‘জীবন বাঁচাতে ও জীবন সাজাতে’— অনন্য-অতুলনীয় এ বিশেষণ কেবল তাঁর মুকুটে শোভা পায়, তাঁর জন্যই যুতসই। সৃষ্টির আনন্দে সময়োচিত উদ্যোগ, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ মানুষকে পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আর লক্ষ্যে অবিচল থাকার মাধ্যমেই একসময় ব্যক্তির গণ্ডি ছাপিয়ে ব্যক্তি পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে আলাদা হলেও সব দেশেই এঁরা সংখ্যায় কম। মোদ্দাকথায় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে সময়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়া সেসব ‘কালোত্তীর্ণ’ মানুষ একেবারে হাতেগোনা। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট এ ভূখণ্ডে জাত বনেদি উদ্যোক্তা হিসেবে স্মরণযোগ্যদের একটি নাম— স্যামসন এইচ চৌধুরী। ছোটবেলায় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন ছিল বলেই মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাবনার আতাইকুলায় শুরু করেন ওষুধের দোকান। বাবার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাবার নামে ‘ইয়াকুব অ্যান্ড সন্স’ বা ‘ই-সন্স’ নামে ছোট্ট ওষুধ কোম্পানি। জীবন রক্ষায় গুণগত মানের ওষুধ তৈরিতে পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে বিরুদ্ধ পরিবেশে পাবনায় গড়ে তোলেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কাস। তাঁর এ উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি আর সৃষ্টির আনন্দে অভিযাত্রী ছিলেন বন্ধু ডা. কাজী হারুনুর রশিদ, ডা. পি কে সাহা ও রাধা বিনোদ রায়। চারজনের সম্মিলিত পুঁজি মাত্র ১৭ হাজার টাকা। চার উদ্যোক্তার সমান অংশগ্রহণের কারণেই কোম্পানির নাম হয় ‘স্কয়ার’। কোম্পানির নামকরণ সম্পর্কে এক সাক্ষাত্কারে স্যামসন এইচ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমরা চারজনে করলাম বলেই নামটা স্কয়ার দিলাম। আরেকটা মানে ছিল যে, ফোর হ্যান্ডস আর ইকুয়াল। সমান না হলো তো আর স্কয়ার (বর্গক্ষেত্র) হচ্ছে না। চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন হিন্দু। উনারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে গেলেন। তারপর আস্তে আস্তে...।’
পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার কারণে চার বছরেই মুনাফা আনতে সক্ষম হয় চৌধুরীর হাতে গড়ে প্রতিষ্ঠান স্কয়ার। কারখানার তৈরি রক্ত পরিশোধনে অত্যন্ত কার্যকর হওয়ায় ‘এস্টন সিরাপ’-এর চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। গুণগত মানের কারণে কয়েক বছরের মাথায় তা রফতানি শুরু হয়। সেদিনের সেই ছোট্ট চারাটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিশাল বৃক্ষে, দেশের সর্ববৃহত্ ওষুধ উত্পাদনকারী কোম্পানিতে। আর এ সফলতার প্রেরণায় তিনি একে একে গড়ে তোলেন পোশাক, প্রসাধনীসহ ২৫টির মতো প্রতিষ্ঠান। খ্যাতি ও প্রাপ্তির আনন্দে গা না ভাসিয়ে গুণগত মানের নতুন নতুন পণ্য উত্পাদনে ছিলেন নিমগ্ন। প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তাঁর এ ঋষিতুল্য ধ্যানজ্ঞানের কারণেই দ্রুততম সময়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পেরেছে স্কয়ার গ্রুপের ওষুধসহ পণ্যগুলো। মানের প্রশ্নে আপস না করায় আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনামের সঙ্গে পণ্য রফতানি করছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর হাতেগড়া প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বদরবারে তাঁর সৃষ্টি পণ্য ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ হিসেবে দূতিয়ালি করে চলছে বহু বছর ধরে।
চিকিত্সক বাবার পেশাগত কারণেই স্যামসন এইচ চৌধুরীর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলায়। চাঁদপুর, পাবনা, ময়মনসিংহে পড়াশোনার পর ভর্তি হন কলকাতার স্কুলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের কারণে পাবনায় ফিরে আসেন। আতাইকুলা স্কুল থেকে পাস করেন মেট্রিকুলেশন। কৌতূহলী মন সবসময় খুঁজে ফিরত নতুনত্বের সন্ধানে। বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে কৈশরে স্যামসন এইচ চৌধুরী চলে যান মুম্বাইয়ে এবং কৃতিত্বের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে। অংশ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। নৌবাহিনীতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান আহরণে বিশেষ কৌতূহল ছিল চৌধুরীর। অদম্য আগ্রহের কারণে নৌবাহিনীতে সদ্যযুক্ত হওয়ার ‘রাডার বিভাগে’ দায়িত্ব দিতে বাধ্য হন কর্মকর্তারা। তিন বছরের সে চাকরি ছেড়ে পাবনা ফিরে যোগ দেন পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা হিসেবে। ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন শৈশব লালিত, তাই তো এ চাকরিতে খুব বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। নিজে কিছু করার অংশ হিসেবে শুরু ওষুধের দোকান। এর পরের গল্পটা সর্বজনবিদিত। শিক্ষা ও চাকরিজীবনের এ বৈচিত্র্য তাকে করে তুলেছিল আরো স্বাপ্নিক, আরো উদ্যোগী। সঙ্গে সততা, বিচক্ষণতা আর সামাজিক দায়িত্ব বোধের কারণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হয় স্যামসন এইচ চৌধুরী।
পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশী তরুণের শিল্প উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অভিজ্ঞ লোকের অভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পদে পদে বাধা তৈরি করত। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধায় শেষ পর্যন্ত উদ্যমী শক্তিকে আটকে রাখতে পারে না, তারও প্রমাণ স্যামসন এইচ চৌধুরী দিয়েছেন। সততার অন্তর্নিহিত শক্তির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষায়, ওই যে ছোটবেলায় আমার ইচ্ছে ছিল ব্যবসা করা এবং আমি করতে চেয়েছি সততার সঙ্গে। সততার সঙ্গে ব্যবসা করা যায় না, এমন কথার সঙ্গে একদম একমত নই। না হওয়ার কী আছে? শিল্প-কলকারখানা স্থাপনসহ বড় বিনিয়োগের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ সময়মতো পরিশোধ না করা এবং খেলাপি হওয়ার বিষয়টি বেশ প্রচলিত। কিন্তু সেই সম্পর্কে আমৃত্যু সজাগ ছিলেন। তাই তো খেলাপি অপসংস্কৃতি তাকে স্পর্শ করেনি কখনো। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তিনি ভেঙেছেন অতিমুনাফা ও খেলাপি ঋণের বেড়াজাল, যা তাকে স্থান দিয়েছে অগ্রপথিকের, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে পাথেয় হয়ে থাকবেন ইতিহাসের পাতায়।
ব্যক্তির মতো সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনেও বাধাবিপত্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন চৌধুরী। বিরুদ্ধ পরিবেশকে জয় করেই এগিয়ে যেতে হয়, পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই এমন বিশ্বাসে বলীয়ান স্যামসন এইচ চৌধুরী কখনো পিছপা হননি। আর পাঁচজনের মতো সমস্যা দেখে থমকে যেতেন না, সমাধানের বিকল্প পথ খুঁজতেন তিনি। আর এ নতুন পথের সন্ধানই তাকে জুগিয়েছে সৃষ্টির প্রেরণা। এক সাক্ষাত্কারে তিনি তুলে ধরেছিলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। ‘আমি প্রথম দিকের একটা ঘটনা বলি। কারখানার জন্য একটা মেশিন আনলাম। কাস্টমসে সেটা আটকে দিল। বলে যে এত বড় মেশিন এনেছেন। কিছু তো দিতে হয়। সে বিরাট এক সমস্যা। আমি কাস্টমসের কালেক্টর পর্যন্ত গেলাম। গিয়ে বোঝালাম। তিনি বললেন, আমি তো সবই বুঝলাম, কিন্তু কথা হচ্ছে যে, আপনারা সুপারিনটেনডেন্টকে একটু বুঝান। শেষ পর্যন্ত আমি লেগে থাকলাম। বিনে পয়সায় মেশিন ছাড়ালাম।’ ব্যবসায়ী হওয়ার পরও তিনি ২০০৪ সাল থেকে তিন বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির চেয়ারপারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যা সত্যিই ব্যতিক্রম এ দেশে।
একলা পথ চললেও তিনি কখনো অতিমুনাফায় আত্মমগ্ন থাকেননি। কোম্পানির অবয়ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। শুধু নিজে নয়, তিন ছেলেকে নিয়ে তিনি লড়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেসের আঞ্চলিক সংগঠন ইপিসিসি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলায় গণহত্যার শিকার মানুষের জন্য জাহাজভর্তি খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর কথা জানায় ডব্লিউসিসি। কিন্তু পূর্ব বাংলায় এলে তা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, এ শঙ্কায় সেই শিপমেন্ট ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন স্যামসন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বরেণ্য এই শিল্প উদ্যোক্তা।
লেখক: সাংবাদিক






