বাংলাদেশীরা প্রথম দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্ট র্যান্ড অঞ্চলটিতে আস্তানা গাড়তে শুরু করেছিল। অঞ্চলটির বিভিন্ন শহর ও উপশহরে তারা তখন একটি বাংলাদেশী সম্প্রদায় তৈরি করছিল। মূলত ভারতীয় অভিবাসীরা যেসব শহরে বাস করত, তারা সেসব শহর থেকে একটু দূরে আলাদা একটা বলয় তৈরি করতে চেয়েছিল। তাই ভারতীয় অভিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের একটা জায়গায় তারা বাস করতে শুরু করে। বাংলাদেশীরা বড় শহরে বসবাস করতে পছন্দ করত না। বসবাসের জন্য শহরের উপকণ্ঠ অধিক পছন্দ করত। এসব স্থানে দীর্ঘ জীবন ধরে অনেকেই সুখে রয়েছে। আশপাশের অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে।

স্থানীয়দের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলাদের সঙ্গে বাংলাদেশী অভিবাসীদের বিয়ে ও তত্পরবর্তী বৈবাহিক জীবন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। ফোর্ডসবার্গে এর আগে যেসব বাংলাদেশী থাকত তারা দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলাদের সঙ্গে নিজেদের বিয়েকে খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। কারণ বাংলাদেশী মুসলিমরা মুসলিম নারী ব্যতীত অন্য ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করাটা লজ্জাজনক মনে করত। বাংলাদেশী ও আফ্রিকান মেয়েদের মধ্যকার বিয়ের উদাহরণ হিসেবে আমরা আরিফ সাহেব ও হাসান সাহেবের কথা উল্লেখ করতে পারি। আরিফ সাহেব দীর্ঘ জীবন ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করে আসছেন। যেহেতু তার সময়ে তেমন কোনো বাংলাদেশী মেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া যেত না, তাই তিনি পাত্রী হিসেবে ভারতীয় মুসলিম নারীদের খোঁজ করত। জনাব হাসানও তাই করতেন। তিনিও দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করে আসছেন এবং গৌটেঙের অনেক স্থানে বসবাস করেছেন। তার বিয়ের বিষয়টি বেশ জটিলতায় রূপ নিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় মুসলিম এক মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকলে শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো আফ্রিকান মেয়েকে বিয়ে করতে পারেননি। তার মতামত হলো, দক্ষিণ আফ্রিকান মেয়ে তো আর শেষ বিচারে বাংলাদেশ মুসলিম মেয়ে নয়। এ বোধ থেকে তিনি বিয়েতে অগ্রসর হননি।

প্রথম যুগের জনাব আরিফ ও হাসান আফ্রিকান মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে এতদূর অগ্রসর হতে না পারলেও দ্বিতীয় যুগের জনাব রাশেদ ও জহির স্থানীয় দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েকে বিয়ে করেন। জনাব রাশেদ মিসেস রেফিলভে ও জনাব জহির মিসেস তাসনিম নামে একজনকে বিয়ে করেন। দুজন মহিলা বিয়ের পরে শহরে বসবাস করলেও তাদের পরিবার শহরের উপকণ্ঠে থাকে। এ দুটি বিয়ের ঘটনা থেকে আমরা অভিবাসীদের জীবনে বাড়ি ও সামাজিক জায়গার বিয়ের গুরুত্ব কতখানি তা বুঝতে সচেষ্ট হব। প্রথমে মিসেস রেফিলভের সঙ্গে জনাব রাশেদের বিয়ের বিষয়টি সম্পর্কে বলা যাক। মিসেস রেফিলভের জন্ম ১৯৭৪ সালে ইস্টার্নে। চাকরির সন্ধানে তিনি ওয়েস্ট র্যান্ডে আসেন। সেখানে জনাব রাশেদের দেখা পান। প্রথমে তিনি তার দোকানের নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন। সময়টা ২০০৫ সালের দিকে। এরপর তিনি রাশেদের দোকানে চাকরি নেন। পরের বছর তিনি তাকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে স্বামীর জোরাজুরিতে তিনি নিরাপদ জীবনের সন্ধানে শহরে চলে আসেন। স্বামীর পৃষ্ঠপোষকতায় মিসেস রেফিলভে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। অতঃপর তিনি বিভিন্ন সংক্ষিপ্ত কোর্স করেন। লক্ষ্য ছিল ভালো একটা চাকরির জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলা, যার সাহায্য তিনি তার মাকে সাহায্য করতে পারবেন। এদিকে জনাব রাশেদের তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন। তার প্রথম স্ত্রী বাংলাদেশে থাকত এবং জনাব রাশেদ তার জন্য বাংলাদেশে টাকা পাঠাত। তিনি বাংলাদেশে বাড়ি তৈরি করতে চাচ্ছিলেন যেন দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে বেড়াতে গেলে সেখানে উঠতে পারেন।

বাংলাদেশের একটা ছেলেকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলে আফ্রিকানদের নিজেদের সম্প্রদায়ের নিকট থেকেও অনেক আপত্তি ওঠে। মিসেস রেফিলভের সম্প্রদায়ের কাছে আফ্রিকার বাইরের লোকেরা মাকুলা নামে পরিচিত। এমন সিদ্ধান্তে অনেকে তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করল, কেন তিনি একজন মাকুলাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন। এসব উপেক্ষা করে মিসেস রেফিলভে কিন্তু আনন্দচিত্তে রাশেদকে বিয়ে করে। রাশেদ চেয়েছিল বড় বাড়ি নিয়ে রেফিলভের আগের ঘরের সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে থাকতে। মূলত এ সিদ্ধান্তই রেফিলভের ভালো লেগেছিল। রেফিলভের আগের ঘরের সন্তানদের সে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। এভাবে সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে বিষয়টি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রথমে রেফিলভের পরিবার বাংলাদেশী কোনো ছেলের সঙ্গে তার বিয়ের বিষয়টি জেনে দুঃখ পেলেও পরে তারা সে বিয়ে মেনে নেয়। বিয়ের পরে রাশেদ তার স্ত্রীকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত করতে চায়। যেহেতু রেফিলভে স্বাধীনচেতা ছিল, সেহেতু ইসলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানলাভের পরই ইসলাম ধর্ম কবুল করে নেন।

এবার মিসেস তাসনিম নামের আরেক জন দক্ষিণ আফ্রিকান সম্পর্কে জানা যাক। ছোট সময় থেকেই তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার লিমপোপো প্রদেশের গিয়ানিতে বসবাস করছেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে সে বাবা-মায়ের সঙ্গে ওয়েস্ট র্যান্ডে চলে আসেন। সে সময়েই সে মুসলিম হয়ে যায়। মুসলিম পোশাক নাকি তাকে আকর্ষণ করেছিল। পরে স্কুল ছেড়ে দিয়ে সে খোয়াজুলু নাতালের ভেরুলামে অবস্থিত একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০০৬ সালের কোনো একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়ে মিস্টার জহিরের সঙ্গে তার দেখা হয়। দোকানে কিছু একটা কেনার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে মিস্টার জহিরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের আগে তারা যে বাড়িতে থাকত তার বাড়িওয়ালাই ছিল এ মিশ্র বিয়ের সবচেয়ে বড় বাধাদানকারী। বিয়ের পরে তারা শহরতলি থেকে শহরের কাছাকাছি চলে আসেন এবং শহরের মধ্যে একটা স্থান ভাড়া নিয়ে দোকান খোলেন। বর্তমানে তারা বেশ সুখেই বসবাস করছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সহিংসতা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। তাই অনেক দিন ধরে এখানে বসবাস করলেও বাংলাদেশীরা তাদের সন্তান ও পরিবারকে এখানে নিয়ে আসতে চান না। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মেয়ে-ছেলের বিবাহিত জীবন নিয়ে মিসেস তাসনিমের শুরুতে একটু ভীতিকর ধারণা ছিল। তাকে বাংলাদেশ খাবার রান্না করা শিখতে হয়েছিল। আর তার স্বামীর শিখতে হয়েছিল আফ্রিকানদের মতো একসঙ্গে থাকা। ধীরে ধীরে তারা একে অন্যের জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে যান। ২০০৮ সালে তাদের সন্তান জন্মের দুদিনের মধ্যে মারা যায়। সন্তান বিয়োগের ব্যথা ভুলতে তার দুই বছরেরও অধিক সময় লেগে যায়। মাঝে মাঝে টেলিফোনের মাধ্যমে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে তার কথা হয়। শহরে বাস করে এমন বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিসেস তাসনিমও ধীরে ধীরে মিশে গিয়েছেন। সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে সর্বদা উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। তারা তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে অত্যধিক খুশি এবং তাকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ভাবী ডাকে। মিসেস রিফেলভের মতো এত বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি মিসেস তাসনিমকে। তার পরিবার ও বন্ধুরা এ বিয়েকে অতি দ্রুত মেনে নেয়।

উপরের দুটো মিশ্র বিয়েতে দেখা যায়, বিয়ের পরে দুটো পরিবারই বড় শহরে স্থানান্তরিত হয়। এরা বড় শহরে যাওয়াকে নিজেদের উন্নয়ন বলে মনে করে। উপশহরে পড়ে থাকাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নামান্তর বলে মনে করে। কারণ এসব জায়গায় সহিংসতার ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আরো কথা বলে বোঝা গিয়েছে, শহরতলিতে পরিবার গড়ে তোলায় বাংলাদেশীরা অনিচ্ছুক। সুতরাং বিয়ের পরে নবদম্পতি অধিকতর উন্নত জীবনের সন্ধানে শহরগামী হবেই।

সুতরাং জনাব রাশেদ ও জহির স্থান ভাড়া করে প্রথমে নিজেদের দোকান খোলেন। অন্য কারও ওপর দোকানের দায়িত্বভার না দিয়ে তারাই দোকান চালাতে থাকেন। দুজনেই এর মধ্যে ভালো ইংরেজি শিখে ফেলেন। ধীরে ধীরে তারা দুজনেই ব্যবসায় উন্নতি করতে শুরু করেন। বর্তমানে জনাব রাশেদের চারটি দোকান হয়ে গিয়েছে। জনাব জহির শহরে একটি ও উপশহরের আরেকটি দোকানের মালিক।

দুটি ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির দুজন নারী-পুরুষের মধ্যেকার এ বিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা বেশ জটিল। পারস্পরিক ভালোবাসা ও আস্থার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে। জনাব জহিরের কাছে বাংলাদেশী খাবার অতিশয় পছন্দের। তার দক্ষিণ আফ্রিকান স্ত্রী সেভাবে রান্না করতে পারেন বলে তার আর দেশে ফিরে যেতে মন চায় না। মিসেস রেফিলভেও বাংলায় কথা বলাও শিখে গিয়েছেন। পাশাপাশি তার স্বামীও তার ভাষা েসায়ানা শিখছেন। এভাবে দুটো ভিন্ন সংস্কৃতির নারী-পুরুষ বিবাহের মাধ্যমে নিজ নিজ ঐতিহ্যের লালন করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ভালোবাসার বন্ধনে এভাবে সময় অতিবাহিত করার মধ্যে বাদ সাধে জেনোফোবিয়া। ২০০৮ সালে দেশটির বিভিন্ন শহরের উপান্তে কিছু জেনোফোবিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ফলে দেশটিতে থাকা বিভিন্ন অভিবাসীর মধ্যে ভয় কাজ করে। কারণ অনেক সহিংস ব্যক্তি অভিবাসীদের দোকানপাট লুট করা শুরু করেছিল তখন। এমনকি এরূপ ঘটনাকে জেনোফোবিয়া বলে নাম দিতেই স্থানীয়দের মধ্যে ইতস্তততা কাজ করছিল। স্থানীয়দের অনেকেই অভিবাসীদের ওপর এত বেশি সহিংস হয়ে উঠেছিল যে তাদের উদ্দেশ্য করে ‘মাকুলা মাকুলা’ বলে রাস্তাঘাটে চিত্কার শুরু করেছিল। সরকারও অভিবাসীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারছিল না। জেনোফোবিয়াকে অভিবাসীরা যতখানি না ভয় করে তার থেকেও বেশি ভয় করে হত্যা ও সহিংসতাকে। তাদের দোকানের নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে লোহার দরজা, তালা ও অন্যান্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। ত্স্পাজা দোকানে ক্রেতারা প্রবেশ করতে পারত না। একটা লোহার গ্রিলের বাইরে তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। দোকানের কর্মচারী তাদের চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন বস্তু সরবরাহ করত। অনেক বাংলাদেশী নিরাপত্তার জন্য দোকানের পেছনে একটা ঘরে থাকত। জেনোফোবিয়া চলাকালে সহিংসতা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে ছাদ দিয়ে টপকে কিংবা লোহার বেড় কেটে দক্ষিণ আফ্রিকানরা দোকান লুট করত।

মূলত বাংলাদেশীদের দোকানদারিতে অধিক সফল হওয়ার ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় লোকেরা মেনে নিতে পারেনি। দেশটি সেহেতু বাংলাদেশীদের নয়, সেহেতু তারা এখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দেয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছিল। ব্যবসায় বাংলাদেশীরা বেশ সুনাম অর্জন করেছিল। তারা দোকান বেশি দামে ভাড়া নিত এবং ক্রেতাদের সদা সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট থাকত। ফলে অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান বাড়িওয়ালা বাংলাদেশীদের কাছেই দোকান ভাড়া দিতে চাইত। এসব কারণে আফ্রিকানরা প্রতিযোগিতায় পড়ে যায়। এসবই জেনোফোবিয়াকে উসকে দেয়। ফলে দেশটিতে বাংলাদেশীদের পারিবারিক জীবনে মাঝে মাঝে ভীতির সঞ্চার হয়।

 

সাইফ ভূঁইয়া: লেখক