মানুষ প্রথম কবে রান্না করেছে, তা নিয়ে বিস্তর গল্প প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। সভ্যতার শুরুর দিকে মানুষ রান্না বলতে ঝলসানোকে বুঝত। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে তাতে ঝলসে প্রস্তুত করা হতো খাবার। জ্বালানি হিসেবে থাকত কাঠ। সেখান থেকে ক্রমে শুরু হয় সেদ্ধ করার প্রণালি। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ঘরবাড়িতে কাদামাটির তৈরি স্টোভ পাওয়া যায়, যা রান্নার জন্য ব্যবহার হতো। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর নানা স্থানে বিভিন্নভাবে মাটিতে স্টোভ তৈরির ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হয়েছে ঝলসানোর প্রক্রিয়া থেকে সেদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় রূপান্তর। জানা ইতিহাসে রান্নাঘরে স্টোভের ব্যবহারের প্রমাণ মেলে খ্রিস্টপূর্ব ২২১ অব্দের দিকে চীন সাম্রাজ্যের সময়। চীন, জাপান ও কোরিয়ার মানুষের কাছে প্রাত্যহিক উপাদানে পরিণত হয়েছিল স্টোভ। তবে মধ্যযুগ পর্যন্ত খোলা আগুনেই রান্না করা হতো।
ইউরোপীয়রা ষোড়শ শতাব্দীর দিকে কাঠের চুলা আবিষ্কার করে। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানোকে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে সুবিধার জন্য আবদ্ধ অবয়ব তৈরি করা হয়। বেনজামিন ফ্রাংকলিন স্টোভটি আবিষ্কার করেন। খোলা আগুনের চেয়ে কাঠের চুলা অনেক বেশি কার্যকর। শিল্প বিপ্লবের সময় কাঠের চুলার জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। শিল্প বিপ্লবের পর কয়লা ব্যবহার শুরু হয় রান্নার জন্য। কয়লা ধোঁয়াহীন হওয়ার কারণে কাঠের তুলনায় জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। একই সময়ে জরডান মট তৈরি করেন কয়লার ওভেন। কাস্ট আয়রন দিয়ে তৈরি করা হয় চুলার চারপাশ। গ্যাসের স্টোভের আবিষ্কার অবশ্য আরো পরে। ১৮০২ সালে জাকাউস উইনজল প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন গ্যাস স্টোভ আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু তিনি সফলতার মুখ দেখেননি। ১৮২৬ সালে জেমস শার্প নর্দাম্পটনে আবিষ্কার করেন কার্যকর স্টোভ। প্রথমে নিজেই ব্যবহার শুরু করেন রান্নাঘরে। সফলতা প্রমাণিত হলে ১৮৩৪ সালে তিনি নিজে একটি স্টোভ প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও রাতারাতি ব্যবসায় সফলতা আসেনি। ১৮৫০-এর দশক পর্যন্ত মানুষ খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি তার আবিষ্কারের দিকে। ১৮৮০-এর পর থেকে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা আধুনিকতার প্রবণতায় পরিণত হয়। প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরে প্রবেশ করে গ্যাস স্টোভ। যদিও পৃথিবীর অন্য অংশগুলোয় গ্যাসের স্টোভ ছড়িয়ে পড়তে বিশ শতক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে আবিষ্কার হয় ইলেকট্রিক স্টোভ। ১৮৯১ সালে কার্পেন্টার ইলেকট্রিক হিটিং ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আবিষ্কার করে ইলেকট্রিক ওভেন। উইলিয়াম হ্যাডওয়ে ১৮৯৬ সালে ইলেকট্রিক ওভেনের জন্য প্রথম পেটেন্ট লাভ করেন। ইলেকট্রিক স্টোভ দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযোজন করে নেয় পৃথিবী। প্রথমত, এ স্টোভ পরিবহন নসহজ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার করায় ঝুঁকি তুলনামূলক কম। স্টোভের বিবর্তন কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি, নানা রকম ডিজাইন যুক্ত হয়েছে স্টোভের মধ্যে। এখন পর্যন্ত পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। রান্নাঘরের আভিজাত্য ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে স্টোভ গ্রহণ করেছে নানা রূপ। খোলা আগুনে ঝলসে রান্না করা থেকে রান্নাঘরে স্টোভ পর্যন্ত এ সফর বেশ দীর্ঘ। আর পুরো সফরে নিরাপত্তা ছিল প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে।





