বাংলাদেশের শীর্ষতম কসমোলজিস্ট এবং গণিতবিদ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম। কেমব্রিজ-শিক্ষিত এই মানুষটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমাকে ‘ছিলেন’ লিখতে হচ্ছে। এমন অবশ্য হবার কথা ছিল না, তবে মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। অধ্যাপক ইসলাম আমাদের মাঝে আর নেই। তিনি চলে গেছেন কোন সুদূরের পানে। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর শিক্ষা, গবেষণা-নির্দেশনাসংবলিত তাঁর সায়েন্টিফিক পেপারগুলো। আর রয়ে গেল তাঁর অনবদ্য বইগুলো। তাঁর তিনটির মতো বাংলা বই আছে। বাকিগুলো ইংরেজিতে লেখা এবং সেই তিনটির সবক’টিই কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশ করেছে। এও এক অনবদ্য ইতিহাস। এমন সৌভাগ্য ক’জনেরই বা হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশে বসে? কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় প্রায় সম্পূর্ণ অচেনা বিশ্বমানের এই মানুষটি জাতির চোখের সামনে দিয়ে জীবনদীপ সাঙ্গ করে চলে গেলেন। আর মিডিয়ারইবা দোষ কী! শোনা যায়, বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের কোনো এক সভায় তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন, যথাসময়ের কিছু পরে তিনি সভায় গেলেন, কিন্তু সভাস্থলের কেউই তাঁকে চেনেন না। বেশ উপেক্ষিত কিছু সময় পর জনৈক অতিরিক্ত সচিব তাঁকে চিনতে সফল হলে কিছুটা আলোকসম্পাত পায় তাঁর উপস্থিতি। এই হলো এই পোড়া দেশে বিজ্ঞানীদের অবস্থা!
অথচ জামাল নজরুল ইসলামই যুক্তরাজ্যের সুন্দর চকচকে চাকরি, এলিট ব্রিটিশ সায়েন্স এস্টাবলিশমেন্ট ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন ছেড়ে বাংলা মায়ের ভালোবাসায় দেশে ফিরে আসেন, আলো জ্বালেন তাঁর পৈতৃক ভিটায়, আর আলো জ্বালেন দেশের শিক্ষাঙ্গনে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি অলোকসামান্য প্রতিষ্ঠান। আমাদের মনে রাখতে হবে, অধ্যাপক ইসলাম লোকান্তরে চলে গেলেও তাঁর নিজের হাতেগড়া এই প্রতিষ্ঠানটি আজো রয়ে গেছে। এর সম্ভাবনাটুকুর পূর্ণ নির্যাস যদি আমরা নিতে না পারি, তাহলে সেটা হবে আমাদের আরো একটি জাতীয় ব্যর্থতা। আমাদের আরো মনে রাখতে হবে, একজন জামাল নজরুল ইসলাম তৈরি করতে একটি পরিবারের অনেক কালের সযত্ন পরিচর্যা লাগে, একটা পরিবেশ লাগে। জামাল নজরুলরা হাজারে হাজারে জন্মায় না। জামাল নজরুলরা শ্রেষ্ঠ কাব্যের মতো, যাঁরা ‘বিতাড়িত হবার নয়’। আমরা যে একটি ‘জামাল নজরুল’ পেলাম, তাঁকে তো হেলায় হারালাম, আরেকটি ‘জামাল নজরুল’ পেতে আমাদের আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলার এই ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যটিকে’ আমি প্রথম দেখি নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান জাদুঘর আয়োজিত ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞান বক্তৃতামালায়’। চমত্কার সুদর্শন মানুষটি ঝরঝরে ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে ভালোবাসতেন, বাংলায় অতটা সড়গড় ছিলেন না। তাঁকে খুব কাছে না পেলেও তাঁর কয়েকটি বই ছিল আমার নিত্যসঙ্গী। ব্যক্তিগত কথোপকথনে তিনি ছিলেন এক আশ্চর্য অমায়িক মানুষ, বিলেত-শিক্ষিতরা যেমনটি বলে থাকেন ‘সাচ আ জেন্টলম্যান’! একটা দৃশ্য মনে পড়ে বিজ্ঞান-বক্তৃতা শেষে অধ্যাপক ইসলাম সবার সঙ্গে প্রশ্নোত্তর অথবা কুশল বিনিময় করছেন, এমন সময়ে স্যারের আত্মীয় প্রয়াত সেলিনা বাহার জামান এসে আলত করে পিঠে হাত রাখলেন, বললেন ‘জেম্যাল’, অধ্যাপক ইসলাম অতঃপর পারিবারিক আলোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন। এমনি পরিপাটি ছিলেন মানুষটি।
জামাল নজরুল ইসলামের প্রথম জনবোধ্য গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষায় লেখা। বইটির নাম দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স, প্রকাশকাল ১৯৮৩, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। এই গ্রন্থটি তাঁকে জগেজাড়া খ্যাতি এনে দেয়। এমনকি বইটি কয়েকটি বিদেশী ভাষাতেও মুদ্রিত হয়েছে। এই বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “১৯৭৭ সালে ‘কোয়াটারলি জার্নাল অব দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটি’তে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের টেকনিক্যাল পেপার লিখি, যার নাম ছিল ‘পসিবল আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স’। আমার কয়েকজন সহকর্মী এই পেপারটিকে বেশ পছন্দ করলেন। ঠিক তখনই ওয়েইনবার্গের অসাধারণ বই দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস প্রকাশিত হয় এবং তখন আমার মনে হলো, মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে একটি বই থাকলে বেশ হতো।”
তার পরিণতিতেই মহাবিশ্বের নিয়তি-সংক্রান্ত উক্ত গ্রন্থটি তিনি লিখে ফেলেন এমন পাঠকের জন্য, ‘যার বিজ্ঞান-বিষয়ক তেমন কোনো জ্ঞান নেই।’ তবে বইটিতে কোনো অতিসরলীকরণের প্রচেষ্টা নেই, ‘তার অর্থ বইয়ের কোনো কোনো অংশে বিজ্ঞান-না-জানা পাঠকের গভীর মনোযোগের দরকার হবে।’ কিন্তু তার পরও বলা যায়, এই বইটির আন্তর্জাতিক প্রচারই অধ্যাপক ইসলামকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ্যেও সুপরিচিতি এনে দিয়েছিল।
এ নাতিদীর্ঘ বইটি মহাবিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের এবং তার পরিণতির একটি প্রাথমিক ধারণা সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরে। এর ভাষা সরল। কিন্তু মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের দিকে এই বইটি সহজেই পাঠককে নিয়ে যায়। সত্যি বলতে কি, অধ্যাপক ইসলামের উপরোক্ত ১৯৭৭-পেপারটি প্রকাশের পর পরই প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের বিখ্যাত অধ্যাপক ফ্রিম্যান ডাইসন একটি পেপার লেখেন মহাবিশ্বের ভবিতব্য এবং তাতে প্রাণসত্তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে (‘টাইম উইদাউট অ্যান্ড: ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োলজি ইন অ্যান ওপেন ইউনিভার্স’, রিভিউজ অব মডার্ন ফিজিক্স, খণ্ড-৫১, পৃষ্ঠা ৪৪৭৩৪৬০, ১৯৭৯)। এই পেপারটি শিগগিরই এই বিষয়ে ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। তাঁর সেই পেপারের সূত্রে এবং ডাইসনের গবেষণার একটি জনবোধ্য ভাষ্য দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স বইটি। দুঃখজনক যে বইটির বাংলা অনুবাদ হয়নি এবং এর কোনো সংস্করণও বের হয়নি।
অধ্যাপক ইসলামের আরেকটি সুবিদিত ইংরেজি গ্রন্থ হলো অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিকাল কসমোলজি, প্রকাশক যথারীতি কেমব্রিজ। প্রকাশকাল ১৯৯২ ও ২০০৪। অর্থাত্, বইটির আন্তর্জাতিক মণ্ডলে প্রাসঙ্গিকতা এত বেশি যে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়েছে। বইটি মহাকাশকে কীভাবে বুঝতে হবে তার গাণিতিক সৌধ নির্মাণ করে। আকাশকে গণনা করতে হলে এ বইটি কাজে লাগবে। জেনারেল রিলেটিভিটি থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের কয়েকটি মডেল এখানে আলোচিত হয়েছে। বইটি নিঃসন্দেহে মহাকাশ গবেষণার সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করবে। তবে কসমোলজি বা বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব শিখতে হলে অন্য আরো কিছু ভালো বই আছে, সেই তুলনায় সমালোচকদের ভাষায় অধ্যাপক ইসলামের এই বইটি অনেকটা ইন্ট্রোডাকটরি রিভিউয়ের মতো কাজে দেবে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের ভূমিকাতেই স্যার ‘দ্য থ্রি উইমেন ইন মাই লাইফের’ কথা বলেছেন, এঁরা হলেন স্যারের স্ত্রী সুরাইয়া এবং দুই কন্যা সাদাফ ও নার্গিস।
অধ্যাপক ইসলামের প্রথম বাংলা বই কৃষ্ণবিবর; প্রকাশকাল ১৯৮৫, প্রকাশক বাংলা একাডেমি। সুন্দর বাংলায় অত্যন্ত সংক্ষেপে অধ্যাপক ইসলাম এখানে ব্ল্যাকহোলদের প্রকৃতি বাংলার মানুষের জন্য সহজ ভাষায় রচনা করেছেন। এই বইটি ছিল বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহত্তম সৃষ্টি ‘অমর একুশে গ্রন্থমালা’র অংশ। এই গ্রন্থমালার অনেকগুলো বই বাংলায় এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, অনেক বইয়েরই দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
কৃষ্ণবিবর বইটিও সেই পর্যায়ের জনপ্রিয়তা পায় এবং এখন সেটি সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে। দুঃখের বিষয়, এ ধরনের গ্রন্থমালা নতুন করে করার কোনো পরিকল্পনা বাংলা একাডেমির আর দেখা যায় না। কৃষ্ণবিবর নিয়ে অধ্যাপক ইসলাম আগ্রহী ছিলেন, কারণ ‘অনাগত ভবিষ্যতে বিশ্বের কী অবস্থা হবে এবং কী ঘটনা ঘটবে, এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ব্যাপারে কৃষ্ণবিবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।’
পাশাপাশি বাংলায় ব্ল্যাকহোলের একটি চমত্কার পরিভাষাও সংযোজন করে কৃষ্ণবিবর। শুনেছি এই বইটি লিখতে বাংলার আরেক কিংবদন্তি বিজ্ঞানী প্রফেসর এ. এম. হারুন-অর-রশীদ যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন। বাংলার এই দুই মনীষী কসমোলজিস্ট ছিলেন, যারা বাংলার শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা হাতে মহাকাশকে কীভাবে গণনা করতে হয়, তা শেখাতে ব্রতী ছিলেন। তাঁদের দুজনের মধ্যে কনিষ্ঠজনই ছিলেন জামাল নজরুল! তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মীর প্রতি প্রফেসর হারুন-অর-রশীদ এক মর্মন্তুদ শোকগাথায় লিখেছেন (বিডিনিউজ ১৮ মার্চ, ২০১৩), অস্বীকার করার উপায় নাই যে বন্ধুবর জে এন ইসলামের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা সুযোগে আমার জীবনেও ‘বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব’ নিয়ে পড়াশোনা করার উত্সাহ হয়েছে। আমাদের অপূর্ব এই মহাবিশ্ব গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলাম: স্টিফেন হকিং তাঁর এ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম (২০০৫) গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে বোধহয় কিছুটা হতাশ হয়েই লিখেছেন: আমরা এক পাগল-করা বিশ্ব পেয়েছি। আমরা চারদিকে যা দেখছি, তার অর্থোদ্ধার করতে চাই এবং জানতে চাই, এই বিশ্বের প্রকৃতি ঠিক কী? এখানে আমাদের স্থান কোথায় এবং এই বিশ্ব আর এই আমরা কোথা থেকে এলাম? এই বিশ্ব আমরা ঠিক যেভাবে দেখছি সেটাইবা কেন? এসব স্টিফেন হকিংয়ের যেমন প্রশ্ন, তেমনি তা জে এন ইসলাম এবং আমাদেরও প্রশ্ন। দুঃখ এই যে আমাদের অতি প্রিয় জে এন ইসলামের সঙ্গে এসব প্রশ্ন নিয়ে আরো আলোচনা করার সুযোগ আর আমাদের থাকবে না।
চট্টগ্রাম শহরের সার্সন রোডের পিয়ানো-বাদক এই নিভৃতচারী অমায়িক বিজ্ঞানীটি মহাবিশ্বের পরিণতি গণনা করতে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর নিজস্ব কর্মপরিধিতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন, বিলাতের এলিট বিজ্ঞানী-সমাজের সঙ্গে তাঁর হূদ্যতা ছিল, মহাকাশের গাণিতিক সৌধ তাঁর নখদর্পণে ছিল; কিন্তু এই অমায়িক মানুষটির কাজ শেষ হয়েছে তা বলা যায় না। তাঁর কাজের ধারাবাহিকতায়, এই দেশকে বিজ্ঞান গবেষণায় উন্নত করতে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করাই আমাদের এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, তড়িেকৗশল, বুয়েট






