অভিবাসী হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করে আসছে। দেশটির অভিবাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশীদের সেখানে অভিবাসন প্রক্রিয়া। সেখানকার বড় ও ছোট শহরগুলোয় বাংলাদেশীদের ভিড় বেশ লক্ষণীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। মানুষের জীবনযাত্রা এখানে বেশ জটিল। অভিবাসী ও স্থানীয় দক্ষিণ আফ্রিকান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এ সম্পর্কের জাল বোনা। দেশটিতে থাকা বাংলাদেশী অভিবাসীদের সরাসরি অভিজ্ঞতার আলোকে অর্থনৈতিক কারণে অভিবাসনের বিষয়টি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করা যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই রকমের অভিবাসন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমটি ১৮০০-১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেখা যায়। তখন এক প্রকার লিখিত চুক্তির মাধ্যমে এ দেশের মানুষ শ্রমিক ও দোকানদার হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যেত। এ কাজ করেই তারা জীবিকানির্বাহ করত এবং সেখানে পরিবার নিয়ে থিতু হওয়ার চেষ্টা করত। দ্বিতীয়টি ১৯৮০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে পরিলিক্ষত হতো। এ অভিবাসন প্রক্রিয়া বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান। ১৯৯৪ সালের আগে বাংলাদেশের সরকার অ্যাপারথেইড দেশটির সঙ্গে কোনো প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে ইচ্ছুক ছিল না। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসনের পরিমাণ বেড়ে যায়। সে সময় দেশটির অভিবাসন আইন বৈষম্যমূলক ছিল। এমনকি অ্যাপারথেইড প্রথা উঠিয়ে নেয়ার পরও তা ছিল নিয়ন্ত্রণমূলক ও ভিনদেশীদের প্রতি অবজ্ঞামূলক। বাংলাদেশের অভিবাসীদেরও এ ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছে তাদের বেশির ভাগেরই লক্ষ্য ছিল স্থায়ী পিআর পাওয়ার আগে টেম্পোরারি পিআর অর্জন করা। নিয়মকানুন কঠোর করার পরে এখন অধিকাংশ বাঙালিই রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সেখানে যায়। এভাবে যারা দেশটির স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ লাভ করে তারা সব শর্তপূরণ সাপেক্ষে নিজের পরিবারসহ দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসের সুযোগ অর্জন করে।
অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসন প্রবণতা বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বুঝতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনোফোবিয়া বা ভিনদেশীর প্রতি অবজ্ঞা, দেশটির ইতিহাস, রাজনীতি ও অভিবাসনের আইনকানুন এবং অর্থনীতি। দেশটিতে দক্ষিণ এশীয়দের অভিবাসন প্রচেষ্টা হিসেবে যাদের গবেষণা অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হয় তারা হলেন পার্ক ও রুগুনানান। অভিবাসীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রকে অতিক্রম করে আরো বহুদূরে প্রসারিত হয়।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ জনের আলোচনায় অভিবাসীদের দরিদ্র বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মোটামুটি সচ্ছল লোকেরাই দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসনে যায়। এরা মধ্যবর্তী পরিবারের সন্তান এবং অধিকতর ভালো একটি জীবিকার জন্য সেখানে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় যেতে মোটামুটি ৭-৮ লাখ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ অভিবাসী হতে হলেও একজনের এ পরিমাণের টাকা থাকতে হবে। বাংলাদেশের মধ্যবর্তী পরিবারের লোকদের পক্ষেই টাকাটা জোগাড় করা সম্ভব হয়। এটা অনেকটা ব্যবসায়ের পুঁজির মতো। মধ্যবর্তী পরিবারের এ লোকগুলো যৎসামান্য পড়াশোনাও করে থাকে।
বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক ও মুসলিমপ্রধান সমাজে ছেলেরাই পরিবারের রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। পরিবারের পুরুষরা একাকী বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে পারে। একাকী অভিবাসনের ব্যাপারে মহিলাদের ওপরে কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে। অবশ্য এর মানে কিন্তু এটাও নয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনো নারী অভিবাসী নেই। তবে নারীদের অভিবাসন প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। বৈধ বা অবৈধভাবে দেশটিতে বর্তমানে ৬০-৭০ হাজার লোক বাস করে।
বাংলাদেশ থেকে বড় শহরগুলোয় আসা এ লোকগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রয় করে। দোকানের পেছনেই একটা খুপরি ঘরে তারা বাস করে। অনেকেই একবার কয়েকজন মিলে ছোট একটা ঘর ভাড়া করে। বিবাহিতরা দোকান থেকে আলাদা একটা ঘরে পরিবারের সঙ্গে বাস করে। শহরগুলোয় বাংলাদেশী সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে যারা মূলত জোহানেসবার্গের উপকণ্ঠে ফর্ডসবার্গে থাকে। জায়গাটায় অনেক ভারতীয় ও মুসলিমদের বসবাস, যাদের দ্বারা পরিচালিত অনেক রেস্টুরেন্ট ও হোটেল রয়েছে সেখানে। এসব দোকানে ভারতীয় কাপড়, খাবার মসলা ও সংগীতের সিডিও দেদারসে বিক্রয় হয়। বাংলাদেশীদের দ্বারা পরিচালিত বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁও রয়েছে সেখানে। তাদের সংস্থার সদর দপ্তরও এখানে অবস্থিত। কাজের পরিবেশের বাইরে এবং ঘরের বাইরেও এসব রেস্তোরাঁ ও দোকানগুলোয় পরিবার-পরিজন এবং আত্মীয়দের যাতায়াত পরিলক্ষিত হয়। এভাবেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্ব পায়। জাতি, গোত্র, সহিংসতা, পরিবার, অর্থনৈতিক অভিবাসন ও তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সবই এ গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশীদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বার যখন উন্মুক্ত হয়, তখন তাদের অনেকেই এখানে বিভিন্ন চাকরিতে সহজে প্রবেশ করতে পারেনি। অবশ্যই এর কারণ বাংলাদেশীদের দক্ষতার অভাব। স্পাৎসা বা মুদি দোকান তাদের এখানে কাজ করার একটা সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে কাজ করে তারা বেশ লাভবান হয়। বাংলাদেশের লোকেরা যেসব স্থানে বেশি জমায়েত হয় দোকানগুলো সেখানেই দেয়া হয়। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ ও অক্লান্ত পরিশ্রম করায় বাংলাদেশীরা এ ব্যবসায় সফলতা অর্জন করে। সপ্তাহে সাতদিন তারা দোকানে কাজ করে এবং প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা তাদের খাটতে হয়। কর্মব্যস্ত দিনগুলোয় সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তারা দোকানে থাকে। এ সময়ে দোকানে ক্রেতাদের অত্যধিক ভিড় থাকে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের বর্ণবাদী রাজনীতিতে বাংলাদেশীদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। এদের অধিকাংশই এখানে দোকানদারি করে। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন ভারতীয় দোকানমালিকদের থেকে বাকিতে জিনিসপত্র নিতে পারে। বাকিতে জিনিস নিয়ে বিক্রয় করতে আফ্রিকার দোকানমালিকরা তেমন বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। এতে বাংলাদেশীরা একটি বিশেষ রকমের ব্যবসায়িক সুযোগ অর্জন করে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েই বাংলাদেশের জনগণ যখন তখন মাল মজুদ করে রাখতে পারে এবং এ থেকে ভালো লাভ নিতে পারে। অ্যাপারথেইড-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এভাবে সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
দেশটির শহর ও শহরতলিতে বাংলাদেশী মালিকানাধীন দোকানের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ২০০৫ সালে সেখানে মাত্র দুটি দোকান ছিল। ২০০৭ সালে ছয়টি দোকান এবং ২০১১ সালে প্রায় ২০টি দোকান হয়েছে সেখানে। বাংলাদেশীদের এ সমৃদ্ধি অন্য সম্প্রদায়ের লোকের সামনে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করেছে। এখানে বসবাসকারী লোকেদের অভিমত হলো তারা অনেক দূরে অবস্থিত মূল বাজারের দামের থেকে এখানে দাম কম পায়। শুধু তাই নয়, বাজারে যেতে তাদের অনেক সময়ও লাগে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশী দোকানদারদের কাছ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কেনা তাদের জন্য অধিকতর লাভজনক।
দোকানগুলোর মাধ্যমে শহর ও শহরতলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ সম্প্রদায়ের পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন দোকানমালিকের সঙ্গে কার ক্রেতার সুসম্পর্ক তৈরি হয়, তখন তা দোকানের বাইরে নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু বাংলাদেশী কেন দোকানের মাধ্যমে অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় যেখানে বর্ণবাদী রাজনীতিও বর্তমান থাকে। বাংলাদেশী এসব ব্যবসায়ীকে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরা কখনো ভালোভাবে নেয়নি। ফলে বাংলাদেশীরাও স্থানীয়দের সঙ্গে সেভাবে সামাজিক বন্ধনে সম্পর্কযুক্ত হতে পারেনি। কারণ তারাও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের বিশ্বাস করতে পারে না। তাই ক্রেতার সঙ্গে দোকান থেকে সুসম্পর্ক তৈরি হলে সে সম্পর্ক গিয়ে সামাজিকায়নে রূপ নেয়। কারণ অভিবাসীদের অনেকেরই স্থানীয়দের সঙ্গে ভয়ংকর স্মৃতি রয়েছে।
বাংলাদেশী অভিবাসী যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করে তাদের জীবনে ধর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকাও তার প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় মুক্তি নাগরিক অধিকার হিসেবে জ্ঞান করে। অন্য ধর্মের লোকেদের প্রতি সরকার বিরাগ প্রদর্শন করে না। তবু এখানকার বাংলাদেশী, ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা যখন একত্রিত হয় তখন তারা মিলে যায়। সাপ্তাহিক ছুটিতে সবাই মিলে নানা স্থানে ঘুরতে যায়। বিশেষ করে তারা ফার্ডসবার্গে যায়। এখানে বাংলাদেশী মালিকানার অনেক দোকান রয়েছে। দোকানগুলোকে ঘিরে বাংলাদেশীদের একটা বন্ধন গড়ে উঠেছে।
Naadira Munshi রচিত Lived experiences and local
spaces: Bangladesh migrants in post-apartheid South Africa থেকে অনূদিত। অনুবাদ: কাহিন মাশরিক





