মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। কাজের সন্ধানে ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে এসেছিলেন ঢাকায়। শুরুটা টেক্সটাইল মিলসের বিক্রয়কর্মী হিসেবে। এরপর ১৯৭৬ সালে নিজেই ব্যবসায় হাত দেন। সময়ের ব্যবধানে হয়ে ওঠেন সফল উদ্যোক্তা, দেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বর্তমানে এ গ্রুপের অধীনে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও কারখানা, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজার লোকের। এবারের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে সফল এ মানুষটির ঈদ উদযাপনের গল্প। কথোপকথনে ছিলেন বদরুল আলম  

ছোটবেলায় দেশের বাড়ি আনন্দময় ঈদ কাটিয়েছি। আমাদের পরিবার খুব বড় ছিল না। বাবার একমাত্র ছেলেসন্তান আমি। আমার পাঁচ বোন। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি বিয়ের পর ছেলেমেয়ে নিয়ে বেশির ভাগ সময় চট্টগ্রামে গ্রামের বাড়ি ঈদ করেছি। ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ঈদ ওখানেই কাটিয়েছি। এখন আমার বয়স ৭৭। এর মধ্যে কোনো ঈদ ঢাকায় করেছি, কোনোটা চট্টগ্রামে করেছি। কোনো ঈদ আবার মক্কায় করেছি। যেমন গত বছরও মক্কা শরিফে করেছি। 

শৈশবের ঈদের সঙ্গে এখনকার অনেক পার্থক্য রয়েছে। যখন যৌবন ছিল, তখন আশা-ভরসা, চাহিদা ছিল; এখন সেগুলো নেই। আগে তো চাহিদা ছিল এটা করব ওটা করব, কারখানা করব, মসজিদ-মাদ্রাসা করব, শিল্প-কারখানা করব, দাতব্য কার্যক্রম চালাব, বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা ছিল কম বয়সে। এখন তো এগুলো নেই। এখন চিন্তাভাবনা হলো কী করে আখেরাতের দিকে যাব? কী করে আল্লাহকে জবাব দেব? কবরে কী জবাব দেব? হাশরে কী জবাব দেব? এ চিন্তার মধ্যেই এখন ৯০ শতাংশ সময় কাটে।

রমজানে সিয়াম পালনের পর যারা তরুণ, যুবক বা বয়সে ছোট তাদের জন্যই ঈদ, আনন্দ করার সময়। যারা রোজা ছিল তাদের জন্য ঈদের খুশি অন্য রকম। আমাদের এ বুড়ো বয়সে ঈদের আমেজ সে রকম নেই। যুবক বয়সে ঈদের জন্য নতুন জামা কেনা, চাঁদরাত পর্যন্ত আনন্দ-ফুর্তি হয়েছে। সন্তানদের নিয়ে বেইলি রোড গিয়েছি কেনাকাটা করতে, আনন্দ করেছি, এখন তো এগুলো আর নেই। এখন সন্তানরা যার যারটা নিজেরাই কেনাকাটা করে। আমি তো গত ১৫-২০ বছর ঈদের সময় এক টাকারও কাপড়-চোপড় কিনিনি। 

ব্যবসা এখন সন্তানরাই দেখে। আমি অবসর জীবনযাপন করছি। ঈদে আমাদের মিল-কারখানা ছুটি থাকে ৭-১০ দিন। শ্রমিকরা এ সময় যার যার বাড়ি চলে যান। আমরাও গ্রামের বাড়ি চলে যাই অথবা ঢাকায় ঈদ করি। শ্রমিকদের সঙ্গে তাই ঈদের তেমন কোনো স্মৃতি আমার নেই। তাছাড়া ঈদের সময় আমাদের কখনো কারখানা চালু রাখতে হয়নি। কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে হয় আমাদের। একদিন চালু রাখলে তিনদিনের ছুটি দিতে হয়। তাই ঈদের সময় কারখানা খোলা রাখি না। যদি কোনো বছর কোনো পার্টির বিশেষ অর্ডার থাকে, শিপমেন্টের দরকার হয়, তখন ওই বায়ার থেকে পারমিশন নিয়ে কারখানা চালু রাখতে হয়। এমনিতে চালু রাখার কোনো বিধান নেই।

ঈদে আমাদের সব শ্রমিক বেতন পান, বোনাস পান, যা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কেনাকাটা করেন যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। ঈদ শ্রমিকদের জন্য খুব আনন্দময়। তারা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদ উদযাপন করেন। একজন মানুষের আয় যখন বেড়ে যায়, তখন চাহিদা বেড়ে যায়, জীবনমান উন্নত হয়। শ্রমিকরা যেটা পান, সেটা দিয়ে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বাজেট করে রাখেন। একজন শ্রমিক গার্মেন্টসে কাজ করলে যাদের দক্ষতা ভালো তারা ওভারটাইমসহ ন্যূনতম ২৫-৩০ হাজার টাকা পান। এর সঙ্গে তারা বোনাস পান, অর্জিত ছুটির টাকা পান। এভাবে যারা যত টাকা পান তার মধ্যে থেকেই পরিবারের জন্য কেনাকাটা করেন। এখন অনেক পণ্যের দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম বাড়েনি। থ্রিপিসও ৪৫০-৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, শাড়ি পাওয়া যায় ২০০-২৫০ টাকায়। ফলে শ্রমিকরা সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটা করে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ নিয়ে ঈদ উদযাপন করেন। 

আমাদের কারখানাগুলোয় কর্মসংস্থান এখন ৮০ হাজার। শ্রমিকদের অনেকের বাড়িই নেত্রকোনায়। আমরা দেখি তারা একসঙ্গে ১০-২০ জন মিলে গাড়ি ভাড়া করে ঈদের সময় বাড়ি যান। বেশ আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন। তারা যতটুকু পাচ্ছেন ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট। শ্রমিকদের ঈদ আনন্দে কোনো কমতি দেখি না। 

ছেলেবেলা আর বর্তমান ঈদ, সবার ক্ষেত্রেই ভিন্ন বলে মনে করি। মানুষের ঈদ শৈশবে এক রকম, স্কুল-কলেজে থাকতে এক রকম, এরপর বিয়ে-পরবর্তী পারিবারিক জীবনে আরেক রকম। এরপর সন্তানরা বড় হয়ে গেলে ঈদের আনন্দ অন্য রকম হয়ে যায়। আবার অবসর জীবনে ঈদ হয় অন্য রকম। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে ঈদ একেবারেই ভিন্ন রকম। জন্মের পর মানুষ যেমন অসহায় থাকে, বৃদ্ধ বয়সেও তাই। এভাবে জীবনের ভিন্ন ধাপে ঈদ ও ঈদের অনুভূতি ভিন্ন ধরনের হয়।