অধ্যাপক আখলাকুর রহমান (৬ ডিসেম্বর ১৯২৫-৪ মে ১৯৯২) ছিলেন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক, গবেষক ও রাজনীতিবিদ। সবগুলো পরিচয়ই তাঁকে দেয়া যায়। সুফি সাধকও বলা যায় তাঁকে। এবং অবশ্যই স্বাধীনভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে সক্রিয় থাকা মেরুদণ্ডসম্পন্ন একজন মানুষ।
আখলাকুর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৮০ সালে। সে সময়ে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। আমি সে সময় ওই বিভাগে মাস্টার্সের ছাত্র। অবশ্য এর আগেও আমি তাঁর নাম জানতাম। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধনতন্ত্রের বিকাশ এই গবেষণা গ্রন্থটি লিখে খুবই আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিলেন। সে সময়ে উত্পাদন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও বেশ বিতর্ক ছিল। বাংলাদেশের উত্পাদন পদ্ধতি যারা ধনতন্ত্র মনে করতেন না, তারা আখলাকুর রহমানকে অনেক নিন্দা করেছিলেন সে সময়ে। ১৯৭৫ সালে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে যে সিপাহি বিপ্লব হয়, তখন তিনি জাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এ কারণে তিনি পরে জেলও খেটেছিলেন।
জেল থেকে বের হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন গবেষণা ও লেখালেখি করছিলেন। তবে পাকিস্তান আমলে তাঁর শিক্ষা ও গবেষণার সূত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য (এবং কথিত ‘পাগলামী’) নিয়ে একাডেমিক মহলে বেশ আলোচনা ছিল। দুই পাকিস্তানের অর্থনীতি বা পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য বিষয়ে ষাটের দশকের মাঝামাঝি তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন, যা ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’ বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা অর্জন তাঁকে সামনের সারির অর্থনীতিবিদদের কাতারে এনেছিল। বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও জার্নালে একাধিক নিবন্ধ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। সত্তরের দশকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ শিরোনামে সাম্রাজ্যবাদ বিষয়েও তাঁর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো এখন বাজারে নেই।
১৯৮০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর তিনি শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করেন এবং শিক্ষক হিসেবে অল্প দিনের মধ্যেই খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে তিনি বিভাগের সভাপতি হন এবং আমার ছাত্রত্বও শেষ হয়। তিনি সভাপতি থাকা অবস্থাতেই আমি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি ১৯৮২ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, গবেষণা, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে চিন্তার আদান-প্রদান এবং কোনো কোনো সময়ে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল।
১৯৭৬ সালে তিনি যখন জেলে ছিলেন, সে সময়ে মার্ক্সের পুঁজি অনুসরণে তিনি বেশ কয়েকটি অধ্যায় রচনা করেছিলেন। পরে বিভাগে শিক্ষক হিসেবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কোর্স পড়ানোর সময় ওই অধ্যায়গুলোর ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করেন। সহকর্মী হিসেবে তিনি আমাকেও সেগুলো দেখান। আমি সেগুলো দেখে তা প্রকাশের তাগিদ অনুভব করি। সে সময়ে সংস্কৃতি নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের হতো, সম্পাদক ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। সে পত্রিকার আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক। আমাদের অনুরোধে তিনি লেখাগুলো সংস্কৃতিতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সেগুলো মার্ক্সীয় অর্থনীতি নামে একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন।
জ্ঞানচর্চার দিক থেকে অর্থশাস্ত্রের যেসব ধারা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে নয়া ক্ল্যাসিকাল অর্থশাস্ত্র বর্তমান বিশ্বে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। এটিকেই এখন মূলধারার অর্থশাস্ত্র বলা হয়। আখলাকুর রহমানের একই সঙ্গে নয়া ক্ল্যাসিকাল এবং মার্ক্সীয় অর্থশাস্ত্র দুটোতেই সমান দখল ছিল। এ দুটো ধারায় সমান দখল আছে এমন ব্যক্তি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বেই বিরল। দুই ধারাতেই তাঁর দক্ষতা থাকার কারণে লেখা, বক্তব্য, সমালোচনা, পর্যালোচনা প্রভৃতিতে কর্তৃত্ব ও পরিপক্বতার ছাপ থাকত। নয়া ক্ল্যাসিকাল অর্থশাস্ত্রের চর্চা যারা করেন বা যারা মার্ক্সীয় অর্থশাস্ত্রের চর্চা করেন, দুই ধারার অনেকের দুর্বলতাও তাঁর কাছে তাই সহজেই ধরা পড়ত, অনেকেই তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের শিকার হতেন। সবসময় তাঁর আক্রমণের ভাষা শোভন থাকত না। সেজন্য কোনো আলোচনা-সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির জন্যও অস্বস্তিকর ছিল। শিক্ষক হিসেবে তিনি খুবই আন্তরিক ছিলেন, বিস্তৃত পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাস নেয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল। যারা তাঁর ক্লাস করেছেন, তাঁরা তা জানেন।
একটা পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি হিসেবে এ সমিতিকে একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন তিনি। অর্থনীতি সমিতির নেতৃত্ব দান করতে গিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদের সঙ্গে তাঁর মতদ্বৈধতার সৃষ্টি হয়। সর্বত্রই তিনি যেমন ভয়ের, তেমনি একই সঙ্গে শ্রদ্ধার পাত্রও ছিলেন।
জীবনে তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর কম হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কালে তিনি দলীয় রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন। এরশাদের শাসনামলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন হয়েছিল। সেখানে একটি প্যানেলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ভোট পেলেও তত্কালীন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতাদের পক্ষে তাঁকে উপাচার্য হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। কারণ তিনি যে রকম স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন, তাতে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষক দল বা কারো আনুগত্য স্বীকার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরও তিনি যেন ভিসি হতে না পারেন, সেজন্য কোনো কোনো সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেতা ও সরকার সবদিক থেকেই চক্রান্ত শুরু হয়। এটি আমরাও প্রত্যক্ষ করি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভিসি পদে নিয়োগ না দিয়ে কম ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি তাঁর স্নেহধন্য সহকর্মীদের ভূমিকায় তখন খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন।
স্ববিরোধী মনে হলেও তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল রহস্যময়তা। সুফি ধারার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন পীর, মাজারের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ধর্মীয় এ ধরনের চর্চার সঙ্গে যুক্ত অনেকে তাঁর বাড়িতে আসতেন। তিনিও অনেক মাজারে যেতেন। এ বিষয়গুলো তিনি আমাদের কাছে খুব একটা খোলাসা করেননি। কিন্তু এ বিষয় তিনি যে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন, সেটি বোঝা যেত।
আশির দশকে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ সংকলন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য জমা দেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা সেসব প্রবন্ধ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তা প্রকাশের কথা থাকলেও বহুদিন পড়ে থাকার পরও সেগুলো প্রকাশে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর আমরা তা উদ্ধার করি এবং কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়ায় তা একসঙ্গে করতে বিলম্ব হয়। বহু বিলম্ব হলেও আমি তাঁর অপ্রকাশিত সে প্রবন্ধগুলোর সংকলন প্রকাশের কাজ শেষ করতে সমর্থ হই। ২০১৪ সালে উন্নয়ন অর্থনীতির বিভিন্ন তত্ত্ব ও বিতর্কগুলো নিয়ে পর্যালোচনা ধরনের এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, প্রকাশ করে সংহতি প্রকাশন। বইয়ের নাম: Development and Growth Economics. এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর অনেক লেখা প্রবন্ধ রয়েছে। বেশকিছু গবেষণাপত্র এখনো অপ্রকাশিত আছে। বাংলাদেশ কীভাবে বৈদেশিক ঋণ থেকে বের হতে পারে, তা নিয়ে তিনি গবেষণা গ্রন্থ লিখেছিলেন। এটি আশির দশকে প্রকাশ হয়েছিল। বাংলা ও ইংরেজি মিলে তাঁর যে লেখাগুলো রয়েছে, সেগুলো বিভিন্ন দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো সংগ্রহ করে তাঁর একটি রচনাবলি প্রকাশের ইচ্ছা আমার আছে।
আশির দশকের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। মোটামুটি সুস্থ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিয়ে। সস্নেহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘প্রফেসর (আমি তখন সহকারী অধ্যাপক) সাহেব, এখন তো সমাজতন্ত্রের পতন হইল, এখন আর কী চাইবা?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম— ‘চাইব মানুষের সমাজ। শ্রেণী, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণগত বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত সমাজ চাইব, এর জন্য মানুষের ইচ্ছা ও লড়াই তো কেউ চাইলেই বন্ধ করে দিতে পারবে না।’ তিনি খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিকই তো, নাম যা-ই হোক, এ রকম এক সমাজের স্বপ্ন ও লড়াইয়ের পতন হওয়ার নয়।’
মার্ক্সীয় রাজনীতি ও অর্থশাস্ত্র নিয়ে তাঁর যে মনোযোগ, তা বিপ্লবী রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের প্রতি ভেতর থেকে এক ধরনের তাগিদ থেকেই তৈরি হয়েছিল। তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর আগ্রহ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে যে আরো কাজ করা দরকার, সেটি সবসময়ই বলতেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রফেসর আখলাকুর রহমান বেশ কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন, চিকিত্সার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ তিনি দেখাননি, দেশেই চিকিত্সা করেছেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে অর্থশাস্ত্র ও সমাজ জ্ঞানচর্চার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আমরা অকালে হারাই।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






