আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের এমডি ও সিইও হিসেবে প্রায় দুই বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন এম জামাল উদ্দিন। বিগত ২৯ বছর দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনি। সম্প্রতি আইডিএলসির সিএমএসএমই পোর্টফোলিও, ঋণ বিতরণ অভিজ্ঞতা, স্টার্ট-আপ, কৃষি খাতের কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে—
আপনার প্রতিষ্ঠানের ঋণ পোর্টফোলিওতে সিএমএসএমই খাতের অবস্থান কেমন?
আইডিএলসি এসএমই বিভাগের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিগত ১৭ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে সম্ভাবনাময় এ সিএমএসএমই খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এর প্রতিফলন আপনারা দেখবেন আমাদের ঋণ পোর্টফোলিওতে এ খাতে বিনিয়োগের শক্তিশালী অবস্থান দেখে। আইডিএলসির মোট পোর্টফোলিওর প্রায় ৩৮ শতাংশ বিনিয়োগ রয়েছে শুধু সিএমএসএমই খাতেই, যা আমাদের অন্যান্য যেকোনো একক খাতে বিনিয়োগের তুলনায় লক্ষণীয় মাত্রায় বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সিএমএসএমই খাতের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। বিশেষ এ তহবিল থেকে আপনারা কত টাকার তহবিল পেলেন?
সিএমএসএমই খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি ঘোষিত ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি। আমরা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এ তহবিলের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।
২০২৩-এর এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ তহবিলের আওতায় আমরা প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। বরাদ্দকৃত এ তহবিল থেকে আমরা প্রায় ১ হাজার ২০০ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়েছি, যা এ দেশের সব এনবিএফআইয়ের মধ্যে আইডিএলসির এক বিশাল অর্জন।
এখন পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে কী পরিমাণ ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বরাদ্দকৃত সিএমএসএমই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে পাওয়া অর্থের মধ্যে আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা দেশের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছি। বরাদ্দকৃত তহবিলের বাকি টাকা আমরা খুব শিগগিরই আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক দেশের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ সম্পন্ন করব।
গ্রাহক পর্যায়ে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে নেয়া ঋণের সুদহার অপেক্ষাকৃত কম। এ কম সুদহার উদ্যোক্তা তৈরিতে কী ভূমিকা রাখছে?
সিএমএসএমই ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তার সঠিক সময়ে অর্থের জোগান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় ঋণের সুদের হার কমার্শিয়াল সুদহারের তুলনায় কম, ঋণ পরিশোধের সময় মাসিক কিস্তিও তুলনামূলকভাবে কম হয়ে থাকে। এতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ঋণ গ্রহণের পর ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করার সুযোগ বেশি পেয়ে থাকে। এছাড়া আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে যেসব সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন, যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করা তাদের জন্য আরো সহজতর হয়ে যায়। এ ধরনের সময়োপযোগী সুবিধা প্রদান করায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে পুনঃঅর্থায়ন ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করার আগ্রহ লক্ষ করা যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাচ্ছে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ঋণের বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হোক। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিএমএসএমইর বড় অংশ এখনো ট্রেডিংনির্ভর। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ছিল ২৪.৪৫%, যা
আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। উৎপাদনশীল খাতের পরিধি আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে এ খাতকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং এসএমই উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করছে। আমি মনে করি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যাপকভাবে উদ্যোক্তা এবং কর্মী সবার দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, যা দেশের ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য চিহ্নিত এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এ পদক্ষেপ উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে আরো আগ্রহী করে তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য
সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আইডিএলসি নিয়মিত দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের এসএমই খাতে উৎপাদনশীল ও সেবা খাতের অবদান ৬৫ শতাংশ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইডিএলসি কাজ করে যাচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা যায় আইডিএলসির এসএমই পোর্টফোলিওতে, যেখানে ৬৫ শতাংশেরও বেশি অবদান রয়েছে উৎপাদনশীল ও সেবা খাতের।
আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হয়েছেন, এমন কিছু সফলতার গল্প জানতে চাই?
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের নাটোরের একটি ওয়ার্কশপ আমাদের আইডিএলসি থেকে প্রথম ঋণ গ্রহণ করে ২০১৫ সালে। সেই থেকে শুরু করে আইডিএলসিকে তার অগ্রযাত্রার সাথী হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী। তার ব্যবসার আট বছরের অগ্রযাত্রায় তিনি আইডিএলসি থেকে ঋণ নিয়েছেন মোট চারবার, যা ২০১৫ সালে ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে তিনি আইডিএলসির সঙ্গে একটি ৪৮ মাস মেয়াদি ঋণ সুবিধা উপভোগ করছেন ৬০ লাখ টাকার। এ সময়কালে তার বার্ষিক বিক্রয় ১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি টাকায়। এটা নিতান্তই গর্বের বিষয় যে তার এ অসাধারণ অর্জনে আইডিএলসি সবসময় সঙ্গে থাকতে পেরেছে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টার্টআপ’সহ
নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনার প্রতিষ্ঠান কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
নতুন উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পূর্ণাঙ্গ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে এবং এ তহবিল থেকে আইডিএলসি এরই মধ্যে প্রায় ২৫০ জন নতুন উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছে। শুধু তা-ই নয়, নতুন উদ্যোক্তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় নিয়মিত আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণসহ দক্ষতা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে আইডিএলসি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আজকের ছোট ব্যবসাগুলোই আগামী দিনের বৃহৎ ব্যবসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সিএমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে আরো কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?
উন্নত দেশগুলোর জিডিপিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি অবদান রেখে চলেছে, সেখানে আমাদের দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান এখনো মাত্র ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও আমাদের দেশের এসএমই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি অন্যান্য খাতের মতো বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়। এটি আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখেছি যে করোনা মহামারী, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের ১৬ কোটি মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত পাঁচ বছরে গড়ে আমাদের জিডিপির ৭৪ শতাংশই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যয় হয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে, আমাদের এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ স্তরের আর্থসামাজিক প্রভাব রাখতে পারি। যেকোনো দেশে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য মূলত তিনটি পদক্ষেপ যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন: ঋণ বিতরণের সময় সঠিক চ্যানেল ব্যবহার করা, এসএমই উদ্যোক্তা এবং কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং এ খাতের উন্নয়নের জন্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদিচ্ছা। আমাদের দেশে এরই মধ্যে এ তিনটি পদক্ষেপই ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পারব যে এ তিনটি পদক্ষেপ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে তাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে।
কৃষির উৎপাদন বাড়াতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। আরো একাধিক খাতের জন্যও গঠন করা হয়েছে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এ তহবিলগুলো থেকে অর্থ নিয়ে এনবিএফআইগুলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
কৃষি, উৎপাদন, সেবা—এ খাতগুলো দেশের অর্থনীতিতে মূল অবদান রেখে চলেছে। এ খাতগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুচিন্তিতভাবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। একই সঙ্গে যে শ্রেণীর উদ্যোক্তাদের মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে আরো বড় অবদান রাখার, সেই উদ্যোক্তাদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের একটি বৃহৎ এনবিএফআই হিসেবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি দেশের এসএমই ব্যবসাকে তহবিলগুলো থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা এনে দিতে। যদিও এসএমই ব্যবসায় বিনিয়োগ আপাতদৃষ্টিতে ব্যয়বহুল মনে হতে পারে, তবুও আমরা বিশ্বাস করি যে এ খাতের সমৃদ্ধিতেই আসবে অর্থনৈতিক উন্নতি। আইডিএলসির এসএমই ঋণের পোর্টফোলিওতে পুনঃঅর্থায়ন ঋণের অবদান রয়েছে ৩৫ শতাংশেরও বেশি। এনবিএফআইগুলোকে বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে এসএমই খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। কারণ আমরা জানি, এসএমই খাত করোনা মহামারীর মতো বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও খুব বেশি প্রভাবিত হয়নি, কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সিংহভাগ এসএমই খাতের ওপর নির্ভরশীল। গত পাঁচ বছরে আমাদের জিডিপির ৭৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যয় হয়েছে। এনবিএফআই হিসেবে আমরা এখানে বিশাল সম্ভাবনা দেখতে পাই, যে কারণে একটা লম্বা সময় ধরে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠন করা পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুবিধা এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে যথাযথ সুবিধা নেয়ার উদ্দেশ্যে এনবিএফআই হিসেবে আমরা বরাবরই সন্তোষজনক রেটিং এবং এনপিএল (খেলাপি ঋণ) হার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, শিগগিরই আমরা এসএমই খাতকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হব যখন দেশের জিডিপিতে
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে।





