গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক মোর্চা এডাবের প্রথম নারী নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান সেই নব্বইয়ের দশকে। গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন দেশের শিক্ষা খাতে। আজকের গল্প এ শিক্ষাবিদকে নিয়েই। লিখেছেন ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া
রাশেদা কে চৌধুরীর লেখাপড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি বিভাগে। শিক্ষাজীবন শেষে যোগ দেন একটি উন্নয়ন গবেষণা সংস্থায়। কর্মজীবন শুরু হয় তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে নারীর চিত্রায়ণ নিয়ে পরিচালিত গবেষণাকাজের সহযোগী গবেষক হিসেবে। এ গবেষণা করতে গিয়েই পাঠ্যবইয়ে নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিষয়টি লক্ষ করেন। মূলত এর পরই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন তিনি। দেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক মোর্চা অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউশনস অব বাংলাদেশের (এডাব) প্রথম নারী নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান সেই নব্বইয়ের দশকে। বর্তমানে তিনি গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যপদেও আছেন। দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি হিসেবেও। নিজের প্রচেষ্টা ও একাগ্রতা দিয়ে দেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন রাশেদা কে চৌধুরী।
রাশেদা কে চৌধুরীর জন্ম ১৯৫১ সালে, সিলেটে। ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, অসাম্প্রদায়িক একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তিনি। একান্নবর্তী পরিবারে প্রতিটি দিনই কাটত উৎসবমুখর পরিবেশে। পরিবারে মেয়েসন্তান হিসেবে কখনো বৈষম্যের শিকার হননি। বৈষম্যহীন এ পরিবেশ জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে সাহস জুগিয়েছে। উচ্চ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে অন্যতম অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছিলেন মাকে। চার সন্তান ও সংসার সামলেই ডাক্তারি পড়া সম্পন্ন করেছিলেন মা ডা. শারিকুন্নেসা চৌধুরী। নিয়মিত রোগীও দেখতেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আমার মা ডাক্তারি পড়া সম্পন্ন করেন বিয়ের পর। ফলে নারী হিসেবে সামনে এগোনোর ক্ষেত্রে সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং কখনো পারিবারিক বাধা আসেনি। এছাড়া একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগিতাও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও আমি আমার পরিবারে দেখেছি। বাবা সহযোগিতাপরায়ণ ছিলেন বলেই সংসার এবং সন্তান সামলে মা ডাক্তারি পড়া সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।’
শিক্ষাজীবন থেকেই নারীর অধিকার নিয়ে সচেতন ছিলেন রাশেদা কে চৌধুরী। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অসুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হবে তাকে। কিন্তু মাতৃত্বকে অসুস্থতা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন রাশেদা কে চৌধুরী। অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই কক্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের দাবি ছিল তার।
ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘মাতৃত্ব কোনো অসুস্থতা নয়। এ কারণে আমাকে যখন আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়, আমি রাজি হইনি এবং শেষ পর্যন্ত আমি অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেই পরীক্ষা দিই।’
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখেছেন এ শিক্ষাবিদ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাসম্ভব সহযোগিতাও করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘তখন আমরা ধানমন্ডির ১৯ নম্বর সড়কে থাকতাম। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের বাসা বেশ কাছাকাছি ছিল। এছাড়া শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এবং শহীদ এমআর চৌধুরী ছিলেন একই এলাকার বাসিন্দা। যুদ্ধের সময় আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করে এমআর চৌধুরীর বাসায় পৌঁছে দিতাম।’
রাশেদা কে চৌধুরীর কর্মজীবনে প্রবেশ বাবার অনুপ্রেরণায়। শিক্ষাজীবন শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন। কিন্তু বাবা অধ্যাপক গোলাম এহিয়া চৌধুরীর কথায় সিদ্ধান্ত বদলান। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘বাবা আমাকে বলেছিলেন—তুমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছ। তোমার জায়গায় কোনো ছেলে পড়লে সে নিশ্চয়ই বসে থাকত না। তাহলে তুমি কেন বসে থাকবে? বাবার এ কথাই আমাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে।’
কর্মজীবনে প্রবেশের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নব্বইয়ের দশকের সমাজ তখনো নারীকে উচ্চ কোনো পদে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না। ফলে রাশেদা কে চৌধুরীর সাফল্য অনেককেই অবাক করত।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক সভার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘তখন সব বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নেতৃত্বে পুরুষরা ছিলেন। এনজিওগুলোর প্রধানদের সভায় কোনো নারী থাকতে পারে, এটি তখন অনেকের চিন্তার বাইরে ছিল। নির্বাহী প্রধান (এডাব) হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুর দিকে আমি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একটি সভায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। যখন আমি সভাকক্ষে প্রবেশ করি, তখন আমার প্রতি সবার দৃষ্টি এমন ছিল যে এখানে নারী কেন, আমি হয়তো ভুল করে চলে এসেছি। পরে আমি যখন পরিচয় দিই, তখন তারা বিষয়টি বুঝতে পারে।’
রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হলো নারী শিক্ষায় অগ্রগতি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে প্রশ্ন হলো উপস্থিতি বাড়লেও অংশীদারত্ব কতটা বেড়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে, নারীর অংশীদারত্ব আশানুরূপ বাড়েনি। যদিও ৩২ বছর ধরে সরকারপ্রধান হিসেবে নারীরা রয়েছেন, তবুও সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি এখনো কম। যেমন গার্মেন্ট শিল্পের দিকে তাকালে দেখতে পাব, এ খাত টিকিয়েই রেখেছেন নারীরা। কিন্তু গার্মেন্টগুলোর প্রধান কতজন নারী? খুবই কম। এ জায়গাগুলোয় পরিবর্তন আনতে হবে। নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।’
নারীদের সামনে এগিয়ে যেতে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরামর্শ এ শিক্ষাবিদের। তিনি বলেন, ‘নারীর সামনে এগিয়ে যেতে তার নিজের যেমন আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, চেষ্টা করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকেও সহযোগিতাপরায়ণ হতে হবে। এছাড়া আমাদের দেশে নারীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সহিংসতা। দুঃখজনক হলেও সত্য, নারীর জন্য আমরা ঘর, চলার পথ, কর্মক্ষেত্র, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিরাপদ করতে পারিনি। সর্বত্রই সহিংসতা ঘটছে। এ সহিংসতার বড় কারণ বিচারহীনতা। মূলত তিনটি কারণে এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। প্রথমত, নারীদের একাংশ সামাজিক কারণে নির্যাতিত হয়ে চুপ থাকে, দ্বিতীয়ত, অনেক সময় বিচার চাইতে গেলেও তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ পায় না, এমনকি কখনো কখনো লাঞ্ছিত হয়। আর তৃতীয় কারণ হলো, অভিযোগগুলো পর্যাপ্ত প্রমাণসহ আদালতে উপস্থাপন করা হয় না। আমরা যদি নারীর সামনে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই এসব সমস্যা দূর করতে হবে।’
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে তরুণ প্রজন্মকে বেশ কাছ থেকে দেখেছেন রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি মনে করেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ দেখাতে পারলে তারাই রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।’
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘অনেকে বলে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু আমি তা মনে করি না। আমরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দেখেছি, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ দেখেছি। এসব বিষয়ে তাদের কিন্তু কেউ জোর করে রাস্তায় নামায়নি। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবাদে নেমেছে। অর্থাৎ তারা কিন্তু রাষ্ট্র-সমাজ নিয়ে ভাবছে। তাদের মাঝে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের সঠিক পথ দেখানো এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়া। সঠিক পথ দেখাতে পারলে তরুণদের হাত ধরেই রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে।’





