মানুষ কেন ব্যাংকে টাকা রাখবে?

মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে মূলত টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ব্যাংক একটা নিরাপদ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রেগুলেটেড বা নিয়ন্ত্রিত জায়গা। রাষ্ট্রীয় এই নিয়ন্ত্রণের ওপর মানুষের আস্থা থাকে, আর সেটাই স্বাভাবিক। পাশাপাশি থাকে টাকা ব্যাংকে রেখে মুনাফার বিষয়টি। থাকে নিজের আর্থিক অবস্থা রেকর্ডভুক্ত করার বিষয়, যাতে করে ঋণ পাওয়া যায়, এলসি খুলে নানা ধরনের আমদানি ও রফতানিতে অংশ নেয়া যায়। আরো থাকে লেনদেন করার সক্ষমতা অর্জনের বিষয়। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে আপনি বিদেশে সন্তানের পড়ার খরচ বহন করলেন বা এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে কিংবা এক ব্যাংকেরই শাখা থেকে অন্য শাখায় টাকা পাঠিয়ে আপনি আপনার গ্রামের বাড়ির কোনো প্রয়োজন মেটালেন। ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে দেশীয় বা বৈদেশিক লেনদেনে অংশ নেয়ার নিরাপদ সুযোগ কিন্তু আপনার নেই। মূল কথা—পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে আপনি মানে আপনার মূলধন। কিছুটা খারাপ শোনালেও কথা সত্য। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে নিজের মূলধন সৃষ্টি ও বিকাশের বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে। 

অর্থনীতি ও ব্যাংকের কাছে আমানতের গুরুত্ব কী? 

অর্থনীতিতে বিনিয়োগ জিনিসটা হয় আমানত থেকে। শিল্প, উৎপাদন, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য, যে খাতই হোক না কেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে আমরা যা-ই বুঝি না কেন, সেসব কর্মকাণ্ডের জন্যই দরকার তারল্য। আর তারল্য তৈরি হয় আমানত থেকে। তারল্য ঋণ দিয়েও তৈরি হতে পারে, কিন্তু তারল্যের জন্য আমানতই আসল উৎস। ব্যাংক ব্যবস্থা এই আমানত তৈরি করে একটা জনগোষ্ঠীকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে। আর এই আমানত যে বিনিয়োগে ব্যয়িত হচ্ছে, এ দুটি জিনিসের মাঝখানে বড় প্রশ্ন হলো ট্রান্সফার প্রাইস, অর্থাৎ যে দামে আমানতটা বিনিয়োগে লগ্নি করা হবে। সূত্রটা এমন—ঠিক দাম বা প্রণোদনা দিলে আমানত বাড়বে, আমানত বাড়লে তারল্য বাড়বে, তারল্য বাড়লে বিনিয়োগে টাকা লগ্নি করার ফান্ডিং ব্যয় কমবে। এ ব্যাপারটা প্রমাণিত, তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আসল সমস্যা দূরীভূত হবে। তার মানে, মানি সাপ্লাই ব্যবস্থাপনায় আমানতের ভূমিকাই আসল। আমানতের গুরুত্ব বোঝাতে এর চেয়ে বড় কিছু বলার দরকার নেই।

সিটি ব্যাংকের আমানত স্কিমগুলো সম্পর্কে জানতে চাই?

সিটি ব্যাংক ব্যক্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় গ্রাহককেই অর্থনৈতিক সেবা দিয়ে থাকে। উভয় গ্রাহকের জন্যই আমাদের আছে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব, মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম, দীর্ঘমেয়াদি হিসাব। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশে থাকা বিদেশী নাগরিকদের জন্যও আছে নানা স্কিম। ব্যক্তি পর্যায়ে এমনকি ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও আমাদের বিশেষ আমানতের স্কিম রয়েছে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিদেশ থেকে গ্রাহকের বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করার স্কিমও রয়েছে। মাসে মাসে টাকা জমা করে শেষে বড় অংক পেতে চাওয়ার ডিপোজিট পেনশন স্কিম আমাদের আছে দুই ধরনের—গোল বেইজড ডিপিএস; আবার ইন্স্যুরেন্স ব্যাকড ডিপিএস। চলতি হিসাবে সুদ আয় করার ফরচুন অ্যাকাউন্ট যেমন আছে, তেমন আছে একদম শরিয়াহসম্মত নানা ইসলামিক সঞ্চয় প্রোগ্রাম। 

এর মধ্যে কোন প্রডাক্টটি অন্যদের থেকে আলাদা?

এই মুহূর্তে সিটি ব্যাংকের একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মাসিক সঞ্চয় স্কিম আছে, যা আমার জানামতে অন্য কোনো ব্যাংকে নেই। এ স্কিমের আওতায় একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট মেয়াদের শেষে তার মাসিক সঞ্চয় থেকে কী পরিমাণ রিটার্ন চাইছেন সেটা মাথায় রেখে নিজের পছন্দমতো মাসিক কিস্তির পরিমাণ ও মেয়াদ নির্ধারণ করতে পারেন। আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যতিক্রম গ্রাহকের আমানত হিসাবগুলো ডিজিটালি ব্যবস্থাপনার সুবিধা করে দেয়ার মাধ্যমে। আমাদের সিটিটাচ অনলাইন ব্যাংকিং প্লাটফর্ম এখন দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। গত বছর এতে লেনদেন হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকার। এর বিস্তৃত সুবিধা দিয়ে যেমন আমরা অন্যদের থেকে আলাদা, তেমন রিসাইকেলিং এটিএম ও এসআইভিআর সেবার মতো ডিজিটাল সেবা দিয়েও আমরা অন্য কাতারের। 

আমানতকারীদের আস্থা অর্জনে আপনার ব্যাংক কতটুকু সফল?

সিটি ব্যাংক হলো তিন প্রজন্মের আমানতকারীদের ভরসার ঠিকানা। গত ৪০ বছর আমরা গর্বের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছি। সিটি ব্যাংকের নাম-সুনাম সময়ের সঙ্গে আরো উজ্জ্বল হচ্ছে। ৩০ লাখ গ্রাহক আমাদের কাছে তাদের আমানত রাখেন। ২০২৩ সালেই আমাদের ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার ভেতর ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতই ছিল ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একটা চ্যালেঞ্জিং বছরে এসব সংখ্যা কিন্তু ছোট নয়। চলতি ২০২৪ সালের প্রথম ২৫ দিনেই আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত বেড়েছে 

প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। আমাদের ওপর গ্রাহকের আস্থার আর বড় কী প্রমাণ লাগবে? 

বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আইএফসি এ ব্যাংকের একক সর্বোচ্চ শেয়ারহোল্ডার। তারা সবসময় আমাদের নতুন নতুন কিছু করতে ও ইনোভেটিভ হতে সাহায্য করে যাচ্ছে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা সিটি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ব্যাংক চেয়ারম্যান ও তার টিম পুরো ডিজিটালমুখী এবং লোন পোর্টফোলিওর মান বিষয়ে ক্ষমাহীন। ১৭২ বছরের গ্লোবাল ব্র্যান্ড আমেরিকান এক্সপ্রেস আমাদের সঙ্গে আছে, আবার বৈশ্বিক পরিসরে আমরা যুক্ত আছি পাঁচশয়ের বেশি করেসপন্ডিং গ্লোবাল ব্যাংকের সঙ্গে, যারা আমাদের সুব্যবস্থাপনা ও মুনাফার ধারাবাহিক ভালো প্রবৃদ্ধি দেখে নিয়মিত ফরেন কারেন্সি ফান্ডিং করে যাচ্ছে। গত এক বছরে যেমন ৬ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হয়েছে আমাদের হাত ধরে, তেমনই রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রেও আমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক। খেলাপি ঋণের হার কম রাখা, ঋণ প্রদানে স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল ব্যাংক সেবায় সবসময় নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার মাধ্যমে আমরা আমানতকারীদের ভরসার জায়গায় ছিলাম, আছি ও থাকব।

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকগুলোর আরো কী করা দরকার? 

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি গ্রাহককেন্দ্রিক হতে হবে। গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের বিকল্প নেই। এছাড়া ব্যাংকে সুশাসন কিংবা সঠিক খাতে গ্রাহকের আমানত থেকে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাটা জরুরি। ঋণ দেয়ায় স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে উন্নয়ন ঘটাতে থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা গ্রাহকের কাছে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা আরো সহজ করতে পারলে ব্যাংকগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষায় এগোবে এক ধাপ, আর আমানতের সুরক্ষার ব্যবস্থা করে এগোবে দ্বিতীয় ধাপ। ব্যাংক ব্যবসার সাইনবোর্ড টানালে কিছু আমানত কিন্তু আপনার ব্যাংকে আসবেই। বিষয়টা আমানত আনার চেয়ে ধরে রাখা ও সেই আমানত বেড়ে বেড়ে ব্যক্তি-মানুষের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভালো করায় সাহায্য করতে পারার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত। 

ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার ঘাটতি কেন হচ্ছে—এ ঘাটতি যাতে না হয় তার জন্য কী করা উচিত?

আমানতকারীদের টাকা থেকে ব্যাংক ঋণ দেয়। সেই ঋণ যদি মন্দ হয়, সেই পোর্টফোলিও থেকে যদি নেতিবাচক অভিঘাত আসে, তখন আক্ষরিক অর্থে আমানতের কিছু হয় না, কিন্তু আমানতকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়। ঋণ সাইডে স্ক্যাম বা স্ক্যান্ডাল বা কেলেঙ্কারি সব টলিয়ে দেবে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর বা এসএলআর ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রাতিষ্ঠানিক বড় আমানতকারীরা আমানত রাখতে গিয়ে মার্কেট রিস্কের লেন্স দিয়ে আপনার ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোর গুণাগুণ দেখেন, কিন্তু ব্যক্তি খাতের আমানতকারীরা দেখেন ব্যাংকের ইমেজ। এক্ষেত্রে ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো বিকল্প নেই।  শেয়ারহোল্ডারদের দেয়া অল্প টাকার মূলধন নিয়ে সেটার ১১-১২ গুণ সমান এ ঋণের ব্যবসা অন্তর্নিহিতভাবেই জনগণের আমানত নিয়ে ব্যবসা। এখানে আপনার ইমেজটাই আসল, আপনার ব্যাংকের নামটাকে ভালো ব্র্যান্ড বানানোর যুদ্ধটাই আসল।