মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। পরিবারের প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষা সম্পন্নের আগেই প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। মূলত এ সময়েই উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে তার। এক পর্যায়ে পুরনো একটি কারখানা কিনে ‘জিপিএইচ’ নাম দিয়ে লক্ষ্যের দিকে যাত্রা করেন। আজ তিনি ইস্পাত শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এমডি। এবারের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এ শিল্পোদ্যোক্তার ঈদ আনন্দের সেকাল-একাল। কথা বলেছেন রাশেদ এইচ চৌধুরী

শৈশবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু আনন্দের কমতি ছিল না। তখন তো শ্রেণী বলতে ছিল নিম্ন কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত। ধনী বলতে যেটা বোঝায়, তখন এত ছিল না। শৈশবে ঈদের সময় খেলাধুলায় মেতে থাকতাম। ফুটবল কেনার টাকা না থাকায় জাম্বুরার খোসাকে বল বানিয়ে খেলতাম। খেলনার গাড়ি বলতে ছিল নারকেল গাছের শুকনো ডাল। এটা বিছিয়ে দুজন বসতাম, আর চার-পাঁচজনে মিলে টানত। তখন ঈদে একটা নতুন শার্ট পরাও ছিল স্বপ্নের মতো। নতুন শার্ট খুবই যত্ন করে বালিশের নিচে রেখে দিতাম। ঈদে নতুন জামা পেলে এতটা আনন্দিত হতাম যে সেটা বন্ধু, স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীদের দেখিয়ে বেড়াতাম। আর্থিক চাপে যে ঈদে বাবা নতুন জামা কিনে দিতে পারতেন না, তখন পুরনো জামাই ভালোভাবে ধুয়ে মাড় দিয়ে ইস্ত্রি করে পরতাম।

আমরা ছিলাম সাত ভাই ও তিন বোন। ১৯৮২ ও ২০২১ সালে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়। এখন আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। ভাইবোনদের বয়সের ব্যবধান কম হওয়ায় আমরা একসঙ্গে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাই। পরিবারের সময়টা আমরা খুবই উপভোগ করতাম। ঈদে বখশিশ বা সালামি তখনো ছিল। আমার বাবা যেটা করতেন—তিনি উঠানে বসে আমাদের ভাইবোন সবাইকে ডাকতেন। চাচাতো ভাইবোনেরাও আসত। বাবা একটা পাত্রে বিভিন্ন মুদ্রা অর্থাৎ কয়েন রাখতেন। তখন ১০ টাকার নিচে কাগজের নোট ছিল না। বাবা আমাদের বলতেন, যে এক মুঠে যত পারো সালামি নিয়ে নাও। আমরাও চেষ্টা করতাম এক মুঠে যত বেশি নেয়া যায়। হাতে চার আনা, পাঁচ আনা থাকলেই অনেক আনন্দ হতো এবং নিজেকে অনেক পয়সাওয়ালা মনে হতো। তখনো ঈদের দিন বাড়িতে পায়েস রান্না হতো। যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত তাদের বাড়িতে রান্না হতো পোলাও-মাংসও।

তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত এলাকায়ই লেখাপড়া করি। চতুর্থ শ্রেণীতে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে পড়তে গিয়ে মামার বাসায় উঠি। দুই-তিন মাস স্কুল করার পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তাই আবার মুন্সিগঞ্জে ফিরে আসি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে উঠি পঞ্চম শ্রেণীতে। তখন সবাইকে অটো প্রমোশন দেয়া হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণী পড়েছি মুন্সিগঞ্জের নামকরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এর পরেই অষ্টম শ্রেণীতে উঠে চট্টগ্রামে চলে যাই।

আমার ছেলে-মেয়েরা যখন ছোট ছিল, তখন ঈদ আনন্দ ছিল এক ধরনের। আমার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের জন্য নিজেই ঈদের কেনাকাটা করতাম। আমরা মুঠভর্তি কয়েন সালামি নিলেও ছেলে-মেয়েদের দিতে হতো ২০ ও ৫০ টাকার নতুন নোট। এখন তো ৫০০ টাকার নিচে দেয়া যায় না। 

এখন ভাতিজা-ভাতিজি আছে; নাতি-নাতনি আছে; তাই ঈদও অন্য রকমভাবে করি। এখনো সবাই মিলে ঈদের আগের দিন গ্রামের বাড়ি চলে যাই। বোনরা ব্যস্ততার কারণে আসতে পারে না। কিন্তু ভাইদের সবার পরিবার ঈদের আগের দিন বাড়িতে গিয়ে শেষ দিনের ইফতারটা একসঙ্গে করি। ইফতারের আগে ছোটদের কোরআন তিলাওয়াত শুনি এবং তাদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে উপহারও দিই। 

ঈদের দিন ভোরে গ্রামের সবাই মিলে কবরস্থানে গিয়ে মোনাজাত ধরি। এরপর বাসায় গিয়ে আবার বের হই ঈদগাহ ময়দানের উদ্দেশে। ঈদগাহ থেকে ফিরেই শুরু হয় সালামির পর্ব। ঈদে পরিবারের সবাইকে গল্পগুজব ও আনন্দে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়া হয়। ছোটদের জন্য বুড়ির ঘর আর মশাল বানিয়ে দিই। বড়রা মশাল দিয়ে বুড়ির ঘরে আগুন দিলে শিশুরা অনেক মজা পায়। ছোটরা কোমল পানীয় কিনে এনে আমাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে। আবার বিউটি পার্লার বানিয়ে বড়দের বিভিন্ন সেবা দিয়ে ২০০-৫০০ টাকা কামিয়ে নেয়। 

ঈদে নিয়মিত গ্রামে যাই। কারণ ঈদের সময় স্বজন, গ্রামবাসী ও শৈশবের বন্ধুদের কাছে পাই। আমার শৈশবের যেসব বন্ধু শহরে থাকে কিংবা যেসব বন্ধু গ্রামে থাকে, ঈদ এলে তাদের সবার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। তাদের সঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করি। বন্ধু কৃষক হলেও আমার বন্ধু, যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই; আমাদের স্মৃতিগুলো জেগে ওঠে; আমরা একসঙ্গে প্রাণখুলে হাসতে পারি। 

ঈদের সময় সুবিধাবঞ্চিত কিংবা অবহেলিত মানুষের পাশে যখন দাঁড়াতে পারি কিংবা তাদের প্রতি দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে পারি, তখন হৃদয়ে অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করে। মানুষের মধ্যে যে আনন্দ দেখতে পাই, সেটিই নিজের কাছে সবচেয়ে বড় খুশির কারণ হিসেবে ধরা দেয়।