বর্তমানে পরিমাণে বেশি না হলেও কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। তেমনই কিছু পণ্যের মধ্যে রয়েছে মসলা, মুড়ি, চানাচুর ও বিস্কুট।

ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ মসলা খেতে অভ্যস্ত। যদিও ইউরোপ-আমেরিকায় খুব বেশি প্রচলন নেই। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে। ফলে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন এথনিক বাজারে হলুদ, মরিচ, জিরা, আদাসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত গুঁড়ো মসলার ব্যাপক চাহিদা। সেখানে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রফতানিও করছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসেবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারের মসলাজাতীয় পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ কোটি ১৩ লাখ ডলারের মসলাজাতীয় পণ্য রফতানি হয়েছে।

প্যাকেটজাত মসলার মধ্যে রয়েছে আদা, জিরা, রসুন, হলুদ, মরিচ ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা। এছাড়া বর্তমানে বিরিয়ানি, মুরগি, গরু, হাঁস, মাংস, মাছ, সবজি, কাবাব, চটপটি, ফুসকা, তেহারি, খিচুড়িসহ বাহারি আইটেমের খাবারের জন্য আলাদা আলাদা মসলা পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বিদেশে মিক্সড মসলার চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণভাবে মৌলিক প্যাকেট মসলার চাহিদা বেশি। দেশের মানুষ আলাদা আলাদা মসলা দিয়ে খেতে অভ্যস্ত। কিন্তু বিদেশে মিক্সড মসলার চাহিদা বেশি। সে অনুযায়ী প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন মসলার ফ্লেভার বাজারে আনছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

মসলার মতোই চানাচুর ও মুড়ি এথনিক বাজারগুলোয় বেশি রফতানি হয়। বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক কিছু মুড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব মূলত মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার বাঙালি এলাকাগুলোয় বেশি পরিমাণে রফতানি হয়। তবে বিস্কুটের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। এ কারণে নতুন স্বাদযুক্ত বিস্কুট রফতানির দিকে বেসরকারি খাতও নজর দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেকারি পণ্যের রফতানির দিকেও ঝুঁকছে তারা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পণ্যের রফতানি প্রতি বছরই বাড়ছে। যদিও গত দুই-এক বছরে বৈশ্বিক সংকটে কিছুটা স্থির। তবে সামনের দিনগুলোয় রফতানি আরো বাড়বে বলে তারা জানান। এজন্য বৈশ্বিক বাজারে বৈচিত্র্য ধরে রাখতে হবে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচিবোধ ও চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। সে আলোকে পণ্য পরিবেশন করতে হবে। তা না হলে বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাত খুব বেশি এগোতে পারবে না। 

বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সার্বিক রফতানি বাড়লে কৃষকের আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল উৎস কৃষি হলেও কৃষকের জীবনমান খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। তারা ন্যায্যমূল্য পান না। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়লে কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে কৃষককে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। রফতানি হওয়া পণ্যের সুবিধাভোগী যেন কৃষক হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান ক্রমেই কমছে। এজন্য খাদ্য আমদানি করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ডলার সংকটে ঋণপত্র খোলা নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু বৈচিত্র্যময় রফতানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারলে এ সংকট থেকে দ্রুতই উত্তরণ সম্ভব।