বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টর ১০ বছর ধরে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সুতা ও কাপড়ের সিংহভাগ সরবরাহ করছে। পাশাপাশি দেশের প্রায় ১৭ কোটি লোকের বস্ত্রের মৌলিক চাহিদার সম্পূর্ণ অংশই পূরণে সক্ষম। তৈরি পোশাক শিল্পের বিশেষত রফতানিমুখী নিট পোশাক খাতের সুতার চাহিদার ৮৫ শতাংশ এবং রফতানিমুখী ওভেন পোশাক শিল্পের ফ্যাব্রিকের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে যে পরিমাণ বস্ত্রের প্রয়োজন, অর্থাৎ সাত বিলিয়ন মিটার, তার সম্পূর্ণ অংশই জোগান দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫১৯, যাদের সুতা উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৪০০ মিলিয়ন কেজি। দেশে প্রায় ছোট, মাঝারি ও বড় ওভেন ফ্যাব্রিকের মিল রয়েছে ২০ হাজারের মতো, যাদের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা সাত বিলিয়ন মিটার। অন্যদিকে, দেশে ২৫টির মতো হোম টেক্সটাইল মিল রয়েছে, যাদের বার্ষিক হোম টেক্সটাইল সামগ্রী উৎপাদনক্ষমতা ৮০০ মিলিয়ন মিটার এবং ডেনিম মিলের সংখ্যা ৪০, যাদের উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মিটার, যার সিংহভাগ রফতানি হয়।
বাংলাদেশ ডেনিম রফতানিতে আন্তর্জাতিক বাজারে আধিপত্য বিস্তার করলেও কভিড-১৯ ও তৎপরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এর রফতানি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অন্যদিকে, আমাদের তৈরি পোশাক বিশেষত ওভেন ও ডেনিমের সর্ববৃহৎ ব্যবহার হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজিএমইএর তথ্যমতে, ২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের ডেনিম রফতানি আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ১৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার, যা ২০২২ সালে প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩ সালের শুরুতে রফতানি আয় হয় ২৩৪ দশমিক শূন্য ৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ কম।
OTEXA-এর তথ্যমতে, ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেনিম সামগ্রী রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ৭৯৮ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করে। ২০২২ সালে তা ১৮ শতাংশ বেড়ে ৯৪৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩ সালের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডেনিম রফতানি আয় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে ১৩১ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ইউএস ডলারে নামে, যা পূর্ববর্তী বছরে ছিল ১৯৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূলত রেমিট্যান্সের পরই টেক্সটাইল ও ক্লথিং শিল্প দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অবদান রেখে আসছে। এ খাতগুলোয় সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। পাঁচ বছরে আমাদের মোট রফতানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে টেক্সটাইল ও ক্লথিং থেকে রফতানি আয় হচ্ছে গড়ে ৮৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মোট রফতানি আয় ৫৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে শুধু টেক্সটাইল ও ক্লথিং থেকে রফতানি আয়ের পরিমাণ হচ্ছে ৪৮ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যা শতাংশ হিসেবে প্রায় ৮৬ দশমিক ৫। এর মধ্যে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো যে পরিমাণ সুতা ও কাপড় রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে সরবরাহ করেছে, তার পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যার মধ্যে হোম টেক্সটাইলের অবদান উল্লেখযোগ্য।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৫১ মিলিয়ন ইউএস ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য রফতানি হয়। পরের বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনা মহামারীর কারণে তা কমে ৭৫৮ মিলিয়ন ইউএস ডলারে নামে। এর পরের দুই বছরে অবশ্য রফতানি দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি ৪৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১৩২ মিলিয়ন ইউএস ডলারে ওঠে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানি আরো বেড়ে ১ হাজার ৬২১ মিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়, এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয় ৪৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানি আয় প্রায় ৩২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯৫ মিলিয়ন ইউএস ডলারে নেমে আসে।
কভিড-১৯ ও তৎপরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পের কাঁচামালের অস্থিতিশীল মূল্য, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্যের সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনে বিপর্যয় ঘটে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের রফতানি আদেশ কমায় এবং ডলারের উচ্চমূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সুতা ও কাপড়ের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের তথ্যমতে, টেক্সটাইল ও ক্লথিং খাতের আন্তর্জাতিক বাজারটি উল্লিখিত কারণে দুই বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
এ অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে টেক্সটাইলের অন্যতম কাঁচামাল তুলার উচ্চ ও অস্থিতিশীল মূল্য এবং একই সঙ্গে সরকার কর্তৃক সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ট্যারিফ ১৬ টাকা (যা সহনীয় পর্যায়ে ছিল), থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা নির্ধারণসহ গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন এবং প্রসেসিং খরচ অত্যধিক বাড়ায় টেক্সটাইল খাতের মিলগুলো ৩০-৫০ শতাংশের বেশি ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজ করতে পারছে না, যার প্রভাব সরাসরিভাবে আমাদের তৈরি পোশাকে পড়েছে। ফলে মিলগুলোয় তারল্য সংকট তীব্র। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে টেক্সটাইল খাতের মিলগুলো আগামীতে কতদিন চালু থাকবে তা নিয়ে সংশয় আছে।
বর্তমান সংকটপূর্ণ সময়েও বিশ্ববাজারে ডেনিমের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে সাহায্য করছে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় খাতটি বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে আরো সমাদৃত করবে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খাতটি আধিপত্য বিস্তার করছে, যা দেশের রফতানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিটিএমএ মনে করে টেক্সটাইল খাতকে ওভেন ও নিট গার্মেন্টসের মতো আলাদা একটি রফতানি খাত হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এছাড়া বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি আয়ের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি পণ্যের ওপর যে ১৪ শতাংশ ডিউটি রয়েছে, তা কমানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া হলে বাংলাদেশের ডেনিম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারসহ অন্যান্য দেশেও আধিপত্য বিস্তার করবে।





