সীমিত পরিসরে হলেও দীর্ঘদিন পরে নীলের চাষ আবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। দিনাজপুরের কোনো কোনো অঞ্চলে একদা বহুল নিন্দিত ও নন্দিত বাংলার এ অর্থকরী ফসলের চাষ প্রাকৃতিক রঞ্জক হিসেবে শুরু হয়েছে। পরিমাণে স্বল্প হলেও আবার রফতানিও শুরু হয়েছে। পাটখড়ির মতো নীলগাছ থেকে পাওয়া নীলখড়ি একটি নতুন জ্বালানি হিসেবে দিনাজপুরের কোনো কোনো এলাকায় ব্যবহার হচ্ছে, তবে খুবই সীমিত হারে।
বাংলা থেকে নীল বিদায় হয় আন্দোলনের কারণে নয়, জার্মানিতে রাসায়নিক-নীল আবিষ্কারের ফলে এর চাহিদা গুটিয়ে যায়। আজকাল পরিবেশসচেতনতার কারণে মানুষ রাসায়নিক খাদ্য, রঙ, সুতা, বস্ত্র এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছে। এ ইতিবাচক মনোভাবের কারণে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে রাসায়নিক রঙ ব্যবহার ছেড়ে প্রাকৃতিক নীল রঙ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকবে।
আমরা নীল বিদ্রোহের রক্তঝরা কাহিনী পড়ে শিউরে উঠি। নীলকরদের অত্যাচারে, গ্রামের কৃষক, চাষী বউদের হাহাকার নীলদর্পণের পাতায় পাতায় চিত্রিত। সেই হতাশা আর বিচারবিহীন নির্মম যুগে, অসহায় পল্লীকবি লিখেছিলেন,
অসময়ে হরিশ মলো লং এর হলো কারাগার
নীল বাদরে এবার দেশ করলো ছারখার
প্রজার আর প্রাণ বাঁচানো ভার,
নীল বাদরের অত্যাচার থেকে উদ্ধার করার জন্য দেশী এবং বিদেশী হিতৈষীরা যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাও আমরা জানি, সেসব তথ্যের পুনরাবৃত্তি এখানে নিষ্প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নীল চাষের প্রসার এবং নীল বিশ্ববাণিজ্যে বাংলার উত্থান নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।
রাসায়নিক নীল আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত বিশ্ব নীল বাণিজ্যের প্রধান হোতা ছিল তিনটি দেশ— ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ড। এসব দেশে নীলগাছ জন্মায় না, জন্মায় এদের উপনিবেশগুলোয়; যেখানে নীল চাষের দারুণ রমরমা, নীলের পাতাকে প্রক্রিয়াজাত করে নীল রঙ উত্পাদনের কারখানাগুলো এ উপনিবেশেই অবস্থিত। এদের রাজধানীগুলো— প্যারিস, মাদ্রিদ ও লন্ডন ছিল বিশ্ববাজারে নীলের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের কেন্দ্রবিন্দু।
ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে নীলের চাহিদার ঊর্ধ্বগতি শুরু। ফরাসি বিপ্লবের সময় ফান্সের সৈন্যরা নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা শুরু করে। এদের দেখাদেখি প্যারিসের ফ্যাশন ডিজাইনারা নীল রঙের পোশাককে জনপ্রিয় করে তোলে। ফ্রান্সে এর আগে নীল রঙের এত ব্যবহার এত ব্যাপক ছিল না।
বিশ্বায়িত বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর হতে নীলের বেশি সময় লাগেনি। ফরাসি আর ব্রিটিশরা তাদের দখলীকৃত ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও উত্তর আমেরিকায় নীলচাষ ও নীল রঙের উত্পাদনে বিশেষ সফল হয়েছিল। ১৮০০ নাগাদ পৃথিবীর নানা প্রান্তে রফতানিযোগ্য উত্কৃষ্ট প্রাকৃতিক নীল রঙ তৈরি হতে লাগালো। এ বিশ্ববাজারে নীলের দাম এবং গুণমান নিয়েও ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নীল উত্পাদনে মূলধনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সস্তা এবং প্রচুর কৃষক-শ্রমিকদের; প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ও রফতানি বাজার ধরে রাখতে হলে চাই সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক ও কৃষক, যাতে মুনাফার হার বাড়ানো যায়। সারা পৃথিবীর সব ট্রপিক্যাল আর সাব-ট্রপিক্যাল দেশজুড়ে চলল সস্তা মজুর খোঁজার পালা। এরই ধারাবাহিকতায় যেখানে নীল উত্পাদন হয়েছিল, সেখানেই শোষণ, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা এবং দাস শ্রমিক দিয়ে নীল চাষ ও উত্পাদনের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার মাটিতে বিশ্ব নীল বাণিজ্যের করাল ছায়া নেমে এল। এত দিন পর্যন্ত আগ্রা, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলের নীলের নামডাক থাকলেও বিশ্ববাণিজ্যের আওতায় বাংলার তেমন ভূমিকা ছিল না। এবার বাংলা হঠাত্ করে নীল বিশ্ব বাণিজ্যের বড় ভূমিকায় নেমে পড়ল— এর মূল কারণ তিন প্রধান নীল নিয়ন্ত্রকের— স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড— শক্তির হেরফের ঘটায় নীল ব্যবসায়ে ওলটপালট ঘটে গিয়েছিল, আর বাংলা নীল চাষের আওতায় চলে এল। এ ওলটপালটের কাঁধে ভর দিয়ে যুদ্ধের কারণে সেন্ট্রাল আমেরিকার নীলের ওপর স্পেনের কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে গেল। তত দিনে ক্যারিবিয়ানের ওপর ফ্রান্সের আধিপত্য টলে উঠেছে। ব্রিটেনের উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ হারিয়ে ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে গেল। কিন্তু বাংলা জয় এবং বাংলায় নীল চাষের সাফল্যে ইংরেজরা নীল ব্যবসায়ে তাদের হারানো আধিপত্য ফিরে পেয়েছিল। উত্তর আমেরিকার ভাগ্য বিপর্যয় বাংলার নীলচাষীদের শোষণ করে পুষিয়ে নিল ব্রিটেন।
সেন্ট্রাল আমেরিকার নীলের তখন দারুণ জমজমাট ব্যবসা— গুয়াতেমালার নীলের গুণমানের দরুন বাজারে তা চোখ বুজে বিক্রি হয়— সেন্ট্রাল আমেরিকার রফতানি বাজারের জিয়ন কাঠি ছিল গুয়াতেমালার নীল। কিন্তু ১৭৮৯ সালে স্পেন ও ব্রিটেনের যুদ্ধের দরুন ব্রিটেনের বাজারে গুয়াতেমালার এই নীল রফতানি বন্ধ হয়ে গেল; বন্দরে বন্দরে নীলের পাহাড় জমে গেল। ১৮০১ সালে যুদ্ধের পর এ নীলের উত্পাদন আবার বিপর্যস্ত হলো পঙ্গপালের আক্রমণে। প্রায় একযুগ থেমে থেমে এ পঙ্গপালের আক্রমণে গুয়াতেমালার ৫০ শতাংশ নীলের চাষ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপে নীলের ওপর উঁচুহারে কর বসানোর ফলে ইউরোপের বাজারে নীলের দাম চড়া হয়ে গেল। স্পেনের নীলের ওপর বেশি কর বসানো হয়েছিল। ফলে গুয়াতেমালা পিছু হটতে বাধ্য হলো। ভেনিজুয়েলা অবশ্য ভালো নীল উত্পাদন করে বাজারে একটা বড় অংশ দখল করতে পেরেছিল। এরই মধ্যে ব্রিটিশ ভোক্তারা বাংলার নীলকেই বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছিল। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সেন্ট্রাল আমেরিকার নীল ব্রিটেন থেকে এক রকম বিদায় নিতে বাধ্য হলো। বাংলার নীলের দাম ও উত্কর্ষের সঙ্গে অন্যরা টিকতে পারছিল না, এভাবেই বাংলার নীল বিশ্ববাজারে অন্যতম শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছিল, যদিও এর জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছিল বাংলার কৃষক, শ্রমিক, নারী ও শিশুদের।
প্রাথমিক পর্যায়ে নীল উত্পাদন ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া ছিল, তবে কোম্পানির কর্মচারীরা ইচ্ছা করলে ব্যক্তিগতভাবে নীলের ব্যবসা করতে পারতেন, সেক্ষেত্রে কোন বাধা ছিল না। শুরুতে তাদের উত্পাদিত নীল বাধ্যতামূলক কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে হতো, পরে এ নিয়ম প্রত্যাহার করা হয়। নীলের কারবার ফুলে ফেঁপে উঠলে কোম্পানির অনেক শেতাঙ্গ কর্মচারী চাকরির পরিবর্তে নীলের ব্যবসাকে লাভজনক স্বাধীন পেশা হিসেবে লুফে নেয়।
কোম্পানির অনুমতি পেয়ে শেতাঙ্গ ব্যবসায়ীরা প্রথমে দেশীয় জমিদারদের লোভ দেখিয়ে তাদের প্রজাদের দিয়ে নীল বুনিয়ে নিত। বাংলার প্রায় সব জায়গায় নীলকুঠি স্থাপন করে জমিদার ও জোতদারদের থেকে তারা নীল ফসল কিনে রঙ উত্পাদন শুরু করে। পরে লাভের অংক বাড়ানোর জন্য নিজেরাই জমিদারি কিনে ফেলে এবং অন্য জমিদারদের প্রজাদের দাদন দিয়ে তাদের জমিতে নীল বুনতে বাধ্য করতে থাকে। এ দাদন দেয়া হতো কৃষকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং বংশপরম্পরায় এ দাদনের বোঝা তাদের ওপর অভিশাপ হয়ে থাকত। শেষে তাদের লোভ ও স্বেচ্ছাচারিতা এত বেড়ে যায় যে, প্রজাদের ইচ্ছামতো তারা আমিন ও ‘খালাসী’ দিয়ে প্রজাদের উত্কৃষ্ট ধানিজমিতে পর্যন্ত নীল বোনা শুরু করে। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, নীলচুক্তিগুলো নীতিগতভাবে অত্যন্ত আপত্তিকর, নীলচুক্তি ও নীলকরদের বেআইনি কার্যকলাপ এবং অত্যাচারের ফলে দেশের কৃষক প্রায় ভূমিদাসে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে যশোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, খুলনা, ঢাকা, ফরিদপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশালে নীল উত্পন্ন হতো বলে উইলিয়াম হান্টার উল্লেখ করেছেন। পাবনা জেলার পাঁচটি প্রধান কুঠি এবং এর আওতাভুক্ত ৮০/৮২টি কুঠিতে নীল প্রক্রিয়াজাত করা হতো; যশোর ও কুষ্টিয়ায় ব্যাপকভাবে নীল চাষ হতো— এ দুটি এবং পাবনা জেলাই নীল বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় সমগ্র যশোরে এত অধিক নীলকুঠি স্থাপন হয়েছিল, যার দরুন কুঠিয়ালদের মধ্যে প্রায়ই বিবাদ-মারামারি লেগে থাকত। ফলে চারদিকে অরাজকতা সৃষ্টি হয়।
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ঢাকায় নীলের চাষ শুরু হয়। ১৮০৯ এবং ১৮৩৩ সালে এ জেলায় মোট ৩৩টি কুঠিতে নীল উত্পন্ন হতো। নীলের রমরমার যুগে ঢাকা জেলায় কমপক্ষে ৩৭টি কুঠিতে নীল উত্পন্ন হতো বলে ঢাকা-ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে উল্লেখ হয়েছে। সম্ভবত ঢাকা শহরের নীলক্ষেত এলাকা নীল চাষের স্মৃতি বহন করে।
১৭৮০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সর্বপ্রথম বাংলার নীল রফতানি করে, পরে কোম্পানি নীলের ব্যবসায়ে লোকসান দিতে শুরু করে এবং বেসরকারি ইংরেজ বণিকদের হাতে কারবার ছেড়ে দেয়।
নীলকরদের অত্যাচারে নীলের ব্যবসায়ের লোকসান দূর হয়ে ১৭৯২ সালে নীল বাণিজ্য বেশ লাভজনক হয়ে দাঁড়ায়। অত্যাচার-জুলুমের মাত্রাও সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। দাদনের অত্যাচারে প্রজার ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। সে সময়ের ঢাকা থেকে প্রকাশিত ঢাকা প্রকাশের একটি সংখ্যায় লেখা হয়েছিল:
‘হুজুর, নীলকরের দাদন কোন গ্রামের কোন রাইয়তে স্বেচ্ছাধীন গ্রহণ করে না। আমিন খালাসীর সমভিব্যাহারে নীলকর সাহেব বা তাঁহার দেওয়ান ঘোড়ায় চড়িয়া ময়দানে গমনপূর্বক উত্তম উত্তম জমিতে কুঠির মার্ক দিয়া রাইয়তদিগকে নীল করিতে হুকুম দিয়া আইসেন, পরে জমিয়াতের মালিকান রাইয়তদিগের কুঠিতে ধরিয়া আনিয়া বেওয়াওয়ারি করিয়া দাদন লিখিয়া লয়েন। দাদন লইয়া রাইয়তেরা কাঁদিতে কাঁদিতে বাড়ি যায়, যে দিবস যে রাইয়াত দাদন লইয়া আইসে, সে দিবস সে রাইয়তের বাড়িতে মরাকান্না পড়ে। নীলের দ্বারা দাদন পরিশোধ করিয়া ফাজিল পাওনা হলেও রাইয়তদের নামে দাদনের বকেয়া বাকি বলিয়া খাতায় লেখা থাকে। একবার দাদন লইলে রাইয়তেরা সাত পুরুষ ক্লেশ পায়।’ মুনতাসীর মামুন, ঢাকা প্রকাশ ও পূর্ববঙ্গের সমাজ পৃ. ৫৭।
এ ধরনের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত করলে চাষীদের কুঠিতে ধরে নিয়ে তাদের ‘বুনো’ ও ‘লাঠিয়াল’ দিয়ে অত্যাচার করা হতো। কুঠিতে বেআইনি আটক গরু-মহিষাদি জবরদখল এবং নারীদের কুঠিরে ধরে নিয়ে তাদের শ্লীলতাহানি ইত্যাদি অত্যাচার, অনাচারে উনিশ শতকের প্রথমার্ধ প্রজাদের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে ওঠে। এ অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে পল্লী চারণ কবি গান রচনা করেছেন বিস্তর। এ সম্পর্কে পাবনা জেলায় প্রচলিত একটি লোকসংগীত:
‘শুন কুঠিয়ালদের সমাচার কালিদয়ে কুঠি যার,
ক্যানি সাহেব কাইজ্যার করল শুরু;
সে আউশের জমিতে বোনে নীল সব রায়তের হল মুস্কিল।
এ ক্যানি সাহেবকে মীর মশাররফ হোসেন বাল্যকালে দেখেছেন বলে তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে মীর মশাররফ হোসেন তাঁর ‘উদাসীন পাথিকের মনের কথা’ গ্রন্থে বলেছেন,
“সে সময়ে কুষ্টিয়া অঞ্চলে কেনীই রাজা, কেনীই প্রায় হর্তাকর্তার মালিক। যা করে কেনী। কেনীর নামে পুরুষের পালে কাঁপে গর্ভিণীর গর্ভপাত হয়। কেনীর দৌরাত্ম্য আগুনে দেশের লোক জ্বলিয়া পুড়িয়া খাক হইতে লাগিল।”
১৮৫৯-৬০ সালে এ শক্তি মদমত্ত নীলকর ও সংঘবদ্ধ চাষীর মধ্যে বেধে উঠল এক নিদারুণ সংঘাত। বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল পাবনা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা ও নদীয়ায়। প্রায় ৬০ লাখ কৃষক নীল বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন বলে লিখেছেন শাহরিয়ার ইকবাল তার নীল বিদ্রোহ বইয়ে। এ বিদ্রোহ এমন গুরুতর আকার ধারণ করে যে, তদানীন্তন বড়লাট লর্ড ক্যানিং তার এক পত্রে লিখেছেন:
‘আমি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারি যে, সপ্তাহকালব্যাপী নীল হাঙ্গামা আমাকে দিল্লির ঘটনার চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। আমার কেবলই আশঙ্কা হতো, যদি ভয়ে অথবা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনো নির্বোধ কুঠিয়াল একটি বন্দুকের গুলি ছোড়ে, তাহলে নিম্নবঙ্গের সব ক’টি কুঠিতে দাবানল জ্বলে উঠবে।’ দিল্লি সম্পর্কে ইঙ্গিত সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে।
নীলচাষীদের অসন্তোষ ১৮১০ সাল ফ্রান্সিস বুকাননও দেখেছিলেন। তার মতে, দাদন নেয়ার পরই কুঠিয়ালরা চাষীদের ক্রীতদাস হিসেবে গণ্য করত এবং সামান্য অসন্তোষের কারণ ঘটলেই তাদের অবাধে মারধর করত ও আটক করে রাখত।
কুঠিয়ালরা সবসময়ই অনিচ্ছুক চাষীদের দাদনের টাকা ফেরত নিতে ও নীল চাষ বন্ধ করার প্রস্তাব অস্বীকার করতো। চাষীরা সবসময়ই জমির মাপ ও অন্যান্যভাবে প্রতারিত হতো। কেননা উত্পন্ন ফসল দিয়ে কোনোভাবেই খাজনা মেটানো যেত না। প্রসঙ্গত, উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, ১৮৭৩ সালে মালদহে নীলচাষ মূলত ইউরোপীয় মালিকাধীন হলেও স্থানীয় ধনী ব্যক্তিদেরও অনেক কুঠি ছিল।
পরিশেষে একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, সব ইংরেজ শাসনকর্তাই শেতাঙ্গ নীলকরদের হাত ধরা ছিলেন না। ‘নীলদর্পণ’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রচারে সহায়তার জন্য বাংলা সরকারের সেক্রেটারি সিটনকারের পদানবতি ঘটে। নীলের ইতিহাসে আর একজন ইংরেজ-শাসনকর্তা— এসলি ইডেন উত্পীড়িত নীলচাষীদের দুঃখকষ্ট সম্পর্কে তার স্পষ্টবাদিতার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। কেনি, মোরেল প্রভৃতি অত্যাচারী শেতাঙ্গ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে উদারচেতা ইংরেজ ইডেন, পাদ্রি লং, সিটনকার ও ম্যানুয়েল অমর হয়ে রয়েছেন এই লুপ্ত শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে।
জার্মানিতে ১৮৮০ সালে কৃত্রিম নীল আবিষ্কার নীল চাষকে অবলুপ্ত করে দিল। নীল চাষ ক্রমে বন্ধ হয়ে গেল। রাজশাহী, কুষ্টিয়া মালদহে নীল চাষ বন্ধ হয়ে তার জায়গা নিল রেশম কীটের খাদ্য তুতপাতার চাষ ও আমবাগান— যেগুলো এখন বাংলাদেশের অনেক এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।






