দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্বে আইভিএফ সেবা প্রদান করে আসছে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের ইনফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ সেন্টার। শুরু থেকে এ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত আছেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট
ডা. রেহনুমা জাহান। বাংলাদেশে আইভিএফ পদ্ধতির যাত্রা, প্রসার ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ
দেশে বেসরকারি পর্যায়ে আইভিএফ পদ্ধতিতে আপনাদের যাত্রার ক্ষেত্রে বড় অর্জন ও সীমাবদ্ধতা কী?
২০০৬ সালে স্কয়ার ফার্টিলিটি সেন্টার সেবা দেয়া শুরু করে। স্কয়ারের যাত্রা যেদিন শুরু, স্কয়ার ফার্টিলিটি সেন্টারেরও যাত্রা সেদিন থেকে। আমাদের কর্তৃপক্ষ সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে সেন্টারটি শুরু করেছে। সেন্টারটি সর্বাধুনিক ও বিশ্বমানের ইকুইপমেন্ট দিয়ে তৈরি। সিঙ্গাপুর থেকে টিম এসে এ সেন্টার তৈরি করেছে। সব ধরনের ইকুইপমেন্ট, লোকবল দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে আমরা ধারক ও বাহক হিসেবে এটিকে সচল রেখেছি। আমার মতে, দীর্ঘ ১৮ বছরের পথচলায় আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন আমরা অনেক নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফুটিয়েছি। যেহেতু স্কয়ার একটি সর্বাধুনিক হাসপাতাল, তাই আমরা এখানে বিশ্বমানের সেবা প্রদান করি।
আইভিএফ চিকিৎসাসেবা কিছুটা ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। যার কারণে অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সার্ভিসটি নিতে পারে না। এটা শুধু আমাদের হাসপাতালের জন্য না, পুরো দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য প্রতিবন্ধকতা। আমি মনে করি পুরো দেশে এ সেবা ছড়িয়ে দেয়া উচিত। এ সার্ভিস আমাদের দেশে আছে এটি সবাইকে জানাতে হবে। আমরা খুব ভালোভাবে আইভিএফ সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি। কিছু মেডিসিন, ইকুইপমেন্ট আমাদের দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়, সেগুলো যদি আমরা আরেকটু কম দামে পাই বা এগুলো যদি আমাদের দেশেই তৈরি হয় তাহলে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারব।
নিঃসন্তান দম্পতির ক্ষেত্রে আপনাদের কাউন্সেলিং পদ্ধতির ধরন সম্পর্কে জানতে চাই।
নিঃসন্তান বা বন্ধ্যাত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ব্যাপার। সমাজের নিগৃহীত ও নির্যাতিত অবস্থা থেকে তারা আসেন। তারা অনুশোচনাবোধে ভোগেন। আমরা তাদের অনেক সময় নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। নিঃসন্তান দম্পতিদের সময় দিই। আমাদের স্পেশাল কাউন্সেলিং ইউনিট আছে। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, নিঃসন্তান হওয়া মূলত কারো দোষ না, এটা স্বামী-স্ত্রী দুজনের সমস্যার কারণে হতে পারে, আবার কিছু থাকে আনএক্সপ্লেইন ফার্টিলিটি, যেখানে কারো কোনো সমস্যা নেই, তাও হতে পারে। শুরু থেকে যদি আমরা তাদের এসব কিছু বোঝাতে পারি তাহলে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই জানেন না কখন প্রেগন্যান্সি হতে পারে—এ বিষয়গুলো আমরা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিই। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং ছাড়াও ট্রিটমেন্টের দরকার হয়। অল্পসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে আইভিএফ বা এআরটির দরকার হয়। আমরা যথেষ্ট সময় নিয়ে, যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে এ রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করি।
আইভিএফ চিকিৎসা পদ্ধতি সবার জন্য এক কিনা?
৫-৭ শতাংশ মানুষের আইভিএফের দরকার হয়। গুরুতর কোনো জটিলতার কারণেই তার আইভিএফ লাগে। দেখা যায়, অনেক দম্পতি অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছে, তাদের বাচ্চা হচ্ছে না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামীর সমস্যা, শুক্রাণু নেই বা খুবই অল্প পরিমাণ শুক্রাণু। স্ত্রীদের ক্ষেত্রে টিউবের সমস্যা বা টিউব ব্লক হয়ে আছে অথবা ডিম্বাণুর সংখ্যা অনেক বেশি কমে গেছে—তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইভিএফের মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে।
বন্ধ্যাত্বের জটিলতার ভিন্নতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা হয় কি?
অবশ্যই, আমরা প্রথমে নারী-পুরুষ ভেদে বন্ধ্যাত্বের কারণ খুঁজে বের করি এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দিই। আইভিএফের বিভিন্ন ধাপ আছে। তাকে বিভিন্ন প্রটোকল অনুসরণ করা লাগে। সেই প্রটোকলগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। যেটা যার জন্য প্রযোজ্য, তাকে সেই প্রটোকলেই আমরা ফেলি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিন বলছে, ৪৩ বছর পর্যন্ত আইভিএফ পদ্ধতি গ্রহণ আদর্শিক সময়সীমা। যদিও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এর পরও করা হলে তাকে ক্ষতিকর বলছে না। বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে কত বছর বয়স পর্যন্ত এই সেবা গ্রহণ করা যায়?
একজন মেয়ে যখন মেয়ে হিসেবে মায়ের পেটে জন্মায়, তখন নির্দিষ্ট পরিমাণে ডিম নিয়ে জন্মায়। মায়ের পেটে থাকতেই মিলিয়ন মিলিয়ন মিটিং নষ্ট হয়ে যায়। ১২-১৩ বছর বয়সে প্রথম যখন মাসিক হয়, তখন একটি করে ডিম ম্যাচিউর হয় আবার একটি করে ডিম নষ্ট হয়। ৩০ বছর বয়সের পর থেকে দ্রুত তা নষ্ট হতে থাকে, ৩৫-এর পর তা আরো দ্রুত নষ্ট হয়। একটা সময় যখন সব ডিম নষ্ট হয়ে যাবে, তখন মেনোপজ হয়ে যাবে। ৩০ বা ৩৫ বছরের পর যেহেতু ডিম্বাণুর নাম্বার বা কোয়ালিটি সবই কমতে থাকে। প্রেগন্যান্সি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। কোয়ালিটি কমার কারণে জেনেটিক্যালি অ্যাবনরমাল বেবি হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই আমাদের দেশের ৪৩ বছর বয়সী নারীর পর্যাপ্ত ডিম থাকে না, যার কারণে আমরা তাদের আইভিএফ অফার করতে পারি না। আমরা তবু করি। যাদের একেবারেই কেউ নেই, তাদের আমরা অফার করি, কাউন্সেলিং করি। আমরা তাদের জানিয়ে রাখি, এ বয়সে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বা হলেও জেনেটিক্যালি অস্বাভাবিক অবস্থায় সন্তান প্রসবের আশঙ্কা থাকে। ৪০-এর ওপরে যাদের বয়স তাদের আমরা সাধারণত এ পরামর্শগুলো দিয়ে থাকি।
২০১৯-এ ব্রিটেনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে আইভিএফের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান ৩৫ শতাংশ সফল হয়। সেটা ৪৪ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশে নেমে আসে। ২৫ বা ৩০ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এটার সম্ভাবনা কত শতাংশ?
আইভিএফের সাকসেসটা নির্ভর করে এগের কোয়ালিটি কেমন, স্পার্মের কোয়ালিটি কেমন, ইউটেরাস কেমন, এর ধরে রাখার ক্ষমতা কেমন তার ওপর। বয়সের সঙ্গে যেহেতু এগের নাম্বার/কোয়ালিটি কমতে থাকে, তখন সাকসেস রেটও কমতে থাকে। ৩০-এর ওপরে যেহেতু এগের নাম্বার/কোয়ালিটি ভালো থাকে, তাই এর সাকসেস রেটও বেশি থাকে।
আইভিএফ চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের প্রক্রিয়া বা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়?
আইভিএফ সেবাগ্রহীতা কখনই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। আইভিএফের ট্রিটমেন্ট শুরু হয় মূলত পিরিয়ডের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন থেকে। ১০-১২ দিন ইনজেকশন চলে। তারপর আমরা রেগুলার মনিটর করতে থাকি, ডোজ বাড়াতে হবে নাকি কমাতে হবে, সেগুলোর ফলোআপ করতে থাকি।
এগ ম্যাচিউর হওয়ার পর ওটিতে আমরা ওভাম পিকআপ করে থাকি। এটা যেহেতু পেইনফুল কন্ডিশন, তাই পিকআপ অ্যানেস্থিশিয়ার মাধ্যমে করা হয় এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য পেশেন্টকে হাসপাতালে থাকতে হয়। ওভাম পিকআপের পর আমরা সঙ্গে সঙ্গে এগগুলো ল্রল্যাবে পাঠিয়ে দেই। একই দিনে স্বামীর সিমেনও কালেক্ট করা হয়। এমব্রায়োলজিস্ট স্পার্ম ও ওভাম মিলিয়ে এম্ব্রায়ো তৈরি করেন। দুই বা তিনদিন পরে ফ্রেশ ট্রান্সফার অথবা সাইকেলে ফ্রোজেন এমব্রায়ো ট্রান্সফার করি। কখনো যদি বেশি এমব্রায়ো তৈরি হয় তখন আমরা ফ্রোজেন করে রাখি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন কিছু আবিষ্কার হলে তা প্রতিনিয়ত উন্নত হয়। ১৯৭৮ সালে আইভিএফ পদ্ধতি চালু হয়। শুরুর সময় থেকে এ পর্যন্ত এ পদ্ধতির উন্নতি কেমন?
এ খাতে অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। শুরুতে স্টিমুলেশন না করে ফ্রেশ এগ দিয়ে সেটাকেই কালেক্ট করা হতো। তারপর অনেক ডেভেলপমেন্ট, বিভিন্ন প্রটোকল এসেছে। কীভাবে আরো ভালো করা যায়, কীভাবে আরো সাকসেস রেট বাড়ানো যায় সে বিষয়ে আরো অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। এটার জন্য গবেষক দল প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশে আইভিএফ বা এ ধরনের পদ্ধতিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন কাজ। গোঁড়ামি বা অজ্ঞতা রয়েছে। এক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করছেন এবং এ পদ্ধতির ক্ষেত্রে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী, যাতে আইভিএফের প্রসার ঘটে?
আমাদের দেশে যারা আসেন ইনফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট নিতে বেশির ভাগই পরিবারে না জানিয়ে আসেন। আইভিএফ যারা করতে আসেন তারা আমাদের বারবার বলেন যে তাদের পরিবারের কেউ জানে না। ব্যাপারটি যাতে আমরাও গোপন রাখি। এছাড়া তাদের আরেকটি প্রশ্ন আছে যে এতে ধর্মীয়ভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা। ধর্মীয়ভাবে যে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই সেটা আমি তাদের জানাই। বেশির ভাগ রোগীর ধারণা, অন্য কারো শুক্রাণু দিয়ে আইভিএফ হয়। এটা আসলে একটা ভ্রান্ত ধারণা। কিছু ধর্মীয় অনুশাসন আছে, আমরা আমাদের দেশে কখনো ডোনার দিয়ে কাজ করি না। বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর শুক্রাণু ডিম্বাণু দিয়েই এখানে শুধু কাজ হয়। রোগীরা ভাবেন এটি অনেক কঠিন একটি পদ্ধতি। তবে আমার মনে হয়, এ চিকিৎসা ব্যয়বহুল, আমাদের দেশের মানুষের এ চিকিৎসা ব্যয় বহন করার ক্ষমতা অনেক কম। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে অনেকেই জানেন না দেশের কোথায় এ চিকিৎসা হয়। আমাদের অনেক পেশেন্ট এখন পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাচ্ছেন। কারণ তারা জানেন না এখানে কোনো সার্ভিস সেন্টার আছে। আমার মনে হয়, প্রচারণাকাজ আরো বাড়ানো লাগবে। আমি ভারত, সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমি যখন সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছি আমার কাছে কাছে মনে হয়নি নতুন কোনো কিছু দেখেছি। আমাদের আরো বেশি সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাইরের দেশে যেসব ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়, তা এখন আমাদের দেশেই হচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রসারের জন্য ক্লিনিক্যাল গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আইভিএফ বাংলাদেশে নতুন, সেক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল গবেষণা বা জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে গবেষণা হচ্ছে কিনা?
গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু তা অনেক কম। আমরা যারা কাজকর্ম করছি, তাদের অনেক বেশি কাজেই সময় দিতে হচ্ছে। আমরা গবেষণা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছি না। আমাদের লোকবল কম। ফার্টিলিটি বা আইভিএফ সেন্টারগুলোয় লোকবল আরো বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষিত জনশক্তি আরো বাড়াতে হবে। প্রতিটা খাতেই অতিরিক্ত জনবল যুক্ত করতে হবে।






