আবাসন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থা—দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুতেই আজ স্মার্ট লিভিংয়ের ছোঁয়া লেগেছে। স্মার্ট লিভিং পণ্য জীবনযাপনকে শুধু সময়সাশ্রয়ী ও সহজই করে তোলেনি; ভূমিকা রাখছে পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রেও। বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, গ্যাসের চুলা বা হিটার, ইস্ত্রি, রুটি মেকার, ওভেন, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার—এমন শত শত পণ্য আজ স্মার্ট লিভিংয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে স্মার্ট লিভিংয়ের সিংহভাগ পণ্যই আগে আমদানি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সবই দেশে তৈরি হচ্ছে। স্মার্ট লিভিংয়ে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ওয়ালটন, যমুনা, সিঙ্গার, হাতিল, টিকে (সুপারবোর্ড), আকিজ বশির গ্রুপ, রাজা মেটাল, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ও সিটি গ্রুপের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্মার্ট লিভিংয়ের আওতায় আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে এসিআই মোটরস, উত্তরা মোটরস, রানার অটোমোবাইলস ও হিরোসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যে প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তার যেমন প্রয়োগ ঘটাচ্ছে, তেমনি গুরুত্ব দিচ্ছে পরিবেশের স্বার্থ রক্ষার নানা বিষয়ও।
বাংলাদেশে প্রযুক্তিভিত্তিক স্মার্ট লিভিং পণ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামগুলোর একটি ওয়ালটন। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় ব্র্যান্ড, যারা ইলেকট্রনিক, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল এবং হোম অ্যান্ড কিচেনের জন্য নানা ধরনের স্মার্ট লিভিং পণ্য তৈরি করে। তাদের বিশাল কারখানাটির অবস্থান গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায়। বিশাল কর্মযজ্ঞের কারণে তাদের এ কারখানা নিয়ে ‘মেগাফ্যাক্টরিজ’ অনুষ্ঠান করেছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’।
এ গ্রুপের প্রায় সব পণ্য ‘ওয়ালটন’ নামে দেশ-বিদেশে বাজারজাত করা হয়। এ গ্রুপের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ওয়ালটন মাইক্রো-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ওয়ালটন ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ওয়ালটন করপোরেশন, ওয়ালটন প্লাজা ও ওয়ালটন ই-প্লাজা। বর্তমানে অর্ধশতাধিক দেশে ওয়ালটনের রেফ্রিজারেটর ও যন্ত্রাংশ রফতানি করা হয়।
ওয়ালটনের মতো স্মার্ট লিভিং পণ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখছে এসিআই মোটরস। তারা ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বাজারজাত করে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তাদের কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়। দেশীয় আরেক অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠান রানার ২০১৮ সালেই ৭০০ ইউনিটের বেশি মোটরসাইকেল রফতানি করে। তাদের পণ্যের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।
ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইলেক্ট্রোমার্ট জানায়, দেশের এসির বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশই এখন তাদের দখলে। নিজেদের ফ্রিজ ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশের অংশীদার হিসেবেও দাবি করেছে ইলেক্ট্রো মার্ট।
দেশেই উন্নতমানের বাথওয়্যার ও ফসেট উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করছে দেশের এক হাজারেরও বেশি ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর।
এছাড়া ফসেট, বোর্ড ও দরজা উৎপাদনে বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে আকিজ বশির গ্রুপ অন্যতম। আকিজ বশির গ্রুপের স্মার্ট লিভিং পণ্যের মধ্যে পার্টিকেল বোর্ডের ব্যবসা শুরু হয় সবার আগে। আকিজ পার্টিকেল বোর্ড মিলস লিমিটেড (এপিবিএমএল) নামে ২০০১ সালে তারা এ ব্যবসা শুরু করে। এছাড়া প্রায় এক দশক আগে টেবিলওয়্যার, বাথওয়্যার ও ফসেট খাতে প্রবেশ করে আকিজ বশির গ্রুপ। ‘রোজা’ (ROSA) ব্র্যান্ড নামে এসব পণ্য বাজারজাত করছে তারা। এসব পণ্যের বাজারে ‘আকিজ বশির গ্রুপ’ এখন শীর্ষস্থানীয় নাম।
পার্টিকেল বোর্ড ও ফার্নিচার খাতের বাজারে হাতিল, রিগ্যাল ও পারটেক্সও প্রভাবশালী ব্র্যান্ড। ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশের ফার্নিচার রফতানির পরিমাণ ছিল ২৭ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার, যা কয়েক গুণ বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশ-বিদেশে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভূমিকা রেখে চলেছে উল্লিখিত দেশী ব্র্যান্ডগুলো।
গৃহস্থালির পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতে এলপিজি অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান। সিটি গ্রুপের পরিচালক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) মো. ইমরান উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, ‘দেশকে দাঁড়াতে হলে ইকোনমি গ্রো করতে হবে। যত বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হবে, এলপিজির চাহিদা তত বাড়বে। আমি মনে করি টেকসই উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে এলপিজি হলো একটি গ্রিন এনার্জি। নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছে।’
শিল্প খাতের পাশাপাশি বাসাবাড়িতে এলপিজি সরবরাহে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজীম চৌধুরী বলেন, ‘ওমেরার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা। রিফাইনারি থেকে শুরু করে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ওমেরার। যে সিলিন্ডারে গ্রাহক গ্যাস পাচ্ছে, সেটিও ওমেরাই তৈরি করে। সিলিন্ডারে গুণগত মান রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। দেশজুড়ে প্রায় ৬০ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে ওমেরার, যেগুলোর বেশির ভাগের মেয়াদ প্রায় ১০ বছর।’
বিশ্বব্যাপী স্মার্ট ও আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যের বাজার দিন দিন বাড়ছে। মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলতে কাজ করছে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এসব পণ্যের সমন্বিত বাজারের আকার নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসব পণ্য যে বড় জায়গা করে নিয়েছে, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই।
দেশের ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে বার্ষিক আয় ২০২৬ সাল নাগাদ ৩৯ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা। দেশের আসবাবপত্র বা ফার্নিচার খাতের বাজারের বার্ষিক (২০২৪) আয় প্রায় ২১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে দেশের স্যানিটারি পণ্যের বাজারের পরিমাণ ছিল ১৫ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা, যার ৮০ শতাংশ ছিল দেশীয় ব্র্যান্ডের দখলে। এছাড়া আধুনিক জীবনযাপনে ব্যবহৃত পণ্যগুলোর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় বাজারের একটি হচ্ছে স্মার্টফোন। এর বর্তমান বাজারের পরিমাণ ৮১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তবে স্মার্টফোনের এ বাজারের সিংহভাগের অংশীদার এখনো বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো। অর্থাৎ দেশী ব্র্যান্ডের এখনো এ খাতে কাজ করার মতো বিশাল সুযোগ রয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, কর্মবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে স্মার্ট লিভিং পণ্য।





