কংক্রিটের অবকাঠামো বর্তমান যুগের অন্যতম চাহিদায় পরিণত হয়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। তবে সেটি এখন নিরাপদ বাসস্থানের কথাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বাসস্থানকে নিরাপদ করে তুলতে নানা উপাদানের সঙ্গে যোগ হয়েছে কংক্রিটের অবকাঠামো। তাই এ অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সঠিক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজনীয় গুণগত মানের নির্মাণসামগ্রী। অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়ও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণের মৌলিক উপাদান হচ্ছে সিমেন্ট। মাটির গুণগত মান ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন মানের সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যুগে সিমেন্টের মানের ওপর নির্মাণ ব্যয়ের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। তাই কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধারণত যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়, সেটি হলো ইমারতটি কতটুকু টেকসই হবে, এটির নির্মাণ ব্যয় কেমন হবে, বসবাসের কারণে স্বাস্থ্যগত কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না ইত্যাদি। বাজারে সাধারণত দুই ধরনের সিমেন্ট দেখা যায়। একটা হচ্ছে ওপিসি বা অর্ডিনারি পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট। অন্যটি হচ্ছে পিসিসি বা পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট। যেসব সিমেন্টে ক্লিংকারের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে, সেগুলো অন্যদের তুলনায় টেকসই ইমরাত নির্মাণ করতে সক্ষম। ওপিসি সিমেন্টে ক্লিংকারের পরিমাণ ৯৫-১০০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। আর জিপসাম থাকে সর্বোচ্চ ০-৫ শতাংশ। পিসিসি এ-এম সিমেন্টে ক্লিংকারের পরিমাণ ৮০-৯৪ শতাংশ। আর পিসিসি বি-এম সিমেন্টে ক্লিংকারের পরিমাণ থাকে ৬৫-৭৯ শতাংশ। ফলে ওপিসি সিমেন্ট সাধারণত বড় বড় স্থাপনা বা সেতু ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে সাধারণ বা ছোট ইমরাতের ক্ষেত্রে পিসিসি সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। সিমেন্টের ব্যাগের গায়ে লেখা বিভিন্ন তথ্য দেখেই সহজে বোঝা যায় কোনটি পিসিসি আর কোনটি ওপিসি সিমেন্ট। নির্মাণের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে পিসিসি ও ওপিসি সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। মাটির সার্বিক পরিস্থিতি সাধারণ পর্যায়ে থাকলে, মাটিতে রাসায়নিক পদার্থসংক্রান্ত কোনো সমস্যা না থাকলে, কংক্রিট খুব দ্রুততার সঙ্গে শক্ত হওয়ার প্রয়োজন না হলে, কংক্রিটে ঢালাইয়ের সময় উৎপন্ন তাপমাত্রা হিসাবে ধরা না হলে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সব ধরনের পাইলিং, ফাউন্ডেশন, গাঁথুনি, ছাদ ও প্লাস্টারের কাজে পিসিসি সিমেন্ট ব্যবহার করা নিরাপদ ও টেকসই। অন্যদিকে যখন বহুতল ভবন নির্মাণ, উচ্চশক্তিসম্পন্ন শিল্প-কারখানার কাঠামো নির্মাণ, পানির নিচে কংক্রিটের অবকাঠামো তৈরি, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হলে ওপিসি সিমেন্ট ব্যবহার করা নিরাপদ। এছাড়া মাটি পরীক্ষায় (সয়েল টেস্ট) সালফারসহ কংক্রিটের জন্য বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে এবং কংক্রিট খুব দ্রুততার সঙ্গে শক্ত হওয়ার প্রয়োজন হলে ওপিসি সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ঢালাইয়ের কাজের জন্য বিশেষায়িত সিমেন্ট বাজারে নিয়ে এসেছে। গ্রাহকরা যখন ঢালাই করবেন, বিশেষ করে মাটির নিচে বা ছাদের জন্য তখন এ সিমেন্ট সবচেয়ে বেশি উপযোগী। অন্য সিমেন্টের তুলনায় এ সিমেন্ট অনেক বেশি টেকসই। প্রায় ওপিসির সমান দ্রুত জমাট বাঁধতে পারে। যার কারণে দ্রুত মজবুত হয়ে যায়। বাজারে যেসব সাধারণ সিমেন্ট মাল্টিপারপাস কাজে ব্যবহার করা হয়, তাদের তুলনায় গুণগতমানসম্পন্ন। প্রতিষ্ঠানটি এ বিশেষায়িত সিমেন্টের ব্র্যান্ডিং করছে ‘ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট’ হিসেবে, নীল রঙের ব্যাগে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত কারখানাটিতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত দেড় হাজার মানুষের। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে দুটি ইউনিটে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইউনিক সিমেন্ট তাদের জার্মান পলিকম প্রযুক্তি এবং রোলার প্রেস প্রযুক্তির সংযোজন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল আমদানি করে থাকে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে। নির্মাণকাজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি বেশি কিছু ক্যাটাগরির সিমেন্ট উৎপাদন করে থাকে। যেকোনো স্থাপনার ছাদ, বিম ও কলামের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ও অত্যধিক কার্যকর এ ব্লেন্ডেড সিমেন্ট বাংলাদেশের নির্মাণসামগ্রী খাতে একটি যুগান্তকারী সূচনা বলে মানছেন নির্মাণ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সাড়ে চারশ যানবাহন রয়েছে। ২০০২ সালে গঠিত ইউনিক সিমেন্ট দ্বিতীয় গোমতী সেতু, কাঁচপুর ও মেঘনা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় ভৈরব রেলওয়ে সেতু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু (যমুনা রেল সেতু), পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারি-বেসরকারি বহু গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয় মাথায় রেখে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। কারখানায় কাঁচামাল খালাসের সময় সাধারণত ধুলার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হয়। সেটি রোধ করতে প্রতিষ্ঠানটি ইকোহপারের মাধ্যমে কাঁচামাল খালাস করে। এর মাধ্যমে খালাস করা হলে ধুলা ওড়ে না। ফলে ইকোহপার পরিবেশগত দূষণ রোধ করে। অন্যদিকে স্বল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইউনিক সিমেন্ট অনন্য। ওয়ার্ল্ড সিমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউসিএ) প্রজেক্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৩-এর গ্রাইন্ডিং আপগ্রেড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (ইউসিআইএল)। গ্রাইন্ডিং সার্কিটে ইনোভেটিভ ডিজাইনের মাধ্যমে ক্যাপাসিটি বাড়ানো এবং পাওয়ার কনজাম্পশনে সাশ্রয়ের জন্য এ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ঘুরেও দেখা গেছে পরিবেশ সচেতনতা ও আধুনিক সব প্রযুক্তির উপস্থিতি। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশবিষয়ক সচেতনতাসহ নানা কর্মযজ্ঞ চালু রেখেছে ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। প্রতিষ্ঠানটিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও নদীপথ।
ইউনিক সিমেন্টের বিশেষায়িত ব্র্যান্ড ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট হচ্ছে বিশেষ ধরনের ব্লেন্ডেড সিমেন্ট, যাতে সমন্বিত হয়েছে ওপিসি ও পিসিসি সিমেন্টের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ। এ সিমেন্ট প্রথম দুদিনেই ওপিসি সিমেন্টের সমান দৃঢ়তা অর্জন করে। সেই সঙ্গে এ সিমেন্ট একদিকে যেমন স্বল্প সময়ে সাধারণ পিসিসি সিমেন্টের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত দৃঢ়তা লাভ করে, তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে স্থাপনাকে করে আরো সুদৃঢ়। তাই দ্রুত সময়ে যেকোনো স্থাপনার ছাদ, বিম ও কলামের সেরা নির্মাণ নিশ্চিত করতে ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট বিশেষভাবে কার্যকর। এছাড়া সাধারণ পিসিসি সিমেন্টের ২৮ দিনের দৃঢ়তার প্রায় ৫০ শতাংশ প্রথম দুইদিনে এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রথম সাতদিনে অর্জন করে। দ্রুত দৃঢ়তা অর্জনের (র্যাপিড হার্ডেনিং) কারণে দীর্ঘমেয়াদি শাটারিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে খরচ বাঁচায়। সাধারণ পিসিসি সিমেন্টের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি দৃঢ়তা দেয়। দ্রুত দৃঢ়তা অর্জন (র্যাপিড হার্ডেনিং) ও দীর্ঘমেয়াদি শাটারের প্রয়োজনীয়তা না থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ ইটের গাঁথুনি দ্রুত শুরু করা যায়। ফলে নির্মাণকাজে সময় কমে যাওয়ায় আনুপাতিক হারে কমে যায় নির্মাণ ব্যয়ও।





