দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য এক মাইলফলক হতে যাচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩। টার্মিনালটির সফট লঞ্চিংয়ের প্রাক্কালে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোটির নানা দিকসহ দেশের এভিয়েশন খাত নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম 

থার্ড টার্মিনাল তো নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এভিয়েশন খাতের জন্য এটি কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে?

বিমানবন্দর হলো একটি দেশের গেটওয়ে। বিমানবন্দরে এসেই কিন্তু একজন মানুষ দেশ সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যায়। এ ধরনের একটি টার্মিনাল ভবন অবশ্যই আমাদের দেশের যে ভাবমূর্তি আছে সেটিকে আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এতদিন আমাদের যে টার্মিনাল ছিল সেটা অনেক পুরনো। এটা লাইনিং করা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের একটা বিমানবন্দর হিসেবে। তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানীর বিমানবন্দর হিসেবে প্ল্যান করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত কিছুটা কাজ করা হয়েছিল। তারপর স্বাধীনতার পর আবার কাজ করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে এয়ারপোর্টটা যাত্রা শুরু করে। সেই সময় যে যাত্রীসংখ্যা ছিল, যে মুভমেন্ট ছিল তখনকার চেয়ে এখন ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যে পরিকল্পনা দরকার ছিল তা সম্ভব হয়নি। যে কারণে আমাদের কিছু সমস্যা হতো। যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেভাবে করা দরকার ছিল তা কিন্তু করা যায়নি। নতুন টার্মিনাল হওয়ায় এটা পরিকল্পনামাফিক করা যাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তাসহ যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার তার সবগুলোই বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে এটা অনেক বেশি বাস্তবমুখী হয়েছে। এ টার্মিনাল থেকে এখন সবাই লাভবান হবে।

এ টার্মিনাল ছাড়াও সরকার শাহজালালে একটি বিকল্প রানওয়ে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগকে কীভাবে দেখেন?

আমাদের যাত্রীদের চাহিদা দুই রকমের। একটা হলো স্বাচ্ছন্দ্য। পরিকল্পিতভাবে টার্মিনাল-৩ নির্মাণ করায় যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি নিশ্চিত হবে। কিন্তু আমাদের এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রানওয়ে। একটি রানওয়ে হওয়ার কারণে একসঙ্গে প্লেন টেকঅফ-ল্যান্ডিং করতে পারছে না। একসঙ্গে যদি দুই-তিনটি এয়ারক্রাফট আসে তাহলে তাদের অপেক্ষা করতে হয়। এ অঞ্চলে ঢাকা এয়ারপোর্ট খুব ব্যস্ততম একটি এয়ারপোর্ট। যখন পিক টাইম থাকে, ডমিস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ওঠানামা করে তখন দেখা যায় যে প্লেনগুলো রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা উড়লে আরেকটা পারছে না। আবার একটা ল্যান্ডিং করলে আরেকটা করতে পারছে না। ফলে প্রায় দেখা যায় যাত্রীদের প্লেনের মধ্যে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় যে প্লেন ঢাকার আকাশে ঢুকে গেছে কিন্তু ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছে না জন্য ল্যান্ডিং করতে পারছে না। কারণ রানওয়েটি সবসময় ব্যস্ত থাকছে। কোনো কারণে যদি রানওয়েতে দুর্ঘটনা ঘটে, একটা পশুপাশি ঢুকে পড়ে তাহলে পুরো রানওয়ে বন্ধ থাকে। যদি রানওয়েতে কোনো দুর্ঘটনা হয় তাহলে দেখা যায় এক-দুই-তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। এ সমস্যা সমাধানে শাহজালালে নতুন একটি স্বাধীন রানওয়ের খুব দরকার।

শাহজালালে নতুন করে স্বাধীন রানওয়ে করা কি সম্ভব?

আপাতত করা সম্ভব নয়। একসময় করার সুযোগ ছিল। তখন করা হয়নি। যেহেতু হয়নি সেহেতু এখন আর নতুন করে করার সুযোগ নেই। এখন আর প্যারালাল দুটো রানওয়ে করা সম্ভব নয়। এখন কিন্তু বিশ্বের প্রেক্ষাপটে একটা বা দুইটা রানওয়ে এ বিমানবন্দরের জন্য যথেষ্ট না। অ্যাট লিস্ট তিন-চারটা রানওয়ে দরকার। কারণ যাত্রী তো বাড়বে।

তাহলে আমাদের এখন করণীয় কী?

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা যদি বলি, আমাদের কাছে এ টার্মিনালটা খুব একটা অর্থবহ মনে হচ্ছে না। আগামী ১০-১৫ বছরে এ এয়ারপোর্টের যে অবস্থা দাঁড়াবে তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা এ এয়ারপোর্টের থাকবে না। এজন্য আমাদের উচিত নতুন জায়গায় নতুন একটা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট তৈরি করা। এটা খুব জরুরি ভিত্তিতে দরকার। কারণ একটা বিমানবন্দর গড়ে তুলতে ন্যূনতম ১০-১২ বছর সময় লাগবে। পৃথিবীর সব জায়গায় বিমানবন্দরগুলো শহরের বাইরে করা হয়। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আলাদা শহর গড়ে তোলা হয়। সেই শহরে কার্গো, ক্যাটারিং, ক্রুদের জন্য হোটেল, কনভেনশন সেন্টার সবকিছুর সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়। আমাদেরও এমন উদ্যোগ নিতে হবে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রী চাহিদাও তো প্রতিনিয়ত বাড়ছে?

পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে আমাদের প্যাসেঞ্জার ১৬০ শতাংশ বাড়বে। এটা বিশাল প্রবৃদ্ধি। এটা যদি ধরে রাখতে হয় তাহলে তো আমাদের ওই ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। আরো অনেক এয়ারলাইনসকে আসতে সুযোগ দিতে হবে। দেশের এয়ারলাইনসগুলো বড় হচ্ছে। নতুন নতুন এয়ারক্রাফট আসছে। একসময় যারা ৪-৫টা ফ্লাইট অপারেট করত, এখন তাদের ১০-২০টা আছে। এই যে গ্রোথ আমরা দেখতে পারছি তা যদি ধরে রাখতে পারি। আবার বিদেশী এলারলাইনসগুলোকেও আসতে দিতে হবে। এটা ফ্রি ফেয়ার করতে হবে। অনেক সময় আমরা বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোকে রেসট্রিক্ট করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন এটাকে আমরা একটা হাব করব। কিন্তু হাব করতে গেলে অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো কনসিডার করতে হবে। যার প্রথম শর্তই হচ্ছে ওপেন এয়ার করতে হবে। যে কেউ আসতে চাইলে তাদের ফ্লাই করার অনুমতি দিতে হবে। প্রচুর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। হিউম্যান রিসোর্সেস থাকতে হবে, কানেক্টিভিটি বাড়াতে হবে। হাব করতে গেলে ওপেন এয়ার করতে গেলে দেখা যাবে আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো মার খাবে। আমাদের দেশে এখনো প্রাইভেট এয়ারলাইনস ব্যবসা ওভাবে গড়ে ওঠেনি। এখন কেউ কেউ একটু চেষ্টা করছে। 

টিকিটের বাড়তি দাম নিয়েও যাত্রীরা অভিযোগ করেন।

আমাদের দেশে টিকিটের দাম অনেক বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায়ও আমাদের অনেক বেশি। এর কারণ হলো ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই কম। ধরেন আমার ৫০০০ সিট দরকার কিন্তু আছে ৪০০০। তখন এক হাজার যেহেতু নেই তাই এটা নিয়ে বাড়তি লাভের চেষ্টা করে এয়ারলাইনসগুলো। ভারতে কিন্তু কমপিটিশন বেশি। নাম্বার অব এয়ারলাইনস বেশি। বিদেশী এয়ারলাইনস আছে। ফলে টিকিট ফেয়ার কম। ওদের ওখানে প্রতিযোগিতা করে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর আমাদের তো অ্যাডভান্সড বিক্রি হচ্ছে। এখানে এজেন্টরা আগেই টিকিট কেটে রাখছে, তারপর তারা বেশি দামে বিক্রি করছে। যার ফলে এয়ারলাইনসগুলো লাভ করছে আবার ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও বেনিফিট নিচ্ছে। উভয় পক্ষ বেনিফিট নিচ্ছে আর আলটিমেটলি আমাদের পাবলিক সাফার করছে। ফলে আমাদের সাপ্লাই বাড়াতে হবে এবং ফ্যাসিলিটি বাড়াতে হবে। এয়ারপোর্টগুলোর ফ্যাসিলিটি বাড়াতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনায় কার্গো পরিবহন কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

আমাদের শুধু টার্মিনাল করলেই হবে না। টার্মিনাল হলো একটি অনুষঙ্গ। আমাদের কার্গো ফ্যাসিলিটি তৈরি করতে হবে। কার্গো ভিলেজ তৈরি করতে হবে। কার্গো স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি থাকতে হবে। সিকিউরিটি থাকতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস থাকতে হবে। তাহলেই পরিপূর্ণ সার্ভিস দিতে পারব। তৃতীয় টার্মিনাল হচ্ছে এটা আনন্দের। এটা দেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করবে। এতদিন হয়তো বিদেশীরা এলে আমরা কিছু প্রেজেন্ট করতে পারতাম না। সেটা এখন করতে পারব। তারা দেখে খুশি হবে। আমাদের অনেক সুযোগ হবে ইনশা আল্লাহ।

টার্মিনাল-৩ যাত্রীসেবার মান বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে?

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টগুলোর আলাদা একটা অটোনমাস বডি থাকে। তারা কিন্তু এটাকে পরিচালনা করে। যতগুলো সার্ভিস প্রভাইডার আছে তারা সবাই কিন্তু ওই অথরিটির কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু আমাদের এখানে তার উল্টোটা। এখানে এয়ারপোর্ট পরিচালনা করছে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি। তারা রেগুলেটর। তারা দেশের সিভিল এভিয়েশন আইন প্রণয়ন, সিকিউরিটি, কে আইন মানছে কে মানছে না সেগুলো দেখা তাদের দায়িত্ব। এয়ারপোর্ট পরিচালনা কিন্তু তাদের দায়িত্ব না। যেমন আমাদের পাশের দেশের এয়ারপোর্টগুলোর সবারই কিন্তু একেকটা প্রাইভেট এনটিটি। সেখানে আলাদা অটোনমাস বডি থাকে। কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট অথরিটি, দুবাই এয়ারপোর্ট অথরিটি—সবগুলো কিন্তু এয়ারপোর্ট অথরিটি হিসেবে কাজ করে। শুধু আমাদের ব্যতিক্রম। আমাদের এখানে যারা সেবা প্রদান করে থাকে এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা প্রায় ২৫-৩০টা। যেমন ইমিগ্রেশন দেখছে পুলিশের ডিপার্টমেন্ট, এপিবিএম সিকিউরিটি দেখছে পুলিশ আছে, আনসার আছে, কাস্টমস ডিপার্টমেন্ট আছে। এছাড়া সব গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে। তারা প্রত্যেকেই কিন্তু এয়ারপোর্ট অথরিটির কাছে রিপোর্ট করে না। রিপোর্ট করে নিজেদের ডিপার্টমেন্টে। তাদের চাকরির উন্নতি-অবনতি ডিপেন্ড করে তাদের সুপিরিয়রদের ওপর। এয়ারপোর্টের ওপর তাদের দায়িত্ব না। যার কারণে তাদের দায়িত্ববোধটা এয়ারেপোর্টের কাছে থাকে না। একটা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ওখানে যায় দুই-তিন বছরের জন্য তারপর আবার তাকে বদলি করা হয়। এই যে প্রসেস এতে তো আমাদের রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে না। একজন যেকোনো ডিপার্টমেন্ট থেকে আসতে পারে কিন্তু তাকে কাজ শেখাতে তো সময় লাগবে দুই-তিন বছর। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যখন সে সার্ভিস দেয়ার মতো কিছু শিখে উঠবে তখনই সে বদলি হয়ে চলে যাবে। এ সমস্যা তো টপ টু বটম। এভাবে তো সার্ভিস উন্নতি করা যাবে না। এজন্য আমি সবসময় যেটা বলি, এটা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আন্ডারে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে হয়ে আসা উচিত।