তাঁর জীবনের বিশাল ক্যানভাসে নানা রঙের সমাহার ঘটে, যা সীমিত পরিসরে লেখা বা বর্ণনা করা সত্যি অত্যন্ত কঠিন। ১৯২১ সালে কলকাতা শহরে অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার কর্মস্থলের সুবাদে কলকাতা তিলজলা গোরস্তানেই তাঁর শৈশব, কৈশোরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এর মধ্যেই কীভাবে যেন তাঁর মধ্যে ছবি আঁকার প্রবল ইচ্ছা জেগে ওঠে। মা-বাবার অমতেই অনেকটা বিদ্রোহ করে ১৯৪৩ সালে ভর্তি হলেন কলকাতা আর্ট কলেজে— এই তো তাঁর পথচলা শুরু। সেই ১৯৪৩ সালেই ছবি আঁকা শেখার পাশাপাশি হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা, ছোটদের জন্য সম্পূর্ণ হাতে লেখা ঈদসংখ্যা, শিশু পত্রিকা থেকে ‘আবীর’ নামে তাঁর হাতে লেখা আরেকটি সংকলন বের হয়। যার ভেতরে বহু নামিদামি মানুষের নিজ হাতে লেখা গল্প, কবিতা, গান, স্বাক্ষর, ছবি ইত্যাদি রক্ষিত। সত্যি অবাক করার মতো একটি হাতে লেখা পত্রিকা।
পাড়ায় পাড়ায় শিশু সংগঠন গড়ে তোলায় তিনি ছিলেন একজন সফল সংগঠক। ১৯৪৫ সালে মিস্টার বেঙ্গল উপাধি অর্জন করেন। কেবল তিনি চিত্রশিল্পেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর নানামুখী প্রতিভায় নিজেকে বিকশিত করেছেন। এরই মাঝে দেশ বিভাগ এবং পিতৃবিয়োগ ১৯৪৭ সাল চলে আসতে হলো এপার বাংলায়। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ওপারের সব ছেড়ে এ বাংলায় এসে আবার নতুন করে শুরু হলো তার জীবন সংগ্রাম। সেই সময় ছবি এঁকে উপার্জন করা ছিল অত্যন্ত দুঃসাধ্য। তারই মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে চারুকলা ইনস্টিটিউট করার কাজে সবার সঙ্গে একাত্ম হয়ে শেষ পর্যন্ত গড়ে তুললেন চারু ও কারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউট। যার প্রথম ব্যাচের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেন। এর পাশাপাশি তাঁর মুকুল ফৌজ, ব্রতচারীসহ সামাজিক সংগঠনে নিজেকে সবসময় সম্পৃক্ত করেছেন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সাল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যখন চারদিক উত্তাল, তিনিও সেই সময় সোচ্চার কারণ সেদিনই তাদের একটি আর্ট প্রদর্শনীর উদ্বোধন করার কথা, ফুলবাড়ীর তত্কালীন অস্থায়ী জাদুঘর প্রাঙ্গণে, যা বর্তমানে শহীদ মিনারের পাশেই। সেই দিনের পরিস্থিতি উত্তাল। আমি বলছি ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালের কথা। তিনি দেখা করলেন কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে। কী করবেন, সিদ্ধান্ত কী হবে এ পরিস্থিতিতে তাদের কী করণীয় আছে? কবি সুফিয়া কামালের নির্দেশে তিনি ফিরে এলেন ওই স্থানে এবং প্রদর্শনী স্থগিত করা হলো।
১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁরা ছায়া নাটক করলেন ধূপখোলার মাঠে। সেই নাটক চলাকালীন খবর এল পুলিশের হামলা হবে। খবর পেয়ে সবাই আশ্রয় নিলেন তত্কালীন ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের একটি ঘরে।
এভাবেই তিনি ছবি আঁকার পাশাপাশি সর্বক্ষণ যেকোনো সামাজিক, রাজনৈতিক সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, কখনো ভাবেননি তাঁর নিজের কী হবে।
যেমন দেখেছি ১৯৬৯ থেকে ৭১ গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা। সেই ইয়াহিয়ার বিকৃত পোস্টার থেকে বাংলাদেশের পতাকা, রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম, বাংলাদেশের প্রথম টাকার নকশা থেকে শুরু করে বহু কিছু, যা হয়তো আজ সময়ের ব্যবধানে আমরা ভুলতে বসেছি।
তার প্রথম জীবন ছিল সংগ্রামবহুল। মাথার ওপর ছোট ছোট ভাইবোন নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে এপার বাংলায় এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই এমন অবস্থায় সম্পূর্ণ দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে চলেছেন, যা তিনি আমৃত্যু পালন করে গেছেন অতি ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে। প্রত্যেক ভাইবোনকে দিয়েছেন উচ্চশিক্ষা।
আবার তাঁর ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনের দিকে যদি তাকাই, সেখানেও স্বাভাবিক বিবাহের বয়সের অনেক পরে তিনি তার দায়িত্ব শেষ করে নিজের জীবন শুরু করেন। সেখানেও প্রথম দিকটা ছিল তাঁর অত্যন্ত সুখের। কিন্তু সেখানেও নিয়তির কারণে ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। এক চরম একাকিত্বের মধ্যে পার করতে হয়েছে প্রতিনিয়ত।
যদিও সদা হাস্য এ মানুষটি বুঝতে দিতে চাইতেন না তার অন্তরের অন্তরস্থলের দাহ। আশপাশের সবাইকে নিয়ে নিজেকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করতেন। এই সময়টাকেও তিনি নষ্ট করেননি। এই সময়ে সৃষ্টি করে গেছেন তাঁর অনবদ্য ‘খেরোখাতা’। যাকে আমরা প্রতিদিনের দিনলিপি বা ডায়েরি বলতে পারি। তিনি বলতেন খেরোখাতা। একটি বিশেষ ধরনের লম্বাটে লাল কাপড়ে মোড়া সুতলি দিয়ে খাতার মুখটা বাঁধা। সাধারণত ব্যবসায়ীরা তাদের হিসাব-নিকাশের জন্য এক সময় এ খাতা ব্যবহার করতেন। তিনি প্রতিদিনের দিনলিপি লেখার জন্য একাকিত্বে একনিষ্ঠ যোগ্য সঙ্গী বেছে নিয়েছিলেন। এ খেরোখাতা, যা তিনি তার মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত লিখে গেছেন। রেখে গেলেন মোট ৪৩টি খেরোখাতা, যা দুই খণ্ডে বের হওয়ার অপেক্ষায়।
এতে তাঁর মনের অব্যক্ত সব অনুভূতি পরস্ফুিটিত। আবার এ খাতায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক বিষয়ের ওপরও তার একান্ত নিজস্ব মতামত বহু ঐতিহাসিক ঘটনা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এটি তাঁর আরো একটি অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি। তিনি শুধু লেখেনইনি, এতে প্রচুর শিল্পচর্চা চলেছে। যা দেখার মতো।
সব কিছু ছাপিয়ে অজস্র কাজ করে গেছেন, যা জাতীয় জাদুঘরের পক্ষ থেকে একবার প্রাথমিক বাছাইয়ে তাঁর ছোট ও বড় কাজ মিলিয়ে ১৯৮৮ সাল নাগাদ চার হাজারেরও অনেক বেশি কাজ পাওয়া যায়।
তার পরও তাঁর শিল্পসৃষ্টি থেমে থাকেনি। আমৃত্যু তাঁর হাত চলেছে রেখার টানে। কেবল একজন শিল্পী নন। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত সচেতন বলেই মৃত্যুর ১০ মিনিট আগে তিনি তার রেখার টানে সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন তত্কালীন রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে উক্তি নির্ভীকভাবে, যা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’। এছাড়া ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সম্পৃক্ততা অনস্বীকার্য।
এবার বাবা হিসেবে তোমার স্নেহ-ভালোবাসা আর একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তোমার যে ইচ্ছা জানি না তা আমি কতটুকু সফল করতে পেরেছি। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি তোমার একমাত্র আত্মজা হিসেবে প্রচুর ভালোবাসা তো পেয়েছি এবং ছেলেমেয়ের মধ্যে যে চারিত্রিক পার্থক্য আছে, তাও কখনো বুঝতে পারিনি। যেমন বুঝতে পারিনি মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, নানা ভাগ, জাত, ধর্ম, উচ্চ-নিম্ন। কেবল বুঝতে শিখিয়েছ আমরা সবাই মানুষ। এই বোধগুলো তাঁর কাছ থেকেই শেখা, যে কারণে কখনো এসব শুনলে অবাক হই।
আমার প্রতি বাবার ভালোবাসার একটি স্মৃতি দিয়ে শেষ করি। সময়টা ১৯৭১, ৪ঠা এপ্রিল, ২৫ মার্চ পার হয়েছে। আমরা বলতে আমি, আমার মা সেই সময়টায় ফরিদপুরে আমার নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আটকা পড়ি। ২৫ মার্চ থেকে ঢাকার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কে কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে মা, নানি, খালা, সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আমি তখন নেহাতই ছোট। কেবল এটুকু বুঝতে পারছি কিছু একটা বিপদ ঘটছে।
এই সময় তখনো ফরিদপুর শহরে পাক আর্মিরা ঢোকেনি। এমনিই এক বিকালে ৪ঠা এপ্রিল সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে।
বাড়ির আঙ্গিনায় গন্ধরাজ ফুল সাদা হয়ে খুশবু ছড়াচ্ছে। আমি ওই গাছতলায় দাঁড়িয়ে কিছু ফুল তুলছিলাম। এ সময় হঠাত্ বাড়ির সদর গেটটি খোলার শব্দ পেয়ে চকিত হরিণীর মতো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। কে? পাক আর্মি আসল নাকি। হঠাত্ দেখি আমার বাবা! কাঁধে একটা ঝোলা, ঢুকেই আমাকে দেখতে পেলেন। আমি আব্বা বলে দৌড়ে কাছে যেতেই তিনি আমাকে জন্মদিনের আদর দিলেন। বহু চেষ্টায় ঢাকা থেকে কিছু হেঁটে, কিছু নৌকাতে বিভিন্ন কৌশলে তিনি আমারই জন্মদিনে এসে পৌঁছলেন ফরিদপুর। সেদিনের সেই সন্ধ্যাটা আমি কোনো দিন ভুলব না। যখন সবাই শঙ্কায়-আতঙ্কে বিহ্বল, ঢাকায় সবাই বেঁচে আছে কিনা? ঠিক সেই সময় আব্বাকে দেখে সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন দু’তিন দিন। তার পরই একদিন ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি বাবা নেই। পরে বুঝেছি কোথাও চলে গেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সবাই যেখানে মিলিত হয়েছে, সেখানে।
তার পর কত সময় গড়িয়েছে। আমরা এপারে, বাবা ওপারে। যোগাযোগ কতটুকু ছিল, তা মা-ই ভালো বলতে পারবেন। শুনেছি মায়ের মুখে এক মুক্তিযোদ্ধার হাতে একটি চিরকুট লিখে পাঠিয়েছিলেন বাবা। যেন তার সঙ্গে আমরা চলে আসি। কিন্তু, দুর্ভাগ্য সেই মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে পাকহানাদের হাতে। আর তার সঙ্গে থাকা চিরকুটটি সে গিলে খেয়ে ফেলে যাতে পাক হানাদাররা আমাদের তথ্য জানতে না পারে। তাকে ধরে ফেলে হানাদার বাহিনীর লোকজনরা। কিন্তু তার সঙ্গে থাকা অন্য জনরা পালিয়ে আসে এবং তাদের কাছ থেকেই জানতে পারি। এভাবেই সেই সময়ে দুঃসহ সময়গুলো এখন কেবলই স্মৃতির পাতা উল্টেও...।
তাঁর জীবনের কিছুটা সময় যেমন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য আবার কিছুটা সময় কেটেছে একাকিত্বে। যা তাকে পীড়া দিয়েছে। সময় সময় ব্যাঘাত ঘটেছে তার শিল্প সৃষ্টিতে, তা না হলে হয়তো আরো অজস্র শিল্পী সৃষ্টি করে রেখে যেতে পারতেন তার প্রতিভার স্বাক্ষর।
আর এ মুহূর্তে তাঁদের মতো মানুষের বড় দরকার ছিল। তাই তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিনিয়ত অনুভব করি। বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে আর লেখা যায় না...
লেখক: কামরুল হাসানের মেয়ে






