সাংবাদিকদের বলা হয় ‘সার্জন অব আ সোসাইটি’— মানিক মিয়া সেই বিরলপ্রজ সার্জন, যিনি তাঁর সময়কার সমাজ ও রাজনীতিকে অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবচ্ছেদ করে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্ব বাংলার মানুষের দাবি ছিল স্বাধীনতা-স্বাধিকার, যা দিনের পর দিন অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে সাংবাদিক মানিক মিয়ার ইত্তেফাক পত্রিকার মধ্য দিয়ে। ফি-দিন মানুষের চাওয়া-পাওয়া আর আশা-আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সেই সময়ের ইত্তেফাকে। তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্যগুলো অবশ্যই রাজনৈতিক কিন্তু সেগুলো কেবল রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো নয়, সাধারণ মানুষের দাবি ও আত্মম্ভর আশার প্রতিবিম্বও বটে। মানিক মিয়ার চিন্তা ও কর্মতত্পরতাকে তাই ‘সোস্যাল সার্জনের’ কাজ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়।
মানিক মিয়ার সময়কালে বাংলার মানুষের চাওয়া ছিল স্বাধীনতা আর সেই চাওয়া তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। জনদাবিকে যৌক্তিক মোড়কে প্রকাশ করা এবং আপামর মানুষ ও বাকি বিশ্বের সামনে তুলে ধরার কাজটি অপরিসীম পারঙ্গমতায় যিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি মানিক মিয়া ছাড়া আর কেউ নন। গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এককভাবে তিনি যা করেছিলেন, এক কথায় তা অসামান্য। হাতে গোনা যে ক’টি সংবাদ মাধ্যম সেই সময়ের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার সাহস দেখিয়েছে, ইত্তেফাক তার অন্যতম। সন্দেহ একশ ভাগ যে, ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বাংলার মানুষের বঞ্চনার কথা মানিক মিয়ার মতো আর ক’জন বলতে পেরেছেন! সত্যিই মানিক মিয়া যে উঁচু স্বর ও সুরে মানুষের ক্ষোভ-দুর্দশার কথা বলতে পেরেছেন, এতটা স্পষ্টভাবে বলতে আর কেউ পারেননি। আওয়ামী লীগের ছয় দফা— বাঙালির মুক্তির সনদ— এর সমর্থনে যে প্রচার-প্রচারণা হয়েছে, তার সিংহভাগ ক্রেডিট মানিক মিয়া ও তাঁর সম্পাদিত ইত্তেফাকের। বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সংবাদপত্রের চেয়ে বেশিকিছু’ বলে যদি কেউ দাবি করে— সেটা কেবল মানিক মিয়ার ইত্তেফাকই করতে পারে, আর কেউ নয়। তাঁর পত্রিকা মানুষের মুক্তির চাহিদা তৈরিতে দুর্ধর্ষ ভূমিকা রেখেছিল।
সংবাদপত্রের কাজ তুলে ধরা, মিশনারিদের মতো লক্ষ্য অর্জনে কাজ করা নয়; কিন্তু ইত্তেফাক সংবাদপত্রের গতানুগতিক ভূমিকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনমানুষের দাবি আদায়ের কাজটিকে যারপরনাই ত্বরান্বিত করেছে। এজন্য সাংবাদিক হিসেবে মানিক মিয়াকে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা লিখতে গিয়ে তিনি যতবার জেলে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, ততবার আর কেউ নিক্ষিপ্ত হয়েছেন কিনা জানা নেই। সাংবাদিক হিসেবে জেল-জুলুম, অত্যাচার হজম করার যে অপরিসীম সহ্যক্ষমতা তিনি দেখিয়েছেন, তা নজিরবিহীন। মানুষের পক্ষে কথা বলার অপরাধে এই মানুষটির সম্পত্তি সামরিক সরকার কখনো বাজেয়াপ্ত করেছে, কখনো তছনছ করে দিয়েছে।
মানিক মিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কিত ধারণা সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ছাত্র-শিক্ষকের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে আগামী অনেক বছর। ঐতিহাসিক ছয় দফা যখন ঘোষিত হয়, তখন অনেকেই মানিক মিয়া কী লেখেন, কী বলেন, সেদিকে আকুল আগ্রহে তাকিয়ে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও উত্কণ্ঠিত ছিলেন বলে জানা যায়। ছয় দফার প্রতি মানিক মিয়ার সমর্থন তাঁর দরকার ছিল। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় ছয় দফা দাবির প্রতি আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীর সমর্থন ছিল না। আর এই সমর্থন এনে দেয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু মনে করতেন মানিক মিয়ার, মানিক মিয়ার পত্রিকার আর মানিক মিয়ার কলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেই সময় মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ অত্যন্ত প্রভাবশালী এক কলাম। অনেকে মনে করেন, মানিক মিয়া সমর্থন না দিলে ছয় দফা তেমন জনসমর্থন নাও পেতে পারত। সবাইকে বিস্মিত করে মানিক মিয়া তাঁর রাজনৈতিক মঞ্চের দীর্ঘতম লেখায় ছয় দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, “সেদিন বঙ্গবন্ধুর চোখে মুখে যে আনন্দ প্রেরণা সাহস ও আত্মপ্রত্যয়ের ভাব আমি দেখেছি তা ছিল এক দুর্লভ দেখা। আমি তাঁর সামনে একটা চেয়ারে বসতেই সাহাস্যে বললেন, ‘মানিক ভাই ছয় দফাকে সমর্থন দিয়েছেন।’ বলেই তিনি সবাইকে শুনিয়ে বলেছিলেন, ‘যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ কথাটা যে তিনি মানিক মিয়ার উদ্দেশেই বলছেন, তা বুঝতে আমাদের কারো দেরি হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে পাইয়োনিয়ার প্রেসের তত্কালীন মালিক আবদুল মোহাইমেন সাহেবকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসতেই নির্দেশ দিলেন, মানিক মিয়ার এই রাজনৈতিক মঞ্চ ছোট বুকলেট আকারে ৫ লাখ কপি ছাপাতে। বললেন, সারা বাংলাদেশে এই বুকলেট বিতরণ করতে হবে।” ছয় দফাকে সমর্থনদানের জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে মানিক মিয়াকে। গভীর রাতে তাঁর বাড়ি পুলিশ ঘেরাও করে ফেলে এবং তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। ইত্তেফাকের প্রেস বাজেয়াপ্ত করে পত্রিকা প্রকাশ নিষিদ্ধ করে। ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়, পৌনে তিন বছর পর ইত্তেফাক তার প্রকাশনার সুযোগ ফিরে পায়। এত দিন বন্ধ থাকা একটি পত্রিকা আবার চালু করা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তিটি মানিক মিয়া বলেই। কারণ এ সময়ে নদীতে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন। এ ভূখণ্ডের নেতাকর্মীদের ওপর জোরজুলুম চলেছে। আর মানিক মিয়া সেই সময় নিজেও ভয়ঙ্কর হয়রানির শিকার হয়েছেন; কিন্তু মানিক মিয়ার ধ্যান-জ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা। ১৯৫৮ সালে আইউবের মার্শাল ’ল জারি হওয়ার পর মানিক মিয়াকে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। সরকারের পক্ষ থেকে সেই সময় তাঁকে আপস করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল; কিন্তু তিনি আপস করেননি; এর আগে ১৯৪৯-৫০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে তথ্য দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগও দিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। দুর্বল চিত্তের সাংবাদিক হলে এসব লোভনীয় সুযোগ এড়িয়ে চলা সম্ভব হতো না। আজকের দিনে এটা ভাবা কষ্টকর বৈকি!
রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন ও সমন্বয়ের কাজটি করে গণমাধ্যম। সমাজ ও রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে থেকে সমান্তরালে চলতে হয়। আর সেটি সম্ভব না হলে গোটা ব্যবস্থা ইমব্যালান্সড হয়ে যায়। সে সময়ে পূর্ব বাংলায় এ কাজটি এককভাবে করেছে সংবাদপত্র। যেকোনো সামরিক সরকার গণমাধ্যমের গলা চেপে ধরতে চায়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যত জুলুম অত্যাচার বেড়েছে, ততই সক্রিয় হয়েছে মানিক মিয়ার ইত্তেফাক। সরকারের পক্ষে তোষামোদি বা সাফাই গাইতে ইত্তেফাককে কখনই দেখা যায়নি; বরং সরকারের ন্যায্য সমালোচনাই তারা করে গেছে ধারাবাহিকভাবে। এজন্য জীবনদর্শন থাকতে হয়, উচ্চ আদর্শ থাকতে হয়, সাহস থাকতে হয়, নেশা থাকতে হয় আর পেশার প্রতি সৎ থাকতে হয়। শুধু কর্মদক্ষতা দিয়ে এক জীবনে একজন মানিক মিয়া হয়ে ওঠা যায় না। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘সাংবাদিকতায় মানিকমিয়া একজন মিশনারি।’ তিনি পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রেস স্থাপন করেছিলেন, ব্যবসা করার জন্য নয়; সুবিধা নেয়ার জন্য তিনি এই
প্রেস কিংবা পত্রিকাকে ব্যবহার করেননি। এছাড়া সাংবাদিক সমাজকে তিনি বিপদে আপদে যেভাবে ছায়া দিয়ে গেছেন, তা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো সাংবাদিক পেরেছেন বলে মনে হয় না। মানিক মিয়া তাই ‘ব্যক্তি সাংবাদিক’ থেকে হয়ে গেছেন ‘সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান’। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন মানিক মিয়ার কথা স্মরণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘জেলে থাকা অবস্থায় দেখা করতে গেলে তিনি বলতেন, মোনেম (তত্কালীন গভর্নর) কী চায়? কোনো অপরাধ করে থাকলে আমি করেছি। তার জন্য আমাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার হয়তো তার আছে। তাই বলে ইত্তেফাকের এতগুলো কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে সে কী বোঝাতে চায়?’— এই হলো একজন সম্পাদকের চিন্তা-আদর্শ; যিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর যে আয়োজন করা হয় ঢাকায়, তাতে শুধু সরকারের বাধা ছিল এমনটা নয়। একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এ আয়োজনকে ভণ্ডুল করার চক্রান্তও করেছিল। এ সময় দুষ্টু এসব বুদ্ধিজীবী বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট, তিনি হিন্দু কবি। এর পরও জনমত শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান আয়োজনের পক্ষে চলে গেলে সরকার ভয়ভীতিও দেখিয়েছিল। এর পরও রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এ আয়োজন সফল করার প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মানিক মিয়া। বলা হয়ে থাকে, বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদের চারাগাছ পোক্ত হয়েছিল এ আয়োজন ও প্রচারাভিযানের মধ্য দিয়ে। যে প্রচারাভিযানের অগ্রনায়ক মানিক মিয়া।
সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল বেশ স্পষ্ট। কী কনটেন্ট থাকলে একজন পাঠক আগ্রহী হবে— সেক্ষেত্রেও তাঁর ভাবনা বেশ পরিষ্কার। রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে মানিক মিয়া বলছেন, ‘সংবাদপত্র ব্যক্তিবিশেষের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হইলেও জনমতের প্রতিধ্বনি না করিলে সে পত্রিকা টিকিয়া থাকিতে পারে না, ইহা অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির ন্যয় ব্যবহার করা চলে না।’ কথা তো সত্যিই যে, স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া স্বাধীন জনসমাজ তৈরি হতে পারে না। শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম মানে শৃঙ্খলিত জনসমাজ। শৃঙ্খলিত জনসমাজের আত্মবিকাশ যেমন অসম্ভব, তেমনি স্বাধীন ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তিমানসের স্ফুরণও অকল্পনীয়। স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া স্বাধীন জাতির অস্তিত্ব কল্পনা করা কষ্টকর। এ কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন মানিক মিয়া। সে সময়ের সংবাদপত্রের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘বিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধশতকের নব্য স্বাধীন ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডিই সম্ভবত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপমৃত্যু অথবা মুমূর্ষু অবস্থা। এই অবস্থাকে বেশিদিন চলতে দেওয়া মানে একটি স্বাধীন জনসমাজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাকে ত্বরান্বিত করা। তাই শুধু সংবাদপত্রসেবী হিসাবে নয়, সংবাদপত্রের পাঠক, বিপুলায়তনে জনসমাজের প্রতিনিধি হিসাবেও এ ভয়াবহ আশঙ্কাকে প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশেরই সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুরের জেলা-সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন; পরে চাকরি ছেড়ে সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার জনসংযোগ অফিসার হন; এর পর তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভের পরই তাঁর জীবন বদলে যায়; শুরু করেন রাজনীতি; সবশেষ চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। দেশ ভাগের পর একবার তাঁকে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বারও করা হয়েছিল; কিন্তু তিনি সক্রিয় রাজনীতি করতে চাননি; এর পর থেকে আমৃত্যু সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, ‘তিনি করেছেন, স্টেটসম্যানের রাজনীতি।’ সিরাজুদ্দিন হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের এডিটর মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে অসুস্থ শরীর নিয়ে বার্তা বিভাগে এসে যে কথাগুলো বলে গেছেন, সেগুলো আজও কানে বাজে। আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছেন— ইত্তেফাক আমি বের করেছিলাম কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়, বের করেছিলাম শহীদ সাহেবের শুভেচ্ছা নিয়ে তারই রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুযায়ী দেশ ও দশের সেবা করে যাব এই নিয়তে। তাই ইত্তেফাককে বরাবরই আমি মনে করে এসেছি আমার হাতে এ দেশের বঞ্চিত নিগৃহীত মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষার একটি পবিত্র আমানত। আমি চাই, আমার মৃত্যুর পর এর কোনো খেয়ানত না হয়।’ ইত্তেফাক শুধু একটি গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করেনি, রাজনৈতিক মতাদর্শ বাস্তবায়নের কাজও করেছে। তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিকামী মানুষের কথা চিন্তা করলে সেটি করাই আবশ্যক ছিল। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করছেন, ‘বছর ঘুরিতেই তিনি বলিলেন, ভিতরের চেয়ে বাহির হইতে তিনি আওয়ামী লীগের বেশি খেদমত করিতে পারিবেন।’ আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন মানিক মিয়ার প্রথম সম্পাদক। কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগদানের পর রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ইত্তেহাদ’-এ কাজ শুরু করেন মানিক মিয়া; এর পর ১৯৪৭ সালে ‘ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হন। পত্রিকার প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকেই ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে মানিক মিয়া পত্রিকাটি ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন; কিন্তু পত্রিকাটিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। পত্রিকা যার নেশা হয়ে গেছে, তাঁর পক্ষে পত্রিকা ছাড়া থাকা সম্ভব নয়। ১৯৪৯ সালেই আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে দলের মুখপত্র হিসেবে যাত্রা হয় সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের। শুরুতে এর সম্পাদক হিসেবে আবদুল হামিদ খান ভাসানী আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন। পরে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আর ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক থেকে ইত্তেফাক দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। মাত্র ৪২ বছর বয়সে সম্পাদক! হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালে যখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি তাঁর কলমসৈনিক হিসেবে বেছে নেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। কারণ সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন— গণমাধ্যম শক্তিশালী না হলে তিনি রাজনীতিতে সফল হতে পারবেন না, তাই তাঁরই সিদ্ধান্তে ইত্তেহাদ পত্রিকার প্রকাশ এবং অল্পদিনের মধ্যে ইত্তেহাদের বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ।
সক্রিয় রাজনীতি না করেও তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশিবার জেলে গেছেন। জেলে বসে নেতাদের সঙ্গে দেশ নিয়ে আলোচনা করেছেন। কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ‘মানিক ভাই’ সম্বোধন করতেন। ‘আমার মনিক ভাই’ শিরোনামের এক অসাধারণ স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৬২ সাল। শ্রদ্ধেয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জেলে নেবার কয়েকদিন পর আমরা (বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া) কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। তবে সান্ত্বনার কথা এই যে, এ যাত্রায় দু’জনকে দুটি স্বতন্ত্র সেলে আটকে রাখা হয়নি, রাখা হয় এই কক্ষে। ফলে পারস্পরিক মত বিনিময়ের সুযোগ ঘটে। দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রায় সর্বক্ষণ আলাপ-আলোচনা করি।’
মানিক মিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় কলকাতায় পাড়ি জমানোর পর থেকে। যেকোনো ব্যক্তিরই রাজনৈতিক বিকাশের প্রথম ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সময় তিনি পেয়েছিলেন তত্কালীন মুসলিম লীগের সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে; সঙ্গে পেয়ে যান উপমহাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বিশেষ স্নেহধন্য, ফলে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব মানিক মিয়ার ওপর থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের ঐক্য ও অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও মানিক মিয়ার ভূমিকা সমধিক। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যখন দলের বিরাট বামপন্থী অংশ দল ছেড়ে বেরিয়ে যায় এবং নতুন দল— ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি— গঠন করে তখন আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছিল। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষায় ‘মুজিব মিয়া’ ও ‘মানিক মিয়া’ যদি আওয়ামী লীগকে সমর্থন না দিতেন তাহলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকত না। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হলে দেশে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। মানিক মিয়া এ আন্দোলনকে সমর্থন জোগালে জননিরাপত্তা আইনে অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয় এবং একই বছর তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬২ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ গঠিত হলে তিনি এর সমর্থন জোগান। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মানিক মিয়ার দীক্ষাগুরু শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জীবনাবসান ঘটলে তিনি রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকহারা হন। সেই সময় ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলে মানিক মিয়া তাঁকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেন। ১৯৬৪ সালে প্রদেশে, বিশেষত ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি দাঙ্গা প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ইত্তেফাক অফিসে তাঁর সভাপতিত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। তাঁর দেয়া ব্যানার হেডিং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক বুদ্ধিজীবীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা থেকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে কাজ করে গেছেন বাঙালির মুক্তির জন্য। বঙ্গবন্ধু, আবুল মনসুর আহমদ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীরা কাজ করেছেন সক্রিয় রাজনীতির মাধ্যমে আর মানিক মিয়া কাজ করেছেন তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে। তাঁর কলম ও কলাম বারবার উচ্চারণ করেছে মুক্তির কথা, বাতলে দিয়েছে মুক্তির পথ। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর যখন সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন মানিক মিয়া হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ‘মুসাফির’ কলামে লিখছেন, ‘যুক্তফ্রন্টের কর্মপন্থা কার্যকর করিতে টাকার প্রয়োজন নিঃসন্দেহে। কেন্দ্র ২/৪ কোটি দিলেও, না দিলেও, সেটা মূল সমস্যার সমাধান হতে পারে না। যক্ষ্মা রোগীকে যা খাওয়াইবেন, তা ক্ষয় হইয়া যাইবে। তাই প্রথমত ক্ষয় রোগের চিকিৎসা দরকার। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদে কেহ হাত বসাইতে না পারে, সেটা দেখা হইবে যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রথম কর্তব্য। পাটের ফটকাবাজারি ব্যবসা বাণিজ্যে গোষ্ঠীবিশেষের মনোপলি, ভূমির উপর চাষীদের কর্তৃত্ব এবং কল-কারখানার মালিকদের অতিমুনাফা বজায় থাকিলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না।’ এই যে রাজনীতির বাইরে থেকে রাজনীতিতে পরোক্ষ অবদান, পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক পীড়নের নিগড় থেকে বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে সেটা এক পরম পাওয়া! আবার সেই বছরই বন্যা মোকাবেলায় ব্যর্থ হলে লীগ সরকারের সমালোচনা করতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি, “আমেরিকা টেনেলি নদীর বাঁধ নির্মাণ করিয়া দেশের সম্পদকে পূর্ণ ব্যবহার করিয়া শুধু বন্যা রোধ করে নাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং জমির ফলন বৃদ্ধি করিয়া দেশের সম্পদকে পূর্ণ ব্যবহার করিয়া আজ এতো বড় প্রতিপত্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হইয়াছে। সেখানে গডের দুর্নাম কেউ শোনে না। আর আমরা — যারা আল্লার খাশ বান্দা বলিয়া দাবি করি, তাদের এখানে দোষগুলি সব আল্লার, ভালো যেটুক, সেটুকু মুসলিম লীগের।... ব্যর্থতার বোঝা আল্লার ঘাড়ে আর ব্যর্থতার প্রতিবাদ করিলে আল্লার বান্দার উপর নামিয়া আসে ‘নিরাপত্তা আইন’ এইতো লীগের খেলা! আমি বিশ্বাস করি, পাকিস্তানে কোনো যোগ্য জনকল্যাণকর গণ-সরকার প্রতিষ্ঠিত হইলে এক বছরের মধ্যে প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলা হইতে দেশকে রক্ষা করা যাইতে পারে।’ নিজ দলের এই সমালোচনা করা চাট্টিখানি কথা নয়। নিজের সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে নিজেই কলম ধরছেন। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন থাকার কারণে। সেই সময় যাঁরা দেশের জন্য কাজ করে গেছেন, রাজনীতি করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জানতেন সরকারের বিরুদ্ধে লিখলে, সরকারের মতের বিরোধিতা করলে জেল-জুলুম অনিবার্য। এর পরও মুসাফির লিখেছেন, ‘মনে করিয়াছিলাম জনাব আলী গণতন্ত্রের পীঠভূমি মার্কিন রাজ্যফেরত; তিনি সসম্মানে সরিয়া দাঁড়াইবেন। ও-বাবা! সরিয়া দাঁড়ানো তো দূরের কথা— তারা যে সার্বভৌম, অমরশীল এই জবর-থিওরি কপচাইতে শুরু করিলেন, নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হইয়াও তারা দুর্বল হইবার পরিবর্তে আরো যেন সবল হইয়া পড়িলেন। আইনের কী মারপ্যাঁচ। জনসাধারণের ভোট না পাইয়াও সর্বশক্তিমান। তা হইলে আর ভোটের জন্য মাঠে-ঘাটে দৌড়া-দৌড়ি করে কোন আহম্মক।’ মানিক মিয়ার এ বিশ্লেষণ বর্তমানেও প্রযোজ্য কিনা পাঠক ভেবে দেখবেন।
আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার অবদানকে তাই বারংবার স্মরণ করতে হয়, স্মরণ করতে হয় তাঁর নিজের জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে, যিনি আমাদের অনুপ্রেরণার অমোঘ উত্স হয়ে রইবেন আরো বহু যুগ। পাকিস্তান গঠনের পর এ ভূখণ্ডে তাঁর হাত ধরে সাংবাদিকতায় যে নতুন ধারা তৈরি হয়, সেটি আজো আছে, তবে ম্রিয়মাণভাবে। এ ম্রিয়মাণতার প্রধান কারণ অস্পষ্ট নীতি আদর্শ। সাংবাদিকতায় কিংবা রাজনীতিতে যেটি সবচেয়ে জরুরি তা হলো— একটি নীতি, একটি আদর্শ। এজন্য বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে বারবার ফিরে যেতে হবে মানিক মিয়ার কাছে। বর্তমান বাংলাদেশে যে স্তাবকতার রাজনীতি আর তোষামোদির সাংবাদিকতা দেখি, সেখানে মানিক মিয়া পূর্ব-প্রজন্মের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে, দূর আকাশের জ্বলজ্বলে তারা হয়ে ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ১৯৬৯ সালের ১ জুন রাওয়ালপিণ্ডির একটি হোটেলকক্ষে আকস্মিকভাবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু আমাদের কাছে তিনি অমর, চিরঞ্জীব— সাংবাদিকতার এক অমূল্য মণি, মূল্যবান এক মাণিক্য।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





