিক সাহায্যের দিক থেকেও বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো অনেক পিছিয়ে।
পৃথিবীর যেকোনো বিমানবন্দরে লাউঞ্জ স্থাপনের জন্য এয়ারলাইনস সবার আগে অগ্রাধিকার পায়, শুধু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিভিন্ন ব্যাংক তাদের প্রায়োরিটি কাস্টমারদের সেবা দেয়ার জন্য বিমানবন্দরে লাউঞ্জ স্থাপনের সুবিধা পেলেও বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকে কোনো স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মনোভাব বিমাতাসুলভ।
আমাদের দেশে বিমানবন্দরে ইন্টারন্যাশনাল টু ইন্টারন্যাশনাল যাত্রীদের ট্রানজিট সুবিধা থাকলেও ইন্টারন্যাশনাল টু ডোমেস্টিক, ডোমেস্টিক টু ডোমেস্টিক ট্রানজিটে যাত্রীদের জন্য ডেডিকেটেড সংযোগ সুবিধা নেই। মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশ থেকে ওয়ার্কাররা যখন ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালে এসে নামেন, তখন ডোমেস্টিক টার্মিনালে আসতে হলে তাকে পুরোটা সময় জিনিসপত্র নিয়ে হেঁটে আসতে হয়, কোনো সংযোগ এখানে নেই।
যদি অসম প্রতিযোগিতার কথা বলি, তাহলে বলতে হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’-এর সঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনস সংস্থাগুলো এক বিরাট ও অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। ‘বাংলাদেশ বিমান’ রাষ্ট্রের দেয়া ভর্তুকিতে দুই যুগ আগের ভাড়ায়ও যাত্রী পরিবহন করতে পারে। কিন্তু বাস্তব কারণেই বেসরকারি এয়ারলাইনস সংস্থাগুলো তা পারে না। এটি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভাবা উচিত। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে বেসরকারি এয়ারলাইনস সংস্থাগুলোকে এই অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং সেসঙ্গে ভর্তুকিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আর নিয়মের অসামঞ্জস্যতার কথা বলা উচিত। নিয়মনীতির ক্ষেত্রে সবার জন্যই সমান একটি ধরন প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শুল্ক ও কাস্টমসের কিছু জটিলতা রয়েছে। এইচএস কোড নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি এ বিষয়ে একটি উদাহরণ দেব। উড়োজাহাজে সেন্ট্রাল ডিসপ্লে ইউনিট নামে ৬ ইঞ্চি অথবা ৮ ইঞ্চির একটি যন্ত্র আছে। এইচএস কোড ৮৮০৩-৩০-০০-এর আওতায় আমি শুল্কবিহীনভাবে যন্ত্রাংশটি আমদানি করতে পারি। কিন্তু কাস্টমসের হয়রানিতে অনেক সময় আমাদের শুল্ক দিতে হয়। এসব বিষয় এভিয়েশন খাতের পথচলায় বাধার সৃষ্টি করছে।
আমাদের বিমানবন্দরের পরিসর বাড়ছে। পাঁচ বছর আগেও প্রতিদিন গড়ে ৩৫-৪০টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করত। এখন তা ২৫০তে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের বিমানবন্দরের চার্জ অনেক বেশি। আমাদের উন্নয়নকে নিজেরাই লাগাম টেনে ধরে বসে আছি।
কাজী ইকবাল করিম
আমাদের পরিধি বাড়ছে। মানুষ আকাশপথে যাত্রা করতে এখন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তিন বছর আগে ডোমেস্টিক যাত্রী সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার, যা এখন বেড়ে হয়েছে ৬০ হাজার। ৬০ শতাংশ বিমান চলাচল করছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। আমাদের ডোমেস্টিক এয়ারলাইনস এখন চারটি। কিছু বন্ধ হয়ে গেছে; আশা করছি, তারা আবার ফিরে আসবে। আমাদের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, যেমন— রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, ট্যাক্সিওয়ে, নেভিগেশন ও ট্রাফিক সিস্টেম।
সম্প্রতি আমাদের নিরাপত্তা ইস্যুটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের সিসিটিভির অপ্রতুলতা আছে। আমাদের বিমানবন্দরের মেটাল ডিটেক্টরগুলো পুরনো। লাউঞ্জ ফ্যাসিলিটির মান অনেক নিম্ন। স্ক্রিনিং সিস্টেম দুর্বল। আমাদের কার্গো ভিলেজে কার্গো হারানোর রেকর্ড অনেক বেশি। আমরা আমাদের বাজার হারাচ্ছি। ইউরোপ আমাদের জন্য বাজার বন্ধ করে দিয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মিত হবে এবং শাহজালাল-কেন্দ্রিক ট্রাফিক বাড়বে। কিন্তু শাহজালাল শিগগিরই সক্ষমতা হারাবে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। এটি যত দ্রুত সম্ভব করতে হবে। অন্যান্য বিমানবন্দরে হ্যাঙ্গার গড়ে তুলতে হবে।
মো. ফাইজুর রহমান
আমাদের একটি নীতিমালা আছে। আমরা সেটি মেনে কাজ করি। আপনাদের যত অভিযোগ আছে, সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখব। আমরা এসআরও করেছি টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে। এভিয়েশনের ক্ষেত্রে আমরা এসআরও করি না। তবে আপনাদের অভিযোগের বিষয়ে বলতে পারি, এটি অভ্যন্তরীণ ভ্যাটের বিষয়। তবে ৩০ বছরের পুরনো বিমান আমদানিতে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আপনাদের সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরা হবে।
ইমরান আসিফ
আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা আছে। বড় বিমান আমদানির ক্ষেত্রে রাখার একটি বিষয় আছে। আমাদের হ্যাঙ্গারের অপ্রতুলতা আছে। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীয়া বিনিয়োগ করতে চাইলেও আমাদের ডিমান্ড মিট করে না। স্পেস বন্ড বাংলাদেশ বিমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটি প্রাইভেট এয়ারলাইনসের জন্যও করতে হবে।
আমাদের ক্যাড-২-এর অপারেশন ক্লিয়ার না করার ফলে আমরা চীনে কাজ করতে পারছি না। রেগুলেশন অ্যাডপ্ট না করায় চীনে আমরা আমাদের বিমান ব্যবসা শুরু করতে পারছি না। অথচ চীনের দুটি কোম্পানি আমাদের দেশে একচেটিয়া ব্যবসা করছে। টাইম ফ্রেম থাকতে হবে। লক্ষ্য থাকতে হবে। আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর এ বিষয়ে অদক্ষতা আছে। বিমান ও প্রাইভেট এয়ারলাইনসগুলো একসঙ্গে কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এ বিষয়গুলো মন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করি, আপনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।
কাজী ওয়াহিদুল আলম
প্রাইভেট এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতা বেড়েছে বলতেই হয়। তবে যতগুলো এখন টিকে আছে, তার থেকে ঝরে পড়ার সংখ্যা অনেক বেশি। ব্যাংকের ডিফল্টার অনেক বেশি বলে এখন ব্যাংকগুলো পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের বড় এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা অনেক বেশি বাড়াতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাদের কাজ করতে হবে। বিমান জাতীয় এয়ারলাইনস। অথচ তারা কোনো মানবসম্পদ উন্নয়ন করেনি। তারা সরাসরি নিয়োগ করেনি কোনো কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব আছে অনেক বেশি। বিমানের ডিরেক্টর ল্যাপটপ পরিচালনা করতে পারেন না— এমনও শোনা গেছে। অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করছে তাদের ভেতর। বিমান ও প্রাইভেট এয়ারলাইনসের মধ্যে সমন্বয় নেই। তারা বেশি স্বপ্ন দেখছে, অথচ তাদের ক্যাপাসিটি নেই। তারা বিনিয়োগ করেই যাচ্ছে। প্রাইভেট এয়ারলাইনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ফলে তাদের লোকসান হবে। সেলস মার্কেটিংয়ে তাদের কাজ করতে হবে। আমাদের সম্ভাবনা আছে প্রচুর কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না।
এম এ মোমেন
আলোচনা অনেকটা হয়েছে। আমাদের এভিয়েশন খাতের অনেক সমস্যাও এরই মধ্যে উঠে এসেছে। আমি আজকে আমার অনেক সহকর্মীকে এখানে দেখতে পারছি। সেক্ষেত্রে আমি তর্কে না গিয়ে একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। খাতটির জন্য তেলের দাম বরাবরই একটি সমস্যা। গতকাল আমাদের বিমানবন্দরে তেলের দাম কত ছিল, সেটি একটু জানাই। ২ দশমিক ৫৪ ডলার প্রতি গ্যালন। বেইজিংয়ে ছিল ১ দশমিক ৩৩ আর দিল্লিতে ১ দশমিক ৪২ ডলার। আমাদের ঢাকার মতো অবস্থা দু-একটি বিমানবন্দরে আছে। কেনেডি এয়ারপোর্ট এর একটি। সেখানে প্রতি গ্যালন ২ দশমিক ৫৪ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। তবে এর একটি কারণ আছে। সেখানে ফ্লাইট পরিচালনা নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। আর অতিরিক্ত অর্থ অন্য খাতে সাবসিডি দেয়া হচ্ছে।
আমাদের ৭৪৭ বিমানে তেল ধারণক্ষমতা ৩৯ হাজার গ্যালন, ৭৭৭-এ ৪৭ হাজার গ্যালন আর ৭৭৭-৮০০-এ আরেকটু বেশি। ধরা যাক, একটি বিমানের তেল ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার গ্যালন। জ্বালানির দাম ১ ডলার বেশি হলে প্রায় ৩২ লাখ টাকা আমাদের লোকসান গুনতে হয়। এক ফ্লাইটে এত টাকা লোকসান হলে বেসরকারি খাত ব্যবসায় টিকে থাকব কীভাবে!
গতকাল বা তার আগের দিন আমি পত্রিকায় দেখলাম, পদ্মা শতভাগ মুনাফা করেছে বলে বিমান ব্যাপক উদযাপন করছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, তাতে বিমান বা বাংলাদেশের জন্য কতটুকু উপকার হলো। আমাদের বিমানগুলো তো আরো লাভ করতে পারে। অর্থমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। আমাদের বিমান ১০০ টাকা মুনাফা না করে তেল কোম্পানিগুলো ১০ টাকা মুনাফা করে আর তাতে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। মাননীয় মন্ত্রী এখানে উপস্থিত আছেন। তাকে আমার প্রশ্ন, আমরা কি জানি, বিমান সামনের দিনগুলোয় কী করবে? তাদের পরিকল্পনা কি?
আমাদের বিমানের এবারের প্রজেকশন ছিল ৩৯ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করবে, কিন্তু অর্জন হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭তে বোধহয় তা একটু কম। ২৯-৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো একটি প্রজেকশন আছে।
বাংলাদেশ বিমানের দুর্দশার অন্যতম কারণ হলো বিমান মন্ত্রণালয়। মাননীয় মন্ত্রী বলতে পারেন কীভাবে? মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সেবা দিতে গিয়ে বিমানের আজকের এ অবস্থা। বিমানের গাড়ি সব মন্ত্রণালয়ই
ব্যবহার করে। আপনার অফিসের প্রিন্টারের টোনার সরবরাহ করতেও বিমানের গাড়ি ব্যবহার করা হয়। সেটি কেন হবে? এভাবে একটি সংস্থা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে না।
আমি আরেকটি বিষয় বলতে চাই, আমাদের ভিভিআইপিরা কেন কমার্শিয়াল ফ্লাইটে যাতায়াত করতে পারবেন না। তাদের জন্য কেন রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে। তারা যদি কমার্শিয়াল ফ্লাইটে চলাফেরা করতে না পারেন, তাহলে দেশের মানুষের কী সেবা করবেন তারা? তাদের জন্য যে ক্ষতি হয় বিমানের, সরকার কি কখনো পূরণ করে দেয়? দেয় না। মাননীয় মন্ত্রী, কিছু মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এবং সেগুলো আপনি সমাধান করবেন বলে আশা করি।
রাশেদ খান মেনন
ধন্যবাদ বণিক বার্তা এবং নভোএয়ারকে। তারা আজ এ বিষয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করেছে। আমার মন্ত্রিত্বকালে এই প্রথম এ রকম একটি বিষয়ে আমরা আজকে আলোচনায় বসেছি। এর প্রয়োজন অনেক আগে ছিল বলে আমি মনে করি। আপনারা বলেছেন, আমাদের প্রাইভেট এয়ারলাইনসের যাত্রা বেশি দিনের নয়। তার পরও কিন্তু কম সময়ও নয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম প্রাইভেট ফ্লাইট চালু হয়। কিন্তু তা টিকে থাকতে পারেনি।
পরবর্তীতে জিএমজি এল। তারা রমরমা ব্যবসা করেছে। কিন্তু তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা অনেক পাওনা রেখে গেছে। এসব আমাদের বহন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন বিমানবন্দরের খরচ আমাদের বহন করতে হচ্ছে। তারা দায় এড়াতে পারে না।
আমি যখন মন্ত্রিত্ব পেয়েছি, তখন আমি বলেছি বিমানকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করতে। কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিল, স্যার লস প্রজেক্ট। এখন আমাদের একদিনে ছয়-সাতটি ফ্লাইট পরিচালনা করতে হচ্ছে। আমার জেলা বরিশালে বিমানের ফ্লাইট সপ্তাহে পাঁচদিন যাচ্ছে। সৈয়দপুর, ঠাকুগাঁওয়ে প্রতিদিন ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা হচ্ছে। এ রকম আরো অনেক জেলায় ফ্লাইট পরিচালনা করতে আমাদের অনুরোধ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার এয়ারপোর্টের জরিপকাজ চলছে। ২০১৮ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হবে। আমরা সেখানে ১০ হাজার ফুট রানওয়ে তৈরির পরিকল্পনা করছি, যেখানে ওয়াইড বডির বিমান অবতরণ করতে পারবে। খান জাহান আলী এয়ারপোর্টের কাজ চলছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে রিজিওনাল হাব করার পরিকল্পনা আছে। একটি আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ আমরা করছি। সিলেটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আমরা কাজ করছি।
আলোচনায় বারবার হ্যাঙ্গারের কথা উঠে এসেছে। সেক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় হ্যাঙ্গার তৈরির কাজ চলছে। সেখানে ২০১৯ সালের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করে ফেলতে পারব।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০৩৫ সালের মধ্যে তার সক্ষমতা হারাবে। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এখন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।
আপনারা চীনের বিষয়টি আমাকে আজকে বললেন। এটি আমার জানা ছিল না। আপনারা আমাকে কখনো বলেননি। এমনকি আমার মন্ত্রণালয় থেকেও তা জানানো হয়নি। আমি জানি, দুটি চীনা এয়ারলাইনস এখানে একচেটিয়া ব্যবসা করছে। এটি আপনাদের সমস্যা নয়, এটি তো লোকবলের সমস্যা।
ক্যাড-২-এর রেগুলেশনের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আর বাকি সমস্যার বিষয়ে আমি জানি। একটি হলো হ্যাঙ্গার সমস্যা, যা আমি বলেছি। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। সিভিল এভিয়েশনের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি এবং সমস্যা সমাধান হয়েছে। হ্যাঙ্গারের সমস্যাটি বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি সমাধান হবে। আমাদের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সংযুক্তি আছে। ল্যান্ডিং খরচ সামঞ্জস্য করা হবে। এনবিআরের কর্মকর্তা সুন্দরভাবে বলেছেন, তিনি আপনাদের সমস্যার সমাধান এক সপ্তাহের মধ্যে করবেন।
আমি যখন মন্ত্রী হই, তখন আমাকে ঠাট্টা করে বলা হয়েছিল, আমাকে মরা হাতি দেয়া হয়েছে আর মরা হাতির দাম লাখ টাকা। আমি কিন্তু গত দুই বছরে এ মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছি এবং কিছুটা অগ্রগতি লাভ করেছি। আপনাদের সাহায্য নিয়ে এটি সম্ভব হয়েছে।
আমাদের প্রশিক্ষণের অভাব আছে। বাংলাদেশ বিমান আর সিভিল এভিয়েশনের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, যা অপ্রতুল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিমানের যিনি শেষ পর্যবেক্ষণ করেছেন, তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। আমাদের টেকনিক্যাল হ্যান্ড কোনোভাবেই দক্ষ নয়। আমরা বিমান বাহিনী এবং সিভিল এভিয়েশনের সমন্বয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য একমত হয়েছি।
অর্থমন্ত্রীকে বারবার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি বিষয়টি আমলে নেননি। আমরা জানি, আপনারা জ্বালানি তেলের দামের কারণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আমরাও চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি তা সমন্বয়ের জন্য। বাংলাদেশ বিমান কলকাতায় গিয়ে তেল নিয়েছে— এই রেকর্ড আছে। আপনারা বলেছেন, আমরা এমিরেটস ও ইতিহাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি। কিন্তু জ্বালানি তেলের দামের কারণে আমরা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ছি।
আমাদের বাংলাদেশ বিমানের পারফরম্যান্স ভালো ছিল। কিন্তু সেখানে সমস্যা হয়েছে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে। আপনারা বলেছেন ইউনিয়ন সমস্যা করছে। কিন্তু আমি ইউনিয়ন হ্যান্ডল করেছি। এখানে ইউনিয়ন প্রধান সমস্যা নয়। ম্যানেজমেন্ট হলো নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা। সমস্যা সমাধানে আমাদের কাজ করতে হবে এবং আমরা সেটি সমাধানে কাজ শুরু করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতকাল বলেছেন, আমাদের যদি একটু কঠিন হতে হয় আমরা হব। কর্তৃত্বপরায়ণ হতে হলেও হতে হবে।
পত্রিকাগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। এভিয়েশন খাত নিয়ে আপনারা এ রকম আয়োজন করবেন। তাতে আমাদের এভিয়েশন খাত উপকৃত হবে। কেননা গার্মেন্ট খাতের পর এই খাত একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা দেয়। আমরা সে প্রচারণা দেখতে চাই। আমরা ডেডিকেশনটা দেখতে চাই।
ফরহাদ হোসেন
আমি মানুষের সেবার বিষয়টি উত্থাপন করতে চাই। মানুষ যখন ভ্রমণ করে, তখন সে মূলত কমফোর্ট এবং আইনগত সুবিধা চায়। আমরা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা যাত্রীদের আইনগত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের দক্ষ লোকবলের অভাব আছে। আমাদের দেখতে স্মার্ট জনবল আছে, কিন্তু তারা জানে না কীভাবে আইনের আওতায় থেকে কী সেবা দেয়া যায়।
আইন অমান্য করা আর না জানা কিন্তু আলাদা বিষয়। আমাদের ৭৭৭-৭৮৭ বিমানগুলোয় আমরা ৪০ কেজি পর্যন্ত পণ্য নিতে পারব কিন্তু ৭৩৭-এ তা পারব না। সেক্ষেত্রে আমাদের অ্যাডজাস্ট করতে হবে। আমাদের যাত্রী না হলে পণ্যের পরিমাণ সমন্বয় করতে হবে। আপনি সরাসরি কথাটা বলতে পারবেন না যাত্রীদের।
আমরা সব এয়ারলাইনসকে বলেছি, আপনারা আপনার আইন মানেন। আমার আইন মানতে হবে না। নিজেদের আইন মেনে চললেই হবে। আমি আমার কর্মকর্তা তৈরি করলাম, তখন সে একেবারেই অন্য এক মানুষ। সেই একই লোক যখন বাংলাদেশ বিমানে নিয়োগ পেল, তখন সে পরিবর্তন হয়ে গেল। সে তখন যাত্রীদের সাহায্য করতে চায় না। এটি কেন হচ্ছে। আমাদের তা বের করতে হবে। আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে।
আইরিন ফারজানা
বিদেশী পাইলটের ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা আছে। আমরা ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিসার কাজটি করে থাকি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা আমাদের কাজটি করে থাকি। আমরা কাগজপত্র ঠিক থাকলে তাদের কাজ দ্রুত করে দিই। কিন্তু বেশির ভাগ সময় আমরা কাগজপত্র ঠিকভাবে পাই না। বাইরে থেকে পাইলট কাজ করতে এলে দেখা যায়, তাদের সঙ্গে অ্যাডের চাহিদার মিল নেই। বিদেশী ভাষা অনুবাদ না করে দেয়ার মতো ঝামেলা আছে। এতে আমাদের সময় বেশি লাগে। ২০১১-এর গাইডলাইন যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে বোধহয় সমস্যা থাকে না।
শাকিল মেরাজ
বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশের বয়স সমান। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজো কাজ করে যাচ্ছে। দেশের সেবায় তারা কাজ করছে। নিজস্ব বিমান ছাড়াই যাত্রা করে ২ হাজার ৪০০ জনবল নিয়ে, যারা পিআইএ থেকে এসেছিল। তারাই কিন্তু আজকের বিমানকে এখানে এনেছে। আমি আরেটি বিষয় বলতে চাই, বিমানের লোকগুলোই কিন্তু প্রাইভেট এয়ারলাইনসে গিয়ে কাজ করছে সাফল্যের সঙ্গে।
এয়ারলাইনসের অন্যতম বিষয় হলো সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি। আমাদের নিরাপত্তার দুর্বলতার কারণে আমরা নিউইয়র্কে যাত্রীসেবা দিতে পারি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন নিউইয়র্কে ফ্লাইট চালু করবেন। সেজন্য আমরা ৭৮৭ ড্রিমলাইনার অর্ডার করেছি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে তা পৌঁছে যাবে। এই এয়ারক্রাফট ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক সরাসরি যেতে পারবে। আমাদের নিরাপত্তা লেভেল-১ নয়। তাই আমরা অনুমতি পাচ্ছি না। এটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।
ইউরোপে কার্গো আনলোড নিয়ে আমরা একটি সমস্যায় আছি। নিরাপত্তাজনিত কারণে আমাদের এ সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে ইউরোপ। বিমান কোম্পানি হয়ে গত দুই বছর মুনাফা করেছে। ২০১৫ সালে ২১৮ কোটি এবং ২০১৬ সালে ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে কার্গোর একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। আমরা সেটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমরা আর৩ অডিটে পাস করেছি। এসিসি৩তেও পাস করব। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আমরা আটকা পড়ে আছি।
২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করতে হবে আর না হলে আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব না। এক্ষেত্রে আমরা ফেজ-২ পাস করেছি। এখন ফেজ-৩ বাকি আছে, যা এসএসপি (স্টেট সিকিউরিটি প্রোগ্রাম) নামে পরিচিত। আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টার অভ্যন্তরীণ লাইসেন্স প্রদান করে সিকিউরিটির ক্ষেত্রে।
সম্প্রতি আমরা ইউজিসিতে প্রস্তাব দিয়েছি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় করার। সেখানে আমাদের সঙ্গে এখন আছে সিভিল এভিয়েশন, যারা জায়গা দেয়ার কথা বলেছে এবং আছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীও। ৭৮৭-এর পাইলট আনলে ২০ হাজার ডলার বেতন দিতে হয়। সেজন্য আমাদের নিজস্ব মানবসম্পদ প্রয়োজন। মন্ত্রী বলেছেন টেকনিশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার হয়, এটি সারা বিশ্বে হয়ে থাকে। আমাদের টেকনিশিয়ানরা বিশ্বের স্বনামধন্য এয়ারলাইনসে কাজ করছেন। যোগ্যতা না থাকলে সেটি সম্ভব নয়।
জ্বালানি তেলের দাম না কমালে আমরা আসলে সামনে এগোতে পারব না। আমাদের বাংলাদেশ বিমান এগোতে পারবে না মিডিয়ার সাহায্য ছাড়া। আমরা দেখলাম, সিলেটের বিমান চলে গেল কলকাতায়। এটি ভুল সংবাদ। কারণ টেকনিক্যালি এটি সম্ভব নয়। আপনারা পজিটিভ সংবাদ প্রচার করেন না। আমরা অনেক বিমানবন্দরে স্বীকৃতি পেয়েছি, সেগুলো কিন্তু আসেনি আমাদের মিডিয়ায়।
আহমেদ রেজা
আমি যখন ব্রিটিশ এয়ালাইনসে কাজ করি, তখন আমি ডোমেস্টিক এয়ারলাইনসের সঙ্গে একটি ইন্টারলিংকের কথা ভেবেছিলাম। তখন ২০-২৫ জন মানুষ লন্ডন থেকে ঢাকা নেমে সিলেট যেত। আমরা জিএমজির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলাম। প্রথমে তারা বেশ ভালো করেছিল, কিন্তু এক বছর পর তা বাতিল করেছিলাম। কারণ তারা অনেক ডিলে করত। পরবর্তীতে আমি আরো কয়েকটি এয়ারলাইনসের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি চেষ্টা করব আবার সাহায্য করতে। আমি নিজেও তাদের সেবা গ্রহণ করি। আমি মনে করি, বাকি কথা সবাই বলেছেন। ধন্যবাদ।
শাহাব উদ্দিন আহমেদ
আমরা বিমানের মেরামত করি ডলারে, কিন্তু আয় করি টাকায়। কেন করি। আমরা একটি বিমান নষ্ট হলে বিদেশে নিয়ে যাই। বিলিয়ন ডলার খরচ করি। কিন্তু আমাদের জনবল তো আছে। আমরা এক-চতুর্থাংশ খরচে সেটি নিজের দেশেই করতে পারি। আমাদের প্রকৌশলী আছে। আমরা টাকা খরচ করে পাইলট আনছি। কিন্তু সে সক্ষমতা অর্জন করতে পারছি না কেন? বিমান বাহিনী একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চেয়েছিল। আমি প্রস্তাবনা তৈরি করেছিলাম। পরবর্তীতে এর কাজ আর এগোয়নি।
আমাদের এয়ারলাইনসগুলো এটি চিন্তা করছে না কেন। আপনারা স্থানীয় বাজারে কাজ না করতে পারলে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন না। আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কেন পড়ানো হয় না? অথচ আমাদের জাতির চৌকস ছাত্ররা এ বিষয়ে পড়াশোনা করবে। তার ব্যবস্থা করতে পারছে না।
যখন বিমানের ত্রুটি হয়, তখন একজন প্রকৌশলী সঙ্গে সঙ্গে তা বের করতে না পারলে আমাদের ব্যবসা চলে যাবে। আমাদের সেজন্য স্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় লাগবে এ বিষয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারোনটিক্যাল সায়েন্স পড়াতে হবে। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বন্ধ হয়ে যায়নি। আমরা আবার যথাসময়ে অপারেশনে আসব।
শেখ মামুনুল হক
আমাদের প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ বিমান কেন লোকসান করে। বিমান তো একসময় লাভজনক ছিল। বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। বলাকা ভবন তৈরির সময় আমি জড়িত ছিলাম। আমরা সাশ্রয়ী ভাড়ায় মানুষকে সেবা দিতে চাই। এটিই আমাদের লক্ষ্য।
আমি কিছু বিষয়ে বলতে চাই। একই সমস্যা ঘুরেফিরে আসবে। সেগুলোর সঙ্গে আমি একমত। আমি মনে করি, এ সমস্যা সমাধান হলে আর বোধহয় আমাদের আর কথা শুনতে হবে না। আমাদের বিমানবন্দরের কার পার্কিংয়ের ফি অনেক বেশি। এটি কমানো উচিত। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের কার পার্কিং ১০০ টাকা আর ডোমেস্টিক ৮০ টাকা।
এভিয়েশন সেক্টর আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করতে সাহায্য করছে। সেখানে আমাদের আসলে নজর দিতে হবে। না হলে আমরা বঞ্চিত হব। আমাদের সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত ডেস্ক খোলা উচিত, যেখানে সরাসরি সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব।
টিপু সুলতান
সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পক্ষ থেকে এখানে কোনো কর্মকর্তা নেই। দক্ষতা যা থাকা দরকার, সেটি তাদের নেই। তাদের লেভেল ১ থেকে ২-এ নেমে গেছে। একটি বেসরকারি এভিয়েশনের বেআইনি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে তাদের নাকের ডগায়। তারা কিছুই বলেনি। যখন কোনো অফিসার দক্ষ হয়ে ওঠেন, তখন তাকে সরিয়ে নেয়া হয়। এভাবে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব নয়।এত বছরেও কোনো দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি। কমিটি করা হক। তারা রিভিউ করে একটি রিপোর্ট জমা দিক এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হোক।
নাদিরা কিরণ
এয়ারলাইনস কি সমস্যার কারণেই বন্ধ হয়েছে? তারা তো মনে হয় না বাজার গবেষণা করে এসেছিল। তারা ব্যবসা করতে এসেছিল। তারা এসেছিল আজ ১ টাকা লগ্নি করবে, আর ২ টাকা নিয়ে যাবে। কিন্তু সেটি হয়নি। বাস্তবতা ভিন্ন। এখন যারা আছেন, তারা দয়া করে যাত্রীসেবা দিন। না হলে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন না। বাজার গবেষণা করুন। সারচার্জ নিয়ে একটি কথা আছে। আমাদের বোধহয় এখানে সমস্যা আছে। সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পক্ষ থেকে একজন থাকা উচিত ছিল। এনবিআরের কাছে কোনো রিপোর্ট যায়নি। কিন্তু আমরা এটি নিয়ে বারবার বলেছি। তাহলে কেন আপনাদের কাছে কোনো রিপোর্ট যায়নি, এটি বোধগম্য নয়। আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর বাইরের এয়ারলাইনসের সঙ্গে একটি ইন্টারলিংক করা উচিত। এতে উভয়ে লাভবান হবে।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনে আপনাদের আশানুরূপ সাড়া প্রত্যাশা করে আজকের এ আয়োজন এখানেই সমাপ্ত ঘোষণা করছি।

শ্রুতিলিখন: মুহাম্মাদ হাসান রাহফি
আলোকচিত্রী: ওমর ফারুক





