পাট হচ্ছে দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত উদ্ভিদ। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাট প্রধানত দুটি প্রজাতির, সাদা পাট (Corchorus capsularis) ও তোষা পাট (Corchorus olitorius)। উড়িয়া শব্দ jhuta বা jota থেকে jute শব্দটির উদ্ভব বলে ধারণা করা হয়। অবশ্য ‘জুটা’ ও ‘পট্ট’ বস্ত্র ব্যবহারের কথা যথাক্রমে বাইবেল এবং মনুসংহিতা ও মহাভারতে উল্লেখ আছে, যা পাটদ্রব্যের সুপ্রাচীন ব্যবহারের সাক্ষ্যবহন করে। কৃষিপণ্য হিসেবে পাটের গুরুত্ব সর্বকালে। একসময় এটি বাগানের উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন এর ব্যবহার ছিল সীমিত; কেবল পাটপাতা সবজি হিসেবে ও চিকিত্সায় ব্যবহার হতো আরব ভুখণ্ডে, বিশেষ করে নীলনদের দেশ মিসরে। জর্ডান ও সিরিয়ায় পাটের পাতা দিয়ে বিশেষ ভেজিটেবল স্যুপ তৈরি করা হতো। সম্রাট আকবরের (১৫৪২-১৬০৫) নবরত্ন সভার অন্যতম উপদেষ্টা আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২) তার আইন-ই-আকবরীতে (১৫৯০) উল্লেখ করেছেন যে, ভারতে দরিদ্র গ্রামবাসী পাটের তৈরি বস্ত্র পরিধান করত।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম অর্থকরী ফসল পাট সোনালি আঁশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে (Emblem) তিনটি পাটপত্র, এমনকি ১৯৫৪ সালে গৃহীত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে পাট এখনো সগৌরব অবস্থান বিরাজ করছে।

পাট শিল্প উন্নয়নে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত। ১৮৩৮ সালে নেদারল্যান্ডস সরকার ইস্ট ইন্ডিজে কফি বহনের জন্য শনের পরিবর্তে চটের থলে সরবরাহের আদেশ দেন। সে সময় শন রাশিয়া থেকে আমদানি করা হতো। ১৮৫৪-৫৬ সালে ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ানরা শন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইংল্যান্ডের ডান্ডির শন মিলগুলো দ্রুত পাটকলে পরিণত হয়। এ সময় ডান্ডির জুট ব্যারোনগণ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশে পাটকল স্থাপনে এগিয়ে আসে। এর আগে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-৬৫) তুলার সরবরাহ সীমিতকরণের সরকারি আদেশ জারি হয়। এর ফলে আমেরিকায় তুলা এবং শন উত্পাদন আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। এ সময় বহু দেশে পাটকল স্থাপন হয় এবং পাট শিল্পের প্রসার ঘটে। ফলে কাঁচা পাটের চাহিদা বাড়তে থাকে। সে কাঁচামালের চাহিদার জোগান দিতে ভারতবর্ষের বাংলার কৃষকরা যথেষ্ট উদ্যোগী হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) সৈন্যদের রসদ ও দ্রব্যসামগ্রী বহনের জন্য পাটের বস্তার ব্যাপক চাহিদা বাড়ে যায়। ফলে পাটের দামও বেড়ে যায়।

পূর্ব বাংলায় পাটের প্রধান উত্পাদনক্ষেত্র হলেও হুগলি নদীর তীরে প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৫ সালে, ডান্ডিতে পাটবস্ত্র্র তৈরি শুরুর ২০ বছর পর। মিল চালানোর মতো দক্ষ জনবল এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে এই বিলম্ব। ১৮৫৪ সালে রানীগঞ্জে কয়লার খনি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যুত্ সরবরাহ শুরু হলে জর্জ অকল্যান্ড নামক একজন ইংরেজ প্রথম পাটকলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভালো লাভ করতে না পারায় ব্যবসা ছেড়ে দেন। ১৮৫৯ সালে বর্নি কোম্পানি দ্বিতীয় পাটকল প্রতিষ্ঠা করে। পাঁচ বছরের মধ্যে লাভ হওয়ার ফলে ১৮৬৬ সালে কলকাতার আশপাশে আরো তিনটি পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৮-৭৩ সময়ে পাটকলগুলো প্রচুর লাভ করতে থাকায় ১৮৭৫ সালে আরো আটটি নতুন পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলায় পাট শিল্পের বৈল্পবিক জোয়ার ঘটে। ১৮৭২ সালে যখন পাটের শিল্পোত্পাদন ব্যবস্থায় যায়, তখন পাট চাষে অগ্রগণ্য জেলাগুলো ছিল পূর্ববঙ্গের পাবনা, বগুড়া, দার্জিলিং, দিনাজপুর, রংপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের হুগলি। ১৮৭২ সালে এসব জেলায় মোট চাষের কৃষিজমির মধ্যে পাট চাষে ব্যবহূত জমির অনুপাত ছিল যথাক্রমে ১০, ১১, ৯, ৭, ৬ ও ৫ শতাংশ। পরে পাট চাষ অন্য অনেক জেলায়ও সম্প্রসারণ হয়। ১৯১৪ সালে জেলাগুলোয় পাট উত্পাদন অনুপাত বৃদ্ধি পায় যথাক্রমে রংপুর (২৮ শতাংশ), বগুড়া (২৫ শতাংশ), ত্রিপুরা (২৪ শতাংশ), পাবনা (২১ শতাংশ), ঢাকা (১৮ শতাংশ), ফরিদপুর (১৬ শতাংশ) হুগলি (১৩ শতাংশ), রাজশাহী (১১ শতাংশ), যশোর (১০ শতাংশ), নদীয়া (১০ শতাংশ) এবং দিনাজপুর (৭ শতাংশ)। কলকাতা ক্রমান্বয়ে ডান্ডির প্রতিযোগী হিসেবে চটের বস্তার অন্যতম রফতানিকারক হিসেবে পরিগণিত হয়। পাট ও পাটবস্ত্র উত্পাদনে কলকাতার অর্থনৈতিক উপযোগিতার দ্বিতীয় কারণ ছিল কলকাতা পূর্ব বাংলার অতি নিকটে, যেখানে পাট উত্পাদন হয়। তৃতীয়ত. এখানকার সস্তা পাটকল শ্রমিক বাজার। চতুর্থত. এখানকার মিলগুলো দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা এবং প্রয়োজনে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত চালু রাখা যেত। ১৮৮০ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত এ ৬০ বছরে পাটকলের সংখ্যা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়, বয়ন বাড়ে ১৪ গুণ, স্পিন্ডেল ১৯ গুণ এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ে ১১ গুণ। মাঝখানে ১৯২৯-৩৩ এ পাঁচ বছরে মহামন্দার কালে পাট শিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং পাটসামগ্রীর চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।

সারণি : বাংলার পাট শিল্পের প্রসার ১৮৮০-১৯৪০

বাংলাদেশের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে একটি মিল স্থাপন হলেও ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে এটি ধ্বংস হলে আর চালু করা সম্ভব হয়নি। এ মিলের যন্ত্রপাতিগুলো হুগলিতে এনে ডেল্টা জুট মিল স্থাপন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নারায়ণগঞ্জে একটি পাটকল স্থাপনের কথা শোনা গেলেও এ ব্যাপারে ওই শতকের পঞ্চশের দশকেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অবস্থা এরূপ দাঁড়ায় যে, পশ্চিম বাংলায় সব পাটকল অবস্থিত হলেও অধিকাংশ কাঁচা পাট পূর্ব অঞ্চল থেকেই নেয়া হতো। এর কারণ খুব একটা অজানা নয়। প্রথমত. পাট একটি রফতানিমুখী শিল্প হওয়ার কারণে পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করার জন্য বাজারের প্রয়োজন ছিল। একমাত্র অনুন্নত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশের বাজারে যাওয়া ব্যতীত পূর্ব বাংলায় পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করার মতো তেমন কোনো বাজার ছিল না। দ্বিতীয়ত. পাট শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয় ভারী যন্ত্রপাতি এবং বড় বড় গুদাম এবং কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলার যেকোনো জেলায় এগুলো পাঠাতে অত্যন্ত উচ্চমূল্য বহন করতে হতো। তৃতীয়ত. হুগলির মিলগুলো রানীগঞ্জের কয়লা খনির নিকট অবস্থিত হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। উল্লেখ্য, ‘বৃহত্তর কলকাতা’ এলাকার তুলনায় পূর্ব বাংলার শহরগুলোয় বিদ্যুতের মূল্য অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল। পরিশেষে রাজধানী শহর হওয়ার কারণে কলকাতা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এসব কারণে একপর্যায়ে পূর্ব বাংলায় পাট শিল্পের বিকাশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান পাট শিল্পের প্রশ্নে একে অন্যের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সব পাটকল ভারতে অবস্থিত হলেও শতকরা ৮০ ভাগ পাট উত্পাদনের এলাকা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ভারতকে তার মিলগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা পাটের অধিকাংশ আমদানি করতে হতো, আর পাকিস্তানের সমস্যা ছিল তার কাঁচা পাট বিক্রয়ের। এ অবস্থায় দুটি দেশ তাদের সীমান্ত দিয়ে পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী মুক্তভাবে চলাচলের জন্য ১৯৪৭ সালে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কারণ ভারত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমদানি-রফতানি শুল্ক আরোপের জন্য পাকিস্তানকে একটি বিদেশী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে কাঁচা পাটের প্রাপ্যতা, পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী উত্পাদনে অতিরিক্ত উচ্চমূল্য এবং উদ্বৃত্ত শ্রমিক নিয়োগের সম্ভাবনা ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানে নিজস্ব পাট শিল্প বিকাশের বিষয়টি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। কিন্তু রফতানি বাণিজ্যের অনিশ্চয়তার বিষয়টি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয় এবং এরূপ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও পাকিস্তানের প্রথম পাটকল বাওয়া জুট মিলস লিমিটেড ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাদের উত্পাদন শুরু করে। দ্বিতীয় মিলটি ভিক্টোরি জুট প্রডাক্টস লিমিটেড এবং তৃতীয় মিল আদমজি জুট মিলস একই বছরের শেষের দিকে উত্পাদন শুরু করে। এগুলো ছিল বেসরকারি খাতের। পরে সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি-উদ্যোক্তাদের মধ্যকার সক্রিয় সহযোগিতায় শিল্প বিকাশের পথ সুগম হয় এবং ১৯৬০ সাল নাগাদ ১৪টি মিলের মধ্যে ১২টি পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের পাটকলগুলো ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিয়েই মূলত বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে ভারত রফতানি বাণিজ্যে নিজের পক্ষে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার রফতানি বোনাস স্কিম চালু করে। এ স্কিমের আওতায় পাট রফতানিকারকরা সাধারণ বিনিময় মূল্য হিসেবে ১ পাউন্ড স্টার্লিংয়ের বিপরীতে ১১.৪৫ রুপি এবং ১ ইউএস ডলারের বিপরীতে ৪.৭৬ রুপি পেত; কিন্তু তাদের একটি বোনাস ভাউচার দেয়া হতো, যা তারা বিলাসবহুল সামগ্রীর আমদানিকারকদের কাছে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি করতে পারত। ভারতের রফতানি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় পাট রফতানির বিপরীতে বোনাসের অনুপাত ওঠানামা করত।

বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের দিকে পাট উত্পাদন খাতে অবাঙালিরাই ছিল বেসরকারি বিনিয়োগকারী, কিন্তু ষাটের দশকের প্রথম দিকে কিছু বাঙালি উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগের উত্সাহ প্রকাশ করে। এ বাঙালি উদ্যোক্তারা নিজস্ব উদ্যোগেই ব্যবসা-বাণিজ্য বা ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল, কিন্তু এরই মধ্যে তারা নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেশকিছু পুঁজি সঞ্চয় করে। অধিকন্তু পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালিদের আধিপত্যমূলক শিল্প বিনিয়োগ রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। মূলত এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ শিল্প খাতে বাঙালির অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সরকারের শিল্পমন্ত্রী এ কে খান পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থাকে দুটি অংশে বিভক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর একটি হবে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এবং অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। তিনি এ নীতিও গ্রহণ করেন যে, ২৫০টি তাঁতমিল নিয়েও টিকে থাকা সম্ভব (পূর্বে ৫০০টি তাঁতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল)। একজন বাঙালি উদ্যোক্তাকে বা একদল উদ্যোক্তাকে ২৫ লাখ টাকার পুঁজি (বা সমপরিমাণ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি) নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় একটি পাটকল স্থাপনের অনুমতি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যবস্থা বাঙালি উদ্যোক্তাদের ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ তাঁত বা বিভিন্ন শ্রেণীর সমগ্র তাঁতের শতকরা ৩২ ভাগ তাঁত নিয়ে ৪১টি পাটকল স্থাপন করতে সাহায্য করে। মাত্র দুই দশকের মধ্যে এরূপ বৃহত্ পাট শিল্প স্থাপন ছিল প্রকৃতই একটি বড় ব্যাপার। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে এ বাঙালি উদ্যোক্তারা প্রায় অপরিচিতই ছিলেন।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর অবাঙালি এবং দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়া মালিকদের পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সরকার জুট বোর্ডকে নির্দেশ দেয়। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সরকার দেশের বিভিন্ন খাতের সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করে। জুট বোর্ড প্রত্যক্ষভাবে বা প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। ব্যবস্থাপনা দক্ষতার বাছবিচার না করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরা ধীরগতিতে সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করছিলেন এবং এটিই ছিল এ শিল্পকে অবহেলার ভিত্তি। মিলের শূন্যপদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক কর্মী অথবা ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের। পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষতির মূল কারণ ছিল কাঁচা পাটের মূল্যবৃদ্ধি, গুদামজাতের বর্ধিত ব্যয়, খুচরা যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য, মজুরি ও বেতন বৃদ্ধি এবং অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি। ক্ষুরধার লেখক আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ তারিখে পাট উত্পাদনের দিকে সাধারণ কৃষক থেকে সরকার পর্যন্ত সবাইকেই নজর দিতে বলেন:

‘পাট আমাদের কৃষক ভাইদের জন্য যেমন একমাত্র ক্যাশ-ক্রপ, আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও তেমনি একমাত্র বিদেশী মুদ্রা। বিদেশী মুদ্রা সব জাতির জন্যই প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের জন্য অপরিহার্য। অন্য জাতির বেলা দরকার উন্নতির জন্য, আমাদের বেলা দরকার বাঁচিবার জন্য। বিদেশী মুদ্রা দিয়া আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হয়। এটা যতই দুর্ভাগ্যের বিষয় হউক, এ অবস্থা আমাদের উন্নয়নের যতই প্রতিবন্ধক হউক, যত দিন আমরা খাদ্য স্বয়ং-নির্ভর না হইতে পারিব তত দিন শুধু বাঁচিয়া থাকিবার জন্যই আমাদের বিদেশী মুদ্রার দরকার।’

পাট শিল্পের সমস্যার পর্যালোচনার জন্য ১৯৭৯-৮০ সালে বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ দেয়া হয়। কমিটি এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করে যে, মিলগুলোর ক্ষতির কারণ হলো: (ক) কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের নৈতিক অবক্ষয়; (খ) প্রশাসনের সর্বস্তরে অপর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ও তদারকি; (গ) উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রণোদনার পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং একাত্ববোধের অভাব; এবং (ঘ) নির্বাহী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার অভাব। কমিটির সুপারিশ অনুসারে শিল্প-কলকারখানার বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু হয় এবং কমিটির সুপারিশ অনুসারে তিনজন বাংলাদেশী মালিকের পাটকল ফেরত দেয়া হয় এবং এরূপ অন্য তিনটি মিল বাংলাদেশীদের কাছে নিলামে বিক্রয় করা হয়। পরবর্তীকালে সরকার এরূপ মিল প্রতিষ্ঠার জন্য পুরনো ও ব্যবহূত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের পরিমাণ উন্মুক্ত করে দেয়। ১৯৮২ সালে সরকার ৩৫টিরও বেশি পাটকল সাবেক বাংলাদেশী মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে। ১৯৮২-৮৪ সালে বেসরকারি খাতের বেশকিছু পাটকল (বিজেএমসির প্রতিনিধিত্বে) মুনাফা অর্জন করে, কিন্তু পরবর্তীকালে এগুলোও আগের ন্যায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের পাট শিল্প যেসব সমস্যার মোকাবেলা করে— (ক) স্থবিরতা বা রফতানি মূল্য হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি; (খ) পুরনো যন্ত্রপাতির উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস; (গ) শ্রমিক সমস্যা; (ঘ) বহুবিস্তৃত দুর্নীতি; (ঙ) অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং এর ফলে পুঞ্জীভূত বিশাল পরিচালন লোকসান প্রভৃতি কারণে একসময়ের একটি গতিশীল শিল্প বর্তমানে ‘অস্তমিত’ শিল্প পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে এবং সোনালি আঁশ তার ঔজ্জ্বল্য অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে। এ সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় প্রযত্ন প্রদত্ত হলে বাংলাদেশে পাট শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে: পাট শিল্পের ৪০ ভাগ উত্পাদন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও এ শিল্প প্রায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। বীমার অর্থ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা প্রদান করে এবং প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ হিসেবে কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে ব্যয় করতে পারে, ১৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে এবং ৩০ লাখ টাকার কাঁচা পাট ব্যবহার করতে পারে। এভাবে পাট শিল্প লাখ লাখ পাটচাষীর জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

তথ্য সূত্র:

১. HC KERR, Report of the Cultivation of, and Trade in, Jute in Bengal, Calcutta, 1877;

২. MW ALI, Jute in the Agrarian History of Bengal, 1870-1914, Rajshahi, 1998.

৩. A.Z.M IFTIKHAR-UL-AWWAL: The Industrial Development of Bengal 1900-1939 (New Delhi 1982),

৪. OMKAR GOSWAMI, Industry, Trade and Peasant Society: The Jute Economy of Eastern India, 1900-1947 (New Delhi 1991);

৫. M. Serajul Huq Khan, Bangladesh Jute Industry (Post Liberation Episode).

৬. এম মোফাখখারুল ইসলাম, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ

৭. বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের ওয়েব পোর্টাল