বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবদান রাখেন। অসংখ্য মানুষ শুরু থেকে শেষ অবধি প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগেরই ফসল স্বাধীনতা লাভ, বিজয় অর্জন করা। তবে কোনো কোনো পেশার মানুষকে প্রথমেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে পিলখানায় অবস্থিত তত্কালীন ইপিআর তথা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস অত্যন্ত গৌরবময় ভূমিকা পালন করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকে ত্বরান্ব্বিত করেছিল।

পাকিস্তান বাহিনী ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে অপারেশন সার্চ লাইট নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি তাদের পূর্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ— যা তারা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বানচাল করতে গ্রহণ করেছিল। সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং তার সহযোগী পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো মার্চ মাসের আগেই এই অপারেশন সার্চ লাইট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গোপনে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। টিক্কা খানসহ বেশ ক’জন সেনা কর্মকর্তা এ অপারেশন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। তারা তাদের পরিকল্পনামতো সম্ভাব্য যেসব বাহিনীর দিক থেকে প্রতিরোধ শুরু হতে পারে, সেটি বিবেচনায় নিয়েই ইপিআর হেডকোয়ার্টার আক্রমণ শুরু করে। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাকিস্তান বাহিনী ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক, বন্দুক, সাঁজোয়া বাহিনীসহ সব সামরিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়ে পরিকল্পনামতোই এগিয়ে যায়। পিলখানা ইপিআর-প্রধান দপ্তরে তখন অবস্থানরত প্রায় আড়াই হাজার সদস্যকে আক্রমণ করতেই ২২তম বেলুচ রেজিমেন্টকে প্রেরণ করা হয়। এরা দপ্তরে ছয়টি ফটক দিয়ে ঢুকে গোটা পিলখানা ইপিআর-প্রধান দপ্তর ঘিরে ফেলে।  রাত ১২টায় তারা প্রথম গুলি ছোড়ে। অতর্কিতে তাদের হামলায় বাঙালি সদস্যদের মধ্যে সাময়িকভাবে কিছুটা আতঙ্ক ছড়ালেও একের পর এক তাদের সব আক্রমণ প্রতিরোধ করতে শুরু করে বাঙালি সদস্যরা। তবে অধিকাংশ বাঙালি সদস্যের হাতে অল্পসংখ্যক অস্ত্র থাকায় বেলুচদের আক্রমণ দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। এখানে বেশ ক’জন বাঙালি ওই রাতে শহীদ হন। তবে অনেকেই দেয়াল টপকে কেরানীগঞ্জের দিকে চলে যান, তারা সেখান থেকে পরদিন প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন। তবে অনেকেই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হয়ে যান, কেউ কেউ নির্যাতনের শিকারে পরিণত হন।

তবে সেই রাতে গভর্নর হাউজ, ডিআইটি ভবন, মিরপুর, গুলশান, রমনার ডাকঘর, কমিশনার ভবন পাহারাতে ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের অনেকেই দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ছিলেন, বিশেষত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ডিআইটি ভবনের ওপর থেকে গভর্নর হাউজের দিকে গুলিবর্ষণ করে। বাঙালি গার্ড সদস্যদের বন্দি করে নিয়ে যায়। প্রায় একশতের মতো বাঙালি ইপিআর সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়। এদের সবাইকে রমনা কালীবাড়ির সন্নিকটে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তবে যেসব বাঙালি ইপিআর সদস্য স্থান ত্যাগ করতে সক্ষম হন, তারা অতিঅল্প সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং ভারতে পাড়ি জমান, বিভিন্ন সেক্টরে তারা যোগদান করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

পিলখানা সদর দপ্তর থেকে ২৫ মার্চ রাতে বের হয়ে আসা ইপিআর সদস্যরাই প্রথমে জিঞ্জিরায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি বাহিনী বড় ধরনের অস্ত্র, গোলা-বারুদ এবং সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করলে ইপিআর বাঙালি সদস্যরা দোহার, নবাবগঞ্জ ও শ্রীনগরে প্রতিরোধ শুরু করেন। ক্রমেই ইপিআর সদস্যরা পুলিশ-আনসারসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধে নেমে পড়েন। দেশের ভেতরেও তারা ছড়িয়ে পড়েন। ভারতে গিয়ে প্রস্তুতি নেয়ার খবর জানাজানি হলে অনেকেই সীমান্ত ত্যাগ করে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, পাটগ্রাম, গনিরহাট, হরিণমারী, তালপুকুর, টাংগন ব্রিজ, বক্সিগঞ্জ, হাতিবান্ধা, সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স সিলেট, বরিশাল, পাবনা, নোয়াখালীতে ইপিআরের সদস্যরা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।

চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে যে প্রতিরোধ যুদ্ধ ২৫ মার্চ রাত থেকে ৩১ মার্চ সংগঠিত ও বিস্তৃত হয়েছিল, তাতে প্রায় দেড় হাজারের মতো বাঙালি ইপিআর সদস্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। শুভপুর ব্রিজ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের হালিশহর, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, শহরের টাইগারপাস, কালুরঘাট, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, কোর্ট বিল্ডিং, মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি স্থাপনায় ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। এসব যুদ্ধে পাক বাহিনীর সৈন্যরা যেমনিভাবে নিহত হয়, একই সঙ্গে ইপিআরের লড়াইরত বাঙালি সদস্যদের বেশ কয়েকজন শহীদ হন।

৩১ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে চট্টগ্রামের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যেসব খণ্ড-বিখণ্ড প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তাতে ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা মূল নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এভাবেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেসব প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত হতে শুরু করে, তাতে বাঙালি ইপিআর সদস্যরা যার যার অবস্থান থেকে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

ইপিআর বাহিনী থেকে অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য যে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব লাভ করেছিলেন, তার মধ্যে দুজনই হচ্ছেন ইপিআর সদস্য। এঁরা হলেন— শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। মুক্তিযুদ্ধে এদের বীরত্বের কথা পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার্থীরা এখন পড়ছেন।

এছাড়া এ বাহিনীর আরো আটজন সদস্য বীরউত্তম উপাধি লাভ করেন। ৩২ জন বীরবিক্রম ও ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধে ইপিআর বাঙালি সদস্যদের আক্রমণে পাকবাহিনীর অসংখ্য সদস্য নিহত ও আহত হয়েছিল। একইভাবে ইপিআরের ৮১৭ সদস্য দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেন, অনেকেই আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ইতিহাসে ইপিআরের সদস্যদের এসব অবদান জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ইপিআর বাহিনীর প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণের গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে তা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারটি সর্বপ্রথম ইপিআরের পিলখানাস্থ ওয়্যারলেসে কর্মরত বাঙালি সদস্যরা গোপনে বহন করেন।

বাংলাদেশের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে যদিও ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার একটি অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, তার পরও ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পর জাতিকে স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়ে প্রতিরোধ শুরু করার মতো ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়ার সুযোগ তার তখন দৃশ্যমানভাবে ছিল না। তারপরও তিনি স্বাধীনতার একটি ঘোষণার বার্তা দেশব্যাপী প্রচারের জন্যে গোপনে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই বার্তাটি কাজী আরেফের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রনেতা পিলখানার ২ নং গেটের তত্কালীন মেজর (পরবর্তীতে শহীদ) শওকত আলীর নিকট হস্তান্তর করেন। পিলখানাস্থ ইপিআর সদর দপ্তর আক্রান্ত হওয়ার একপর্যায়ে এ ঘোষণাপত্রটি জনাব শওকত আলী টেলিগ্রাফের মেসেজের মাধ্যমে মো. আবুল খায়েরের নিকট প্রেরণ করেন। মো. আবুল খায়ের ঘোষণাপত্রটি প্রচারের জন্য দেশের অন্যান্য স্থানেও বার্তাটি টেলিগ্রাফে প্রেরণ করেন। এছাড়া চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতেও এর কপি রাতে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। ২৬ মার্চ এ বার্তাটি চট্টগ্রামে সাইক্লো কপি করে প্রচারের উদ্যোগ নেন রাজনৈতিক নেতারা। এর সূত্র ধরে আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার থেকে এবং সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে কালুরঘাটে চালুকৃত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি স্বকণ্ঠে প্রচার করেন। এখান থেকেই দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি বিবিসিসহ আকাশবাণী প্রচার করে।

সুতরাং এই মহত্ কাজটির মূলে ইপিআরের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। ইপিআরে কর্মরত বাঙালি সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে শেষ অবধি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অবদান রেখেছেন। ইতিহাসের এ অধ্যায় সবার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

 লেখক: অধ্যাপক ও ডিন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়