বাংলাদেশের যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোগীর জীবনী আমরা এর আগে আলোচনা করেছি, তাদের তুলনায় জহুরুল ইসলাম বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ। তার জন্ম হয় কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর থানায় অবস্থিত ভাগলপুর গ্রামে, ১৯২৯ সালের ১ আগস্ট। তার বাবা মরহুম আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ময়মনসিংহ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের একজন ছোট কন্ট্রাক্টর। আফতাব আহমেদ এ ব্যবসা নিজের গ্রামের বাড়িতে থেকেই করতেন এবং তার আয় খুব বেশি ছিল না। জহুরুল ইসলামের মা বেগম রহিমা আখতার খাতুন একজন ধর্মপরায়ণ ও প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মহিলা হিসেবে নিজ গ্রামে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৭২ সালে জহুরুল ইসলামের বাবার মৃত্যু হয়। জহুরুল ইসলামের বাবা একজন পরিশ্রমী ব্যবসায়ী হিসেবে ছেলেদের উচ্চশিক্ষার উত্সাহ দিতেন এবং ছেলেদের চরিত্র বাবার প্রভাব ছিল সর্বাধিক। জহুরুল ইসলাম বাবার দ্বিতীয় ছেলে। তার আরো চার ভাই ও তিন বোন আছেন। তার ছোটবেলা আর পাঁচজন মধ্যবিত্ত বাঙালি সন্তানদের মতোই সাধারণ ও বৈচিত্র্যহীন। বাল্যশিক্ষা শুরু হয় বাড়ির পাশের পল্লীতে অবস্থিত চন্দ্রগ্রাম পাঠশালায়, পরে কিছুকাল সড়ারচর শিবনাথ হাইস্কুলে পড়েন। এ হাইস্কুলে যেতে দৈনিক দুই মাইল হাঁটতে হতো। পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলে তাকে কলকাতার চেতলা হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। সে সময় তার চাচা ছিলেন কলকাতার পিডব্লিউডির একজন ওভারশিয়ার। চাচার কোনো সন্তানাদি ছিল না। চাচার কাছে থেকে লেখাপড়ার জন্যই এ ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তার চাচার ছিল বদলির চাকরি, তাই তার বদলির কারণে তাকে আরো কয়েকবার স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। ১৯৪২ সালে কলকাতায় জাপানি বোমার আক্রমণের সময় জহুরুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন এবং ১৯৪৫ সালে কলকাতার রিপণ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এই বিখ্যাত শিল্পপতির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাফল্য এখানেই শেষ। এর পর তিনি চাচার সঙ্গে বর্ধমান যান, সেখানে রাজ কলেজে আইএ পর্যন্ত পড়েন এবং ১৯৪৭ সালে আইএ পরীক্ষাও দেন। পরে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ থেকে আবার আইএ পরীক্ষা দেন, কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেননি। ছোট থেকেই স্বাধীনভাবে নিজেই ব্যবসা করবেন, এমন আকাঙ্ক্ষা তার মনে প্রবল ছিল। চাচার চাকরি ও বাবার কন্ট্রাক্টারি ব্যবসা দেখতে দেখতে পূর্ত ও নির্মাণ শিল্প বিষয়ে তার বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হলো। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তার পরিবারে আর্থিক অসচ্ছলতা দেখা দেয় এবং বাধ্য হয়ে তাকে চাকরির সন্ধান করতে হয়। ১৯৪৮ সালের দিকে ঢাকায় চাকরির তেমন অভাব ছিল না। ম্যাট্রিক পাসের জন্য সবচেয়ে কম বেতনের যে চাকরি সেকালে সম্ভব ছিল— অর্থাত্ সিঅ্যান্ডবি ডিপার্টমেন্টে ওয়ার্কস সরকারের পদ, তা তিনি গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সে সময় এ চাকরির মাসিক বেতন ছিল মাত্র সাড়ে ৭৭ টাকা। কিছুকাল পর জহুরুল ইসলাম সরকারের এ বিভাগেই এক নম্বর ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনে লোয়ার ডিভিশন কেরানির পদ লাভ করেন। তখন তার বেতন হলো মাসিক মাত্র ৮০ টাকা। পারিবারিক সূত্রেই যে ব্যবসার আকাঙ্ক্ষা তিনি লাভ করেছিলেন, এ চাকরিতে এসে এসব সুযোগ সম্পর্কে তার ধারণা আরো পরিষ্কার হলো। এ চাকরিতে থাকতেই তার বাবার নাম ঢাকায় একজন কন্ট্রাক্টর হিসেবে তালিকাভুক্ত করে প্রত্যক্ষভাবে ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত হন। ওয়ার্কস সরকার ও লোয়ার ডিভিশন কেরানির চাকরি তাকে মোট প্রায় আড়াই বছরের মতো করতে হয়। চাকরি ও ব্যবসা একসঙ্গে বেশি দিন চলতে পারে না। তাই ১৯৫১ সালে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজের নাম একজন তৃতীয় শ্রেণীর কন্ট্রাক্টর হিসেবে তালিকাভুক্ত করে পুরাপুরি ব্যবসায় নেমে পড়লেন। তার এ সময়ের ব্যবসার পুঁজির পরিমাণ ছিল অতি সামান্য। ছোটখাটো নির্মাণ কন্ট্রাক্টের টেন্ডার দাখিলের সময় যে আর্নেস্ট মানি ও প্রাথমিক মালপত্র ক্রয়ের জন্য যে সামান্য পুঁজির দরকার হয়, তার পরিমাণ ৩-৪ হাজার টাকার বেশি নয়। তিনি এ সময় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু পুঁজি ঋণস্বরূপ পেয়েছিলেন, ব্যবসার শুরুতে ব্যাংক তাকে কোনো সাহায্য করেনি, তিনিও তা চাননি। নির্মাণকাজের এ কন্ট্রাক্টরির সুপরিচিত পথে তার আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল অক্লান্ত। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের নানা স্থানে সরকারি বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণের কাজ ছিল প্রচুর। জহুরুল ইসলাম যে কাজের কন্ট্রাক্ট পান, তা ঠিক সময়ে সম্পন্ন করেন, ফলে তিনি আরো বড় কাজ পেতে থাকেন। ১৯৫৩ সালের মধ্যেই তিনি পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় শ্রেণী ও পরে প্রথম শ্রেণীর কন্ট্রাক্টর হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেন। তিনি নির্মাণ বিষয়ের সব রকম কাজই নিতেন যেমন— বাড়ি, রাস্তা, ব্রিজ, সেচ ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, স্যুয়ারেজ ইত্যাদি কোনো কিছুতেই তার আপত্তি ছিল না। কাজের মাধ্যমেই তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেন এবং তা পরবর্তী কাজে ব্যবহার করতেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মনে করলেন ঢাকার আশপাশে একসময় শহর বাড়বে, তাই তিনি ওই সময় শহর ও শহরতলিতে যেখানে সম্ভব সেখানেই জমি কিনে, সেই টাকা খাটাতে শুরু করলেন। জমি কেনা এ সময় তার প্রায় একটা বাতিক হয়ে দাঁড়ায়। মিরপুর, সাভার, জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর ও রূপসী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমি ছাড়াও ঢাকা শহরে তিনি যে জমি কেনেন, পরে সেগুলোর অনেকটাই শিল্প স্থাপন ও আবাসিক গৃহনির্মাণের কাজে লাগান। পরে যখন শহরের আশপাশে জমির দাম বাড়তে শুরু করে, তখন জহুরুল ইসলামের নিয়োগ করা মূলধনও বাড়তে থাকে। তার দ্রুত আর্থিক উন্নতির জন্য এটি ছিল অন্যতম সহায়ক ব্যবস্থা। ১৯৫৮ সালে মোসাহেদ আলী চৌধুরীর মেয়ে সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে জহুরুল ইসলামের বিয়ে হয়।
ষাটের দশকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে সরকার অর্থনৈতিক ও শিল্পোন্নয়নের এক নতুন প্রচেষ্টা শুরু করে। এ সময় নির্মাণ ও শিল্প প্রচেষ্টায় সরকার নানাভাবে উত্সাহ ও অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করে। এ সময়টা তখন আইয়ুব খানের উন্নয়ন দশক বলে পরিচিত ছিল— দেশে ওই সময় পাট, বস্ত্র ইত্যাদির বহু শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। জহুরুল ইসলাম সবসময় নতুন পথে তার উদ্যোগ ও প্রতিভা বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন। তিনি কনস্ট্রাকশন কন্ট্রাক্টের কাজ ছাড়াও এ সময় কয়েকটি সম্পূর্ণ অপরিচিত শিল্প শুরু করেন। ১৯৬০ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রামের একটি টিম্বার ফ্যাক্টরির জিঞ্জিরায় একটি গ্লাস ফ্যাক্টরি, এমনকি একটি ওষুধ তৈরির কারখানাও চালু করেন। কিন্তু সব ব্যবসা একই সঙ্গে হয় না। প্রধানত নিজে সময় দিতে পারতেন না বলে তার এই প্রাথমিক শিল্প-প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়। এ কারখানাগুলো পরে বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু সাফল্য আসে অন্য পথে।
১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময় ছিল বাংলাদেশ অঞ্চলে জহুরুল ইসলামের ব্যবসা ও শিল্পের প্রসারের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বহু সরকারি আবাসিক গৃহনির্মাণ করে তার ফার্ম অর্থাত্ ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড’। এতে তিনি অনুভব করলেন যে, বহু মধ্যবিত্ত পরিবার নির্মিত বাড়ি (জমিসহ) কিনতে চাইবে— যদি তা পরিকল্পনামাফিক উপশহরের ভিত্তিতে নির্মাণ করা যায়। এজন্য গৃহনির্মাণ সংস্থা প্রয়োজনীয় ঋণ দেবে এবং মিরপুরে তার যে প্রায় হাজার একরের মতো জমি ছিল, তা কাজে লাগানো যায়।
একটি অঞ্চলের মাঝে মাঝে কিছু এলাকা ছিল, যার মালিকানা ছিল অন্য লোকের। সরকার এ ধরনের মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে তাকে সাহায্য করেন ও অন্য লোকদের জমিগুলোও তার পক্ষে দখলের ব্যবস্থা করেন। এভাবে জন্ম হয় ১৯৬৪ সালের দিকে ‘পল্লবী হাউজিং লিমিটেড’ নামক প্রকল্পের। পল্লবীতে প্রাথমিক পর্যায়ে ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা নগদ দিয়ে এবং বাকি টাকা কিস্তিতে শোধ করে যেকোনো একটি পরিবার তৈরি করা বাড়ি কিনতে পারত। তাছাড়া বেশি দামের বাড়িও ছিল। একই সঙ্গে তিনি ‘সোনালী জুটমিল’ ও অন্যান্য শিল্প স্থাপন করলেন ঢাকার আশপাশে। এজন্য জমি তার আগেই কেনা ছিল। এসব জমির দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগণ্য পরিমাণ মূলধন নিয়ে তিনি ১৯৫১ সালের পর যে ব্যবসা শুরু করেন ১৯৬৪ সালের দিকে সেই ব্যবসায়িক মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি টাকার ঊর্ধ্বে।
তিনি কোন সময় সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়ে থাকেন?— এ প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘যখন কোনো বড় কাজের কন্ট্রাক্ট আমি পাই, সেটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।’ আইউব আমলে ১৯৬৩-৬৪ সালের দিকে যখন স্থির হয় ঢাকায় নতুন সরকারের জন্য পার্লামেন্ট ভবন দরকার এবং তা খুব তাড়াতাড়ি তৈরি করতে হবে, জহুরুল ইসলাম এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে তিনি তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরের সন্নিকটে যে সংসদ ভবন এবং পরে মাত্র ৩৫ দিনে ৬০ কামরার যে দোতলা সদস্য হোস্টেল নির্মাণ করেন, তা এখনো ব্যবহূত হচ্ছে এবং দ্রুত বাড়ি বানানোর ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত একটি রেকর্ড হয়ে আছে। কখনো তার কাজে ভুল হলে তিনি নিজেই তা আবার ঠিক করে দিয়েছেন। সাহস করে তিনি নতুন কাজে নেমেছেন, যা দেশের অন্য ব্যবসায়ীরা করতে পারেননি। ১৯৭০ সালের দিকে যেদিন তিনি বিদেশী সাহায্য প্রকল্পের পাঁচ হাজার গভীর নলকূপের কন্ট্রাক্ট পেলেন, সেদিন করাচি থেকে সাফল্যের সঙ্গে ফিরে আসা ছিল তার এক চরম আনন্দের মুহূর্ত। দেশী-বিদেশী যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে (যেখানে কাজের সময় মাত্র বছরে পাঁচ-ছয় মাস, কারিগরের অভাব, অভিজ্ঞতার অভাব তীব্র) এটি ছিল এক বিরাট সাহসের কাজ। পরে স্বাধীনতা লাভের পর অবশ্য তাকে এ কাজের অংশমাত্র দেয়া হয়, কিন্তু তিনি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গভীর নলকূপের জন্য প্রয়োজনীয় উপকাঠামো সৃষ্টি করতে সমর্থ হন। প্রথমে বিদেশী সাহায্যদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্বাস করেনি যে, তিনি এ কাজ শেষ করতে পারবেন। কিন্তু তিনি নিজের কাজ ঠিক সময়ে সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন।
স্বাধীনতার পর সরকারের জাতীয়করণ নীতির ফলে তার এ উদ্যোগী প্রচেষ্টায় কিছুটা মন্দা দেখা দেয়। কিন্তু জহুরুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের দিকে বহির্বিশ্বে এবং নতুন দিগন্তে তার প্রতিভা কাজে লাগিয়েছেন। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে গৃহনির্মাণের কন্ট্রাক্ট হাতে নিলেন এবং ১৯৭৭ সালের দিকে আবুধাবিতে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কৈশোরে তিনি যে দম্ভ করেছিলেন তার চাচার মতো বাড়ি তিনি খোদার ইচ্ছায় প্রতি বছরই বানাবেন, সে কথা তিনি সত্য বলে প্রমাণ করেছেন, দেশে ও বিদেশে হাজার হাজার বাড়ি নির্মাণ করে।
জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ অর্থনৈতিক উন্নতিতে দৃঢ়বিশ্বাসী। তিনি মনে করেন, এ দেশের গ্যাস, তেল, চামড়া ও শ্রমশক্তির ব্যবহারের ফলে দেশের মানুষের আয় এবং জীবনধারণের মান বেড়ে যাবে। তিনি ১৯৮২ সালে চট্টগ্রামে জাপানি সহায়তায় মোটরগাড়ি সংযোজনের যে নতুন কারখানা চালু করেন (আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড) তা তার এই বিশ্বাসেরই ফল। [পুনঃমুদ্রণ]
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক






