‘তোমাকে সর্বপ্রথম হতে হবে একজন বাঙালি এবং একই সঙ্গে বিশ্বমানব।’ এ উক্তিটি করেছিলেন বাংলাদেশের তথা এ উপমহাদেশের প্রথিতযশা এবং আধুনিক স্থাপত্যকলার পথিকৃত মুক্তিযোদ্ধা স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। তিনি নিজেও একই সঙ্গে ছিলেন বাঙালির এবং বিশ্বের। তিনি তার নকশার মাধ্যমে নিজেকে ভেঙেছেন এবং গড়েছেন। বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য পেশা চর্চার পথিকৃত। তিনি তার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থপতিদের অনুপ্রাণিত করে গেছেন। তিনি তার কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন স্থাপত্য কেবল একটি নকশা নয়, তা একই সঙ্গে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা।

মাজহারুল ইসলাম স্থাপত্যের প্রেরণা এবং সত্য শিখেছেন তার গুরু লে কুর্বের কাছ থেকে। শিল্পের ক্ষেত্রে সত্য সরাসরি আসে শিল্পীর হাতে। এ জায়গাটিতে সৃষ্টিশীলতার উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত। শিল্পী ও দর্শনের সম্পর্ক মাজহারুল ইসলাম এভাবে বুঝেছেন। বোঝার অর্থ, চোখ, মন ও হূদয়ের সাড়া দেয়া। লে কুর্বে এ সত্যটাই মাজহারুল ইসলামকে শিখিয়েছেন। স্থপতির কাজ চোখ খুলে দেয়া, মনকে অসীম করা এবং হূদয়কে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে রাখা। মাজহারুল ইসলাম এই বিশ্বাস থেকে কাজ করেছেন। তিনি তার কাজ সম্পর্কে একটা ধারণা দেন তার উক্তিতে। তিনি বলেছিলেন, ‘কিসের প্রতীক? কেন প্রতীক? কার জন্য প্রতীক? এ প্রশ্নগুলো আমার মাথায় সবসময় ঘুরপাক খায়। এ প্রশ্নগুলো আমাকে একটা ধাঁধার মধ্যে রাখে। এবং আমি মনে করি এ প্রতীক মানবসভ্যতাকে হাজার বছর ধরে আমাদের একটা অন্ধকারের মধ্যে রেখেছে। আমি এ প্রতীকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি। কেননা এ প্রতীকযুক্ত কাজ আমাকে একটা নির্দিষ্ট বৃত্তের ভেতরে বন্দি করে রাখে। আমি আমাকে কোনো সীমানা দ্বারা বন্দি রাখতে চাই না।’ স্থাপত্য সম্বন্ধে তার বার্তা হচ্ছে; স্থাপত্যকে হতে হবে ইন্দ্রিয়ঘন, সভ্যতা ও শিল্পের মূল্যবোধ। সেজন্য কি বলেছেন যে, স্থাপত্য শেষ পর্যন্ত একটি নান্দনিক গবেষণার ফসল।

মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য-বিষয়ক ড্রইংগুলো এক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করে। ড্রইংগুলোয় আছে ছোট স্কেচ, মনুমেন্টাল কাঠামো; যেন লে কুর্বের হাত থেকে এসবের উত্পত্তি, বিভিন্ন ধরনের নকশা তিনি বহুভাবে করেছেন। তিনি কোনোটিতে তুষ্ট হতে পারেননি, অন্যভাবে বলা যায় বিধাতা তাকে কখনো তুষ্ট করেননি। অতৃপ্তি তাকে কুঁরে কুঁরে খেয়েছে। অতৃপ্তি কি শিল্পীকে বড় করে? ড্রইংয়ের পরিপূরক হচ্ছে মডেল। দুজনের কারো কাছেই ভবনের সম্পূর্ণ ফটোগ্রাফ নেই। হয়তো, উদ্দেশ্য হচ্ছে সৃষ্টিশীলতার অ্যানাটমি প্রদর্শন করা, যে মুহূর্ত থেকে ডিজাইন ফর্ম আকার নেয় গভীরভাবে ও জটিলভাবে, এভাবে তৈরি হতে থাকে স্থাপত্য ও স্থাপত্যের আধুনিকতা। মাজহারুল ইসলাম এ কাজটা করেছেন নিবিড়ভাবে। এ ধরনের কাজ যেকোনো ব্যক্তির দেখার ভিত নাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় স্থপতি নামক ব্যক্তির ধারণার দিকে। মাজহারুল ইসলাম কাজ করেছেন অনেক অনেক পরে, যখন লে কুর্বে আর নেই। লে কুর্বে থেকে তিনি ধার করেছেন স্থাপত্যের ইউটোপিয়ান বোধ। এই ইউটোপিয়ান বোধ তিনি শিখেছেন পশ্চিমে, যেখানে তিনি পড়াশোনা করতে যান। তিনি এমন এক দেশ থেকে গেছেন, যেখানে স্থাপত্যের আধুনিক বোধ বলতে কিছু ছিল না। কার্জন হল কি আধুনিক? কিংবা পুরনো লাটভবন? এসব তাকে শক্তি জোগায়নি। তিনি শক্তি পেয়েছেন পশ্চিম থেকে, আর সেই শক্তিকে তিনি ব্যবহার করেছেন পশ্চিমের আধুনিকতা অর্জনের জন্য। তার আধুনিকতার মধ্যে স্পেস, সূর্যের আলোক এবং গাছগাছালি ও ঘাসের বিস্তার। স্থাপত্য সম্বন্ধে তার বোধ বিশের দশক ও তিরিশের দশকের, যা তিনি ব্যবহার করেছেন লে কুর্বে থেকে। লে কুর্বের তিনি শিষ্য, প্রথম শ্রেণীর শিষ্য, গুরুর কাছ থেকে শিখেছেন কী করে ব্রিটিশ কলোনিয়ান আমলের ইটকাঠ ফেলে দিয়ে ইউরোপের আধুনিকতা অর্জন করতে হয় এবং এ অর্জনকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে হয়। নিসর্গের মধ্যে তিনি খুঁজেছেন তার প্রতিভার ঐশ্বরিকতা, তার কাজ করার ক্ষমতা এবং বোধের মধ্যে চেয়েছেন আলোকের বিস্তার, বাতাসের চলাফেরা, গাছপালার মধ্যে আকাশের কূলহীনতা। তার মধ্যে আরো আছে মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কাঠ কুড়ানি জনমানুষ। এদের তিনি দেখেছেন, এদের জন্য বাড়ি বানিয়েছেন এবং ঘরবাড়ির মধ্যে আধুনিকতার ব্যবহার করেছেন। তার বক্তব্য— মানুষ আধুনিক হোক, আধুনিকতার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পৃথিবীর দিকে তাকাক।

জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৯৬৭-১৯৭০) কথা ভাবা যাক। বিরাট, বিশাল জায়গার মধ্যে যেখানে-সেখানে ঝিল ছড়ানো, সেই ছড়ানো বিস্তৃতির মধ্যে ঝিল ছড়ানো পানির মধ্যে এবং ঝিল ছড়ানো বিভিন্ন পাড়ের মধ্যে তিনি গড়েছেন তার বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন ভবন ঝিল ঘিরে, ভবনগুলো দোতলার চেয়ে উঁচু নয়, দোতলা এবং গাছের উচ্চতা সমান আর মানুষের বংশধররা: শিক্ষার্থীরা এসব ঝিল, গাছপালা ছড়ানো রাস্তার মধ্য দিয়ে ভবনগুলোয় যায় এবং ঝিলগুলোর পাড়ে বসে গল্প করে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৯৬৮-১৯৭১) কথা ভাবা যাক। পাহাড়ে পাহাড়ে ছড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসভূমি। বিভিন্ন ভবন বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায়। চূড়ায় সূর্য ওঠে এবং চাঁদ ওঠে। ভবনগুলো হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টিশীল আইডিয়া: নান্দনিকতা পাহাড় ঘিরে, ভবন ঘিরে এবং শিক্ষার্থীদের হলগুলো ঘিরে। মাজহারুল ইসলামের ভিশন প্রথাবিরোধী, যেন প্রতিটি ভবন আইডিয়ার টেক্সটবুক, তিনি প্রতিটি ভবনে নিজের ছাপ মেরে রেখেছেন।

মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের সব গ্রাম, যা বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেগুলোকে গুচ্ছগ্রাম করতে চেয়েছিলেন। তিনি শহর ও গ্রামের যে পার্থক্য সেটাকে কমিয়ে আনতে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তিনি শহর সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘শহরগুলোকে অবশ্যই তার বাসিন্দাদের জন্য একটি পরিবেশ উপহার দিতে হবে, যেখানে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ছড়িয়ে থাকবে। একটি শহর যা একটি দেশের ভৌত পরিবেশ হিসেবে থাকবে, যার মূল উদ্দেশ্য হবে শহর ও গ্রামের মধ্যকার সব পার্থক্য মুছে ফেলা। পরিবেশের সঙ্গে শহরের চিরাচরিত সম্পর্কটাকে বজায় রাখতে হবে।’

এছাড়া তার অন্যান্য কাজের মধ্যে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ (কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস নামে প্রতিষ্ঠিত), পাবলিক লাইব্রেরি ভবন (১৯৫৩-১৯৫৪), কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, মতিঝিল (১৯৬৫-১৯৭১), জীবন বীমা ভবন, মতিঝিল (১৯৬৫-১৯৭১), জাতীয় গ্রন্থাগার ও জাতীয় আর্কাইভ ভবন, শেরেবাংলা নগর (১৯৮০-১৯৮৪), বিশ্বব্যাংক অফিস ভবন (১৯৮৭), নতুন রাঙ্গামাটি শহর পরিকল্পনা (১৯৬৩-১৯৬৪), চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য আবাসন প্রকল্প, আজিমপুর (১৯৬২), বিসিএসআইআর লাইব্রেরি ভবন, ঢাকা (১৯৬৩-১৯৬৫)। এছাড়া বিদেশী স্থপতি স্ট্যানলি টাইগারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, সিলেট ও বরিশালের জন্য পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নকশাও করেন তিনি।

স্থাপত্যে তার ভূমিকা যেমন অসামান্য, তেমনিভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তার ভূমিকা অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় ন্যাপের কাজকর্মে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং রাতদিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ দলীয় অনেক কাজে তার ওপর নির্ভর করতেন। যেহেতু তার ছাত্রজীবন কলকাতায় কেটেছে, সেহেতু কলকাতায় তার অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং তাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমবেত করে ভারতীয় জনগণ ও সরকারের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে সচেষ্ট হন। তার এসব বন্ধু যার যার কর্মক্ষেত্রে সবাই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এছাড়া মুজিবনগর সরকার, বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ তাকে অত্যন্ত উচ্চ মূল্যায়ন করতেন। সঙ্গত কারণে ন্যাপের পক্ষ থেকে ভারত সরকার ও মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের কাজটাও তিনি করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে উচ্চ মূল্যায়ন করতেন, তিনিও বঙ্গবন্ধুকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। এছাড়া দুই পরিবারের মধ্যেও অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় ফিরে এসে তিনি তার পেশাগত দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে আমাদের সঙ্গে দেশ গড়ার আন্দোলনে অত্যন্ত উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ন্যাপের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে দলের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান তিনি। পাকিস্তান আমলে তার আয় ছিল ঈর্ষণীয়। আয়ের একটা বড় অংশ তিনি কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী, ছায়ানটসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীদের পেছনে ব্যয় করতেন অকাতরে এবং তার ধানমন্ডি ও পরীবাগের বাসা কাম অফিস ছিল প্রগতিশীলদের আশ্রয়স্থল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যা করার পর সে আবার অনেকের সঙ্গে কলকাতায় আশ্রয় নেন এবং প্রতিবিপ্লবকে পরাস্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো উদ্দীপনা নিয়ে রাজনৈতিক কাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন, যথা— ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টের জাতীয় সম্মেলনে সম্মানিত ফেলোশিপ অর্জন, ১৯৮০ সালে আগা খান পুরস্কারের সম্মানিত বিচারকের দায়িত্ব পালন, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম স্বর্ণপদক অর্জন এবং ভারতের জে কে সিমেন্ট আয়োজিত স্থাপত্যশিল্পে শ্রেষ্ঠ অবদানের জন্য গ্র্যান্ডমাস্টার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

সূত্র: মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ

 

লেখক: সাংবাদিক