টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর দেশের প্রথম সারির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন ফাহিম হোসেন। লেখাপড়া শেষ দুই বছর হলো, কিন্তু আশানুরূপ চাকরি এখনো মেলেনি। এ নিয়ে প্রায়ই হতাশায় ভোগেন তিনি।

ফাহিমের মতো দেশের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই পেশাজীবন নিয়ে হতাশায় ভুগছেন। এ হতাশার একটা বড় কারণ হলো এ দেশে শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পৃক্ততা কম। ঘাটতি রয়েছে কারিগরি দক্ষতা ও যোগ্যতার ক্ষেত্রেও। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান। এজন্য শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশে পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এ ৪০ লাখের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী কর্মীও রয়েছেন, যাদের অনেকেই সমমানের ডিগ্রি নিয়ে দক্ষতার বিচারে এ দেশের চাকরিপ্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে থাকছেন।

তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন পর্যায়ে তুলনামূলক দক্ষতার ঘাটতি কম। কিন্তু ব্যবস্থাপক পর্যায়ে ঘাটতিটা অনেক বেশি। পোশাক কারখানা মালিকরা যে ধরনের কর্মী চান, সে ধরনের লোক পাওয়া যায় না।

শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিবেদনেও। ২০২২ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটির শিরোনাম হলো ‘ব্রিফ অ্যানালাইসিস অন দ্য পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার অব টেক্সটাইল এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’। এতে দেশের টেক্সটাইল শিক্ষার দুর্বলতা হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব; শিক্ষাক্রমে শিল্পসংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত বিষয় না থাকা এবং অপর্যাপ্ত গবেষণা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ দেশে শিক্ষার সঙ্গে শিল্প বা পেশাগত যোগ্যতার সংযোগ একবারে নেই, তা বলা যাবে না। তবে সেটাকে সুনির্দিষ্ট করা যেত। তবে বর্তমানে শিক্ষার সঙ্গে শিল্প বা পেশাগত ক্ষেত্রের সরাসারি সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এখন চেষ্টা করছি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেন শিক্ষার্থীরা পাস করার পর নিজেদের প্রত্যাশিত পরিমণ্ডলে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংযোগের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করতে হবে। শিক্ষাক্রমেই সুনির্দিষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে, শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে কোন কোন খাতে চাকরির সুযোগ রয়েছে। তখন তাদের কর্মক্ষেত্রটি পরিষ্কার হয়ে আসবে। তখন তাদরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী দেশের মোট তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৩ কোটি ১৬ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশের কিছুটা বেশি। তরুণদের ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ২৯ লাখ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বড় এ জনগোষ্ঠী ওই সময় শিক্ষা ও কর্ম কোনোটিতেই সম্পৃক্ত ছিল না। 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নিষ্ক্রিয় তরুণের হার তুলনামূলক বেশি। তরুণদের নিষ্ক্রিয়তার বড় কারণ হিসেবে বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাকরির সুযোগ না থাকা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর কারণেও বিশ্বজুড়ে নিষ্ক্রিয় তরুণের সংখ্যা বেড়েছে, শোভন কাজে তরুণদের অংশগ্রহণ আরো জটিল করে তুলেছে, যার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিটা শিক্ষাক্রমেই ভালো ভালো জিনিস সংযুক্ত করা হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়ন হয় না। সবাইকে যে সাধারণ শিক্ষায় যাওয়া লাগবে, এমন কোনো কথা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো আমরা ভালো ভালো কাজের উদ্যোগ নিই, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না। বাস্তবায়ন করলে বোঝা যাবে, তা ভালো নাকি খারাপ।’