মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়া
মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে সেন্টার ফর বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজের চেয়ারম্যান ও প্রধান গবেষক। জন্ম কুমিল্লায় ১৯৫২ সালের ২৪ জুলাই। পড়ালেখা যশোর জিলা স্কুল ও ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। এইচএসসি পরীক্ষার ১৮ দিন আগে একাত্তরের ১৩ এপ্রিল যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেন ২ নম্বর সেক্টরে। ১৯৭৪ সালের ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পরের বছর ১১ জানুয়ারি ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুলাই সেখান থেকে অবসর নেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তিনি বিস্তৃত কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক তার বইয়ের সংখ্যা ২৩, সামরিক ইতিহাসের ওপর লেখা একটি এবং শিশুতোষ গ্রন্থ তিনটি। সম্প্রতি অপারেশন সার্চলাইট, ইপিআরের প্রতিরোধ, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার।
মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ভূমিকাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ইপিআরের সংগঠন ও মিশনের (কাজের পরিধি) সঙ্গে সেনাবাহিনীর মিল সামান্যই। সেনাবাহিনী যেমন মিলিটারি, ইপিআর তেমন করে প্যারামিলিটারি। ইপিআর পরিচালিত হতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। যুদ্ধ করা প্যারামিলিটারির কাজ নয়। কাজেই যাদের কাজ যুদ্ধ নয়, তাদের সেভাবে সরঞ্জামও দেয়া হয় না, সে প্রশিক্ষণও দেয়া হয় না, সেই কারিকুলামও শেখানো হয় না। আক্রমণটা পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাকে করল এবং কেন করল? পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যার একটি সামরিক সমাধান বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সামরিক সমাধানের নাম দেয়া হয় অপারেশন সার্চলাইট। এ অপারেশন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় রাও ফরমান আলী এবং মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে। তারা উভয়ই দুটো হালকা নীল কাগজে পেন্সিল দিয়ে লেখেন অপারেশন সার্চলাইট। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার দায়িত্ব ছিল ঢাকা শহর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা। আর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর দায়িত্ব ছিল ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়া গোটা বাংলাদেশ। তখন ১৯ মার্চ। এর পর তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল হামিদকে সেটি পড়ে শোনালেন। জেনালের হামিদ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের কাছে কোনো রিজার্ভ আছে? দুজনই ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়লেন। অর্থাত্ কোনো রিজার্ভ ফোর্স নেই, সব কমিটেড। তিনজনই বিষয়টি নিয়ে ২০ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলাপ করলেন। প্রস্তাব ছিল যে, যখন ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার প্রতিনিধি দল নিয়ে বৈঠকে বসবেন, তখন তাদের গ্রেফতার করা হবে। এ প্রস্তাব শুনে ইয়াহিয়া খান বললেন, তোমরা কি চাও গণতন্ত্রের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ইতিহাসে আমি থাকি? তিনি বললেন— না। আমি বরং পাকিস্তান চলে যাব এবং আমার বিমান যখন পাকিস্তানের আকাশসীমার মধ্যে ঢুকে যাবে, তখন তোমরা অপারেশন সার্চলাইট শুরু করবে। এটাই হলো সংক্ষেপে অপারেশন সার্চলাইটের পটভূমি।
অপারেশন সার্চলাইটে আক্রান্ত হলো কারা?
কাগজের আকারে অপারেশন সার্চলাইট ছোট। প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক চিন্তা করল কোন জায়গাগুলো থেকে প্রতিরোধ আসতে পারে। যেমন— পূর্ব পাকিস্তানে পাঁচটি ইস্টবেঙ্গল ব্যাটালিয়ন ছিল। ফার্স্ট বেঙ্গল, সেকেন্ড বেঙ্গল, থার্ড বেঙ্গল, ফোর্থ বেঙ্গল ও এইট বেঙ্গল। তাদেরও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইনফেনট্রি ব্যাটালিয়নের মতো ওইভাবে সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, প্রশিক্ষণ, সংগঠন সবই ছিল। কাজেই এই পাঁচটি ব্যাটালিয়নকে একেবারে নিউট্রালাইজ করা সহজ নয়।
এর পর আসা যাক, ইপিআর। ইপিআরের ছয়টি সেক্টর ছিল। ১৭টি উইং ছিল। এখন সেগুলো বিজিবি ব্যাটালিয়ন। প্রতিটি উইংয়ে ৪০০-৪৫০ জন লোক ছিল। একটি উইংয়ের দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ছিল প্রায় ৩০ মাইল সীমান্তবর্তী এলাকা। এই ৩০ মাইলের মধ্যে তিনটি কোম্পানি ছিল। এ, বি, সি কোম্পানি। এ তিনটি কোম্পানি থেকে বিওপিগুলোয় লোকবল দেয়া হতো। ইপিআরের সংগঠনের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল বাঙালি জেসিও ও সৈনিক। আর ২০ শতাংশ ছিল অবাঙালি। অফিসারের মধ্যে ঠিক উল্টোটা। ৮০ শতাংশ ছিল অবাঙালি, ২০ শতাংশ ছিল বাঙালি। সেক্টর কমান্ডার, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সব অবাঙালি ছিল। ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের মধ্যে শুধু বাঙালি ছিলেন মেজর আবু উসমান চৌধুরী, মেজর শামসুদ্দিন ও মেজর নাজমুল। বাকি সবাই অবাঙালি। উইংয়ের কমান্ডার ভিন্ন আদর্শের হলে বিদ্রোহ করা কঠিন। উইং হেডকোর্য়াটারে সবাই নেই, তারা বিভিন্ন বিওপিতে ডিপ্লয়েড। তারা উইনিং কমান্ডারকে মেরে ফেলেছে, অবাঙালি অফিসারদের মেরে ফেলেছে। তারপর বিদ্রোহ করেছে।
উল্লেখ করা দরকার, বিওপিগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ইপিআর সদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংস্পর্শ ছিল। তারা যেহেতু রাজনীতিসচেতন ছিল, সেহেতু তাদের মাধ্যমে ইপিআর সৈনিকরাও দেশের পরিস্থিতি-ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিল। বাইরে কী হচ্ছে বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলো জানত না, কিন্তু তেমন অবস্থা ইপিআরের ছিল না। ইপিআর রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন ছিল। কারণ সিভিলিয়ানদের সঙ্গে কথা-আড্ডা হতো তাদের। ফলে তারা বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ করে। যেমন- ঠাকুরগাঁওয়ের নাইন উইং ইপিআর। সুবেদার মেজর খাজিমুদ্দিন বিদ্রোহ করলেন। সেখানে উইং কমান্ডার এবং সহকারী উইং কমান্ডার দুজনই অবাঙালি ছিলেন। তবু তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারেনি। কারণ সৈনিক সবাই বাঙালি। ফলে সেখানে অবাঙালিদের হস্তক্ষেপ আর ছিল না। ইপিআরের বিদ্রোহটা একেক জায়গায় একেক রকম। ইপিআরের সংগঠন ও অবস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে ইউনিট হিসেবে বিদ্রোহ করতে পারেনি।
অপারেশন সার্চলাইটে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার পিলখানায় কি ২৫ মার্চেই হামলা করে?
এখানে দুটো ব্যাটালিয়ন। এইটিন পাঞ্জাব এবং টোয়েনটি টু বালুচ পাকিস্তান থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি আনা হলো। ২২ বালুচকে পিলখানায় থাকতে দেয়া হলো। অপারেশন সার্চলাইটের উদ্দেশ্যই ছিল সংগঠিত প্রতিরোধ যেন বাঙালিরা না করতে পারে। তাই পিলখানায় ইপিআর সদস্যদের নিরস্ত্র করতে হবে, মারতে হবে। ২২ বালুচকে পিলখানায় জায়গা দিল। কেমন করে জায়গা দিল? তারা যুক্তি দেখাল— একটা ব্যাটালিয়নকে জায়গা দেয়ার মতো সেনানিবাসে আর খালি জায়গা নেই। এজন্য তাদের পিলখানায় জায়গা দিল। এবং ২৪ মার্চ বিকালবেলা পিটি করার নামে কয়টা চেকপোস্ট, কার কী অবস্থান হেঁটে হেঁটে তারা জেনে নেয়। ২৫ মার্চ রাতে আক্রমণ করে ২২ বালুচ বাহিনী। পিলখানা ছিল দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেজন্য বেশির ভাগ সৈনিকই আহত হলো, মারা পড়ল ও ধরা পড়ল। শুধু অল্প কিছু সৈনিক কেরানীগঞ্জ দিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছে।
ইপিআর যখন বিদ্রোহ করল, তখন সীমান্তে পাহারা দিল কারা?
ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ডিসব্যান্ড করে দেয়া হলো। গঠন করা হলো ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স নামে নতুন একটা বাহিনী। ইপিআরের অবাঙালি সৈনিক এবং বিহারি মিলে একটা মিলিশিয়া তৈরি করা হলো। তখন আর সীমান্ত পাহারা নেই। তখন বিওপি নেই। কিছু সীমান্ত মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে ইপিআরের ভূমিকা কেমন ছিল?
অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াসটা ইপিআর, সেনাবাহিনী ও বেসামরিক ব্যক্তি সবার একই ছিল। ধীরে ধীরে জানা গেল, বাঙালি সেনারা একত্র হচ্ছে এবং প্রতিরোধ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। আগে প্রয়াস ছিল আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানো। পরবর্তী প্রয়াস ছিল প্রতিরোধ। ইপিআরের মূল ঘাঁটি ছিল বিপিওগুলো। তারা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল পাহারা দিয়েছে। কাজেই তারা বিদ্রোহ করলে কেউ কিছু করতে পারবে না। তবে সমন্বিত বিদ্রোহ সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ কারো পক্ষে করা সম্ভব ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধে ইপিআর বলতে সংগঠনের কোনো ভূমিকা রাখার সম্ভব ছিল না। সৈনিকরা আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র ভূমিকা রেখেছিল। অধিকাংশই বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। ইপিআরের মোট জনবল ছিল সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার। এর মধ্য থেকে ৮১৭ জন শহীদ হয়েছেন। মোটা দাগে প্রায় ২০ শতাংশ সৈনিক শহীদ হয়েছেন। এ থেকেই প্রমাণিত— ইপিআরের সদস্যরা কতটা আত্মত্যাগ করেছেন। তাদের সাহসিকতা এখানেই প্রমাণ হয়।
ইপিআরের যারা প্রাণে বাঁচল, তারা কীভাবে সংগঠিত হলো?
তারা সংগঠিত হয়নি। তারা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর (বিডিএফ) নিয়ন্ত্রণে এল। ইপিআরের দুটো অংশ ছিল। একটা নিয়মিত বাহিনী এবং দ্বিতীয়টা অনিয়মিত বাহিনী। তারা নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হলো। ইংরেজিতে বলা হতো মুক্তিফোর্স বা এমএফ এবং ফিড্রম ফাইটার্স বা এফএফ। এমএফ বলা হতো তাদের, যারা ইউনিফরমধারী এবং ২৫ মার্চে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ইপিআরকে এমএফ হিসেবে ধরা হতো এবং তারা নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে রয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইপিআর নামে কোনো সত্তা ছিল না, স্বকীয়তা ছিল না। তারা বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।






