নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বহু লেন টানেলের উদ্বোধন আজ। কর্ণফুলীর নিচ দিয়ে তৈরি প্রায় ৩ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথটি চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোয় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। শুরু থেকেই বৃহৎ এ কর্মযজ্ঞের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ চৌধুরী। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাবেক এ প্রকৌশলী শুনিয়েছেন টানেল নির্মাণের নানা অভিজ্ঞতার গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজিত সাহা 

দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম টানেলের প্রকল্প পরিচালক আপনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো জটিলতায় পড়তে হয়নি। কাজ শেষ হয়েছে নির্ধারিত সময়ে, দেশের বাস্তবতায় যা কিনা অনেকটাই দুরূহ। এ সাফল্যে কী কী অনুষঙ্গ কাজ করেছে? 

একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সত্যিই কঠিন কাজ। এ প্রকল্প নিয়ে সরকারি সহযোগী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ছিল অভূতপূর্ব। যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ মুখ্য সংকট হিসেবে হাজির হয়। টানেল প্রকল্পে জেলা প্রশাসন দ্রুত এ কাজ সম্পন্ন করেছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পেয়েছে। 

টানেলের কাজ শুরুর আগে প্রকল্প এলাকায় বিশেষায়িত বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পিডিবির সহযোগিতার বিষয়টি বিভিন্নভাবে উঠে আসছে...

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কারো সহযোগিতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। যার যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল তারা সেটাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করেছে। এর পরও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতার বিষয়টি একটু আলাদাভাবেই বলতে হয়। টিবিএম (টানেল বোরিং মেশিন) অপারেশনের জন্য আমাদের ১৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ সংযোগ জরুরি ছিল। কিন্তু প্রথম ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সাব-স্টেশনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় সংকটময় পরিস্থিতি পার করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই সংকট সমাধান করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করতে পেরেছি। 

করোনাকালীনও টানেলের কাজ বন্ধ হয়নি। কী ধরনের পদক্ষেপের কারণে নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে পেরেছেন? 

কভিডের সময়েও টানেলের মূল পূর্তকাজ চালু রেখেছি আমরা। সমস্যা ছিল, তার পরও বিশেষ বিবেচনায় নির্মাণকাজ থেমে থাকেনি। এমনও হয়েছে টানেলের কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় কর্মী গেছেন, লকডাউন থাকায় পুলিশের মার খেয়েছেন। কাস্টমস বন্ধ ছিল, কিন্তু টানেলের মালপত্র বন্দরে চলে আসায় কাস্টমস অফিসারদের বাসায় বাসায় গিয়ে পণ্য ছাড়করণের কাজ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বিশেষত সচিব পর্যায় থেকে কাস্টমসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে যোগাযোগ করে টানেলের জন্য বিশেষ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। ফলে কভিডকালীন লকডাউনেও কাজ চালিয়ে যেতে উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা হয়নি।

টানেল নির্মাণের মূল কাজ বোরিং বা সুড়ঙ্গ তৈরি। এ কাজ করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছে?

টানেলের বোরিংয়ের জন্য সুষ্ঠুভাবে টিবিএম ব্যবহারই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। মেশিনটি হার্ড রক অর্থাৎ পাথর বা শক্ত মাটিতে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। আমাদের এখানকার মাটি নরম হওয়ায় বোরিং মেশিন দিয়ে কাজ করাটা ছিল কঠিন। এজন্য প্রথম টিউবের কাজ শেষ করতে ১৭ মাস সময় লেগেছে। যদিও দ্বিতীয় টিউবের কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে মাত্র নয় মাস। টিবিএম ব্যবহারে নানা দুর্ঘটনাও হয়। আমরা সফলভাবেই মেশিনটি ব্যবহার করে টানেলকে বাস্তব রূপ দিয়েছি। এটাই আমাদের সাফল্য। 

কারিগরিভাবে ক্রস প্যাসেজ (দুই টানেলের সংযোগপথ) স্থাপন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। কাজটির অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাই। 

পৃথিবীর অনেক টানেলেই ক্রস প্যাসেজ নেই। আধুনিক সময়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় আমরা কোনো ঝুঁকি বা ত্রুটি রাখতে চাইনি। টিবিএম দিয়ে একটি নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগমেন্ট বসানো হলেও ক্রস প্যাসেজ নির্মাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কাজ। ম্যানুয়ালি এ কাজ করতে হয়। যার কারণে নদীর গভীরের মাটি মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে নামিয়ে খনন করে অন্য টিউবের সঙ্গে সংযোগ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক অপারেশন চলাকালে একটি টিউবে যদি কোনো দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা সমস্যা হয় তাহলে জরুরি ভিত্তিতে অন্য টিউবে মানুষ নিরাপদে পৌঁছে যেতে পারবে। টানেলের সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি সফলভাবে সম্পন্নের পর টানেল নির্মাণে আমাদের সব সংশয় ও আশঙ্কা কেটে যায়।

বাংলাদেশের ভূমিরূপের কী কী সুবিধা টানেল নির্মাণে কাজে লেগেছে বলে মনে করছেন? 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, টানেল টিউব বোরিংয়ের সময় পানি লিকেজ হয়। মাটিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকলে এ সমস্যা হতে পারে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এ সমস্যা হয়েছে বলে আমাদের প্রকৌশলীরা বিদেশে প্রশিক্ষণকালীন জানতে পেরেছেন। কর্ণফুলী নদীর তলদেশের ভূগর্ভের মাটি শুষ্ক থাকায় টানেলের ভেতরে পানি প্রবেশের হার ছিল খুবই নগণ্য। এ কারণে টানেল বোরিং কাজে সময় লেগেছে কম। টানেলের ভেতর অত্যাধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেম থাকায় পানি প্রবেশের আশঙ্কাও কমে গেছে। 

টানেল ব্যবহারকালীন দুর্ঘটনা ঝুঁকি কতটুকু? 

নির্মাণকালীন দুর্ঘটনা ঝুঁকি ছিল। কিন্তু কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই টানেলের মূল কাজগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছি আমরা। সবচেয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টানেল নির্মাণ করায় দুর্ঘটনা ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে টানেল নির্মাণ শেষে ব্যবহারকালীনই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি থাকবে। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। 

টানেলের কাজ দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলেও সার্ভিস এরিয়ার কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। এর কারণ কী?

আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টানেলের মূল কাজ শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সার্ভিস এরিয়ার কাজও শেষের পথে। এটির সঙ্গে অবশ্য মূল টানেলের যানবাহন চলাচলের কোনো সম্পর্ক নেই। এর পরও সর্ভিস এরিয়ার যেসব কাজ টানেলের নিরাপত্তা ও যানবাহন চলাচলে সম্পৃক্ত সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হয়েছে। আশা করি, প্রকল্পের মেয়াদ শেষের আগেই সব কাজ শতভাগ শেষ হয়ে যাবে। 

বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে কাজ করার মাধ্যমে দেশের অনেক প্রকৌশলী ও শ্রমিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

আপনি ঠিক বলেছেন, টানেল নির্মাণের প্রকৌশলকাজ সারা বিশ্বে খুবই সীমিত একটি সিভিল ওয়ার্ক। এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব কম মানুষেরই হয়। এখানকার প্রকৌশলীরা ভবিষ্যতে দেশের অন্য প্রকল্পে ভালোভাবে সার্ভিস দিতে পারবেন। ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকৌশলীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন। তাছাড়া সেতু কর্তৃপক্ষের বাইরে থেকে যারা কাজ করেছেন তাদের বিদেশেও ভালো চাকরি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেসব শ্রমিক এখানে প্রকৌশলগত কাজে যুক্ত ছিলেন তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) কাছ থেকে অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে পারবেন বলে আমি মনে করছি।