সদ্যবিদায়ী ২০২৩ সালটি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেমন ছিল?

শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক খাতের জন্যই বছরটি চ্যালেঞ্জিং ছিল। বছর মাত্র শেষ হয়েছে, এখনো আমাদের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা হয়নি এবং আমার কাছে সব তথ্য নেই। ফলে আমি এখনই আমাদের আর্থিক পারফরম্যান্স সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলতে পারছি না। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে তাতে আমি বলতে পারি দেশের বেশির ভাগ এনবিএফআইয়ের মুনাফা প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ঋণাত্মক ছিল। দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং স্প্রেডের মার্জিন বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছিল। ডিবিএইচের কথা যদি বলি তাহলে ২০২২-এর তুলনায় ২০২৩ সালে আমাদের পারফরম্যান্স প্রায় একই রকমই ছিল। গত বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে আমাদের মুনাফা ৭ শতাংশের মতো কমেছে। এছাড়া ঋণ বিতরণ ও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স আগের বছরের মতোই ছিল বলা যায়।

গত বছর দেশের আর্থিক খাতে তারল্য সংকট দেখা গেছে। আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই।

গত বছর আমাদের আমানতের ক্ষেত্রে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে আমানত সংগ্রহের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গত বছরের শেষ প্রান্তিক থেকেই সুদের হার দ্রুত বাড়ছে। সার্বিকভাবে মুদ্রাবাজার, সরকারের ট্রেজারি বন্ড সব ক্ষেত্রেই সুদের হার বেড়েছে। তাছাড়া আগে আমানত ও ঋণের সুদ হারের ক্ষেত্রে যে সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল সেটি কিন্তু গত বছরের জুলাই থেকে অবলোপন করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে আমানত ও ঋণের সুদহার বাজারের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হচ্ছে। মানুষ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে আমানত রাখতে চান না। তারা সাধারণত ছয় মাস কিংবা এক বছর মেয়াদে আমানত রাখে। বাজার পর্যবেক্ষণ করে গ্রাহক দেখতে চায় সুদের হার বাড়ে কিনা আমরা যেহেতু আবাসন খাতে অর্থায়ন করি তাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের প্রয়োজন হয়। আমাদের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিওর মধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকাই এসেছে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত থেকে। আমাদের সবসময়ই লক্ষ্য থাকে গ্রাহক স্বল্প সময়ের জন্য আমানত রাখলেও সেটি যাতে তারা নবায়ন করেন। আমরা সেভাবেই তাদের সেবা দিয়ে থাকি।

গ্রাহকের মধ্যে স্বল্পমেয়াদে আমানত রাখার প্রবণতা বেশি দেখা যায় কেন?

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেটা দেখা যায় যে সুদের হার স্থির থাকে না। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়। ফলে গ্রাহক ১০ বছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট হারে আমানত রেখে বাড়তি সুদ থেকে বঞ্চিত হতে চান না। এ কারণে তারা স্বল্পমেয়াদে আমানত রেখে বাজারের সঙ্গে চলতে চান। এক্ষেত্রে সুদহার বেড়ে গেলে তারা বাড়তি সুবিধা পান। এজন্য প্রয়োজনে তারা সুদহার কমে যাওয়ার কারণে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিও নিতে রাজি থাকেন। দীর্ঘমেয়াদে আমানত সংগ্রহের জন্য আমরা বেশকিছু স্কিম নিয়ে এসেছি। যেমন আমাদের শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা আমানত স্কিমে আপনি হজের জন্য ডিপিএসের মতো অর্থ সঞ্চয় করতে পারবেন। তাছাড়া আমাদের আরেকটি স্কিম রয়েছে আবাসন খাতের জন্য। সাধারণত আবাসন খাতে সম্পত্তির পুরো অর্থ ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেয় না। গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট অংশ দেয় আর বাকিটা ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপনি চাইলে আপনার অংশের অর্থ মাসিক কিস্তিতে আমানত হিসাবে আমাদের কাছে রাখতে পারবেন। এ ধরনের স্কিমের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকের কাছ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করছি।

পরিবর্তনশীল সুদহারের ভিত্তিতে আমানত সংগ্রহ করা সম্ভব নয় কি?

সম্ভব। এ ধরনের দুঃসাহসী কাজ আমরা ২০০১ সালেই করেছি। সে সময় বাজারে এটি একেবারেই নতুন একটি উদ্যোগ ছিল। আমরা সে সময় গ্রাহকের জন্য একটি পরিবর্তনশীল সুদহারের ভিত্তিতে আমানত রাখার স্কিম চালু করেছিলাম। এক্ষেত্রে আমরা গ্রাহককে প্রণোদনা দেয়ার প্রস্তাব করেছিলাম। সেটি হচ্ছে ছয় মাস মেয়াদে আমানতের ক্ষেত্রে সে সুদহার নির্দিষ্ট থাকবে তার তুলনায় আপনি এক-চতুর্থাংশ বেশি পাবেন। এক্ষেত্রে সুদের হার কমে গেলেও তা এই বেঞ্চমার্কের নিচে নামবে না। কিন্তু তার পরও আমরা এক্ষেত্রে খুব বেশি সাড়া পাইনি। চাইলে এখনো আমরা এ ধরনের স্কিম করতে পারি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশের আর্থিক খাতে নির্দিষ্ট হারে আমানতের প্রতিই মানুষের আগ্রহ বেশি। তবে দীর্ঘমেয়াদে কারো কাছ থেকে আমানত নিতে চাইলে পরিবর্তনশীল সুদহারের দিকে যাওয়াটাই একমাত্র সমাধান।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদহার সমন্বয় করার প্রয়োজন তো রয়েছে?

আমানত ও ঋণের সুদহার বেঁধে দেয়ার কারণে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদহার সমন্বয় করা যায়নি। গত ছয় মাসে এ সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে গেছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি। আমানতের ক্ষেত্রেও ৯ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে, যা গত ছয় মাস বা এক বছর আগেও ৬ শতাংশ ছিল।

গ্রাহকের কাছ থেকে আরো বেশি আমানত আকৃষ্ট করতে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই?

এক্ষেত্রে আমরা তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পারফরম্যান্স, ঋণমান ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ। প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স ভালো হলে সেই প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখার ক্ষেত্রে গ্রাহকের আত্মবিশ্বাস থাকবে। একটা সময় পর্যন্ত মানুষ সুদহার বিবেচনায় আমানত রাখত। অতীতে কিছু অনিয়মের কারণে গ্রাহকের আমানতের টাকা আটকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর পর থেকেই গ্রাহকের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। গত ২৫ বছরে আমাদের খেলাপি ঋণ ১ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছি। এ সময়ে আমরা ১ কোটি টাকারও কম ঋণ অবলোপন করেছি। গত ১৮ বছর ডিবিএইচ ত্রিপল এ রেটিং পেয়েছে। বর্তমানে তথ্যের সহজলভ্যতা অনেক বেশি। ফলে গ্রাহক সহজেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে গিয়ে আর্থিক সূচকগুলো দেখে নিতে পারেন। আমানত রাখার আগে গ্রাহক যদি এসব তথ্য যাচাই করে নেন তাহলে আর দিনশেষে হাহাকার করতে হয় না। আমরা একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি যে যখনই কোনো গ্রাহক আমাদের কাছে আমানতের অর্থ নিতে আসেন হোক সেটি মেয়াদপূর্তির আগে কিংবা পরে, আমরা সঙ্গে সঙ্গেই তার অর্থ ফেরত দিয়ে দিই। এজন্য আমাদের একটি নির্দিষ্ট অংকের তারল্য সবসময় রাখতে হয় যাতে করে গ্রাহকের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়। এ কারণে গ্রাহক আমাদের ওপর আস্থা রাখছেন এবং তারা আমানত বারবার নবায়ন করেন। আমাদের ৮৮ শতাংশ আমানতই নবায়ন হয়ে থাকে। এটিই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচার-প্রচারণার চেয়ে আমরা আর্থিক পারফরম্যান্সের দিকে বেশি জোর দিয়ে থাকি।

গত বছর আপনারা শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। এতে কেমন সাড়া পেয়েছেন?

গত বছরের মে মাস থেকে আমরা শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছি। এরই মধ্যে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। আমাদের বিনিয়োগের ২৫ শতাংশই বর্তমানে শরিয়াহ উইং থেকে আসছে। ঢাকার মধ্যে বেশি সাড়া পেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ঢাকার বাইরেও এর পরিধি বিস্তৃত করা। শরিয়াহ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আমরা ব্যক্তিশ্রেণীর গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহে ভালো সাড়া পেয়েছি। এ বছর আশা করছি শরিয়াহ কার্যক্রম আরো বেগবান হবে।

বর্তমানে ডিবিএইচের প্রচলিত ও শরিয়াহ—দুই ক্ষেত্রে আমানতের রিটার্ন কেমন?

বর্তমানে প্রচলিত ধারার কার্যক্রমে আমরা গ্রাহককে আমানতের বিপরীতে ৯-১০ শতাংশ সুদ দিচ্ছি। কত সময়ের জন্য এবং কী পরিমাণে আমানত রাখা হচ্ছে এর ওপর এই সুদহার নির্ভর করে। বর্তমানে আমানতের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বনিম্ন সুদহার ৯ শতাংশ। আর শরিয়াহ উইংয়ের ক্ষেত্রে আমরা যে বিনিয়োগ করছি সেই বিনিয়োগ থেকে আমাদের যে আয় আসে এর ৮০ শতাংশ গ্রাহককে দিচ্ছি। এটি পরিবর্তনশীল। কারণ আমার আয় কম-বেশি হতে পারে।

এ বছর আপনাদের কী ধরনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা রয়েছে?

সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য। এ বিষয়ে এক বছর ধরেই আমরা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে কাজ করছি। সম্প্রতি আমরা আইএফসির কাছ থেকে ৩ কোটি ডলার বন্ডে সাবস্ক্রিপশন পেয়েছি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৩০ কোটি টাকা। এ অর্থ সাশ্রয়ী আবাসনের কাজে লাগানো হবে। এক্ষেত্রে আইএফসির তহবিলের পাশাপাশি আমাদের নিজেদের তহবিলও বিনিয়োগ করতে হবে। নিজেদের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর জন্যও আমরা কাজ করছি। ঢাকার বাইরে সব বিভাগীয় শহরে আমাদের শাখা রয়েছে। আগামী মাসে ময়মনসিংহে আমাদের আরেকটি শাখা উদ্বোধন হবে। এরপর আমরা জেলাভিত্তিক শাখা সম্প্রসারণের দিকে নজর দেব। পাশাপাশি আমাদের বিদ্যমান যেসব শাখা রয়েছে সেগুলোর কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে চাই।