দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, বড় স্বপ্ন আর সীমাহীন সম্ভাবনার দুয়ার খোলার দিন ২৮ ডিসেম্বর। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি ঢাকার নাগরিকরা প্রথমবার মেট্রোরেলে চেপে গন্তব্যে পৌঁছার প্রহর গুনছে। এমআরটি-৬ লেনের আংশিক কাজের শুভ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাসের নতুন বাঁকে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইতিহাসেরও ইতিহাস আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘সন্ধ্যা বেলায় দ্বীপ জ্বালার আগে সকাল বেলায় সলতে পাকানো।’ মেট্রোরেলের সূচনা হয় তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর উদ্যোগে গঠিত স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) রিভিউ কমিটির কারণে। সেই কমিটির একজন সদস্য ছিলাম আমি। রিভিউ কমিটির সুপারিশের কল্যাণেই আজ ঢাকাবাসী মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি।

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, ঢাকাবাসীকে এমন একটি আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম উপহার দেয়ার জন্য। আমি বেশ উত্ফুল্লের সঙ্গেই বলছি, মেট্রোরেল প্রকল্পটি একটি বিস্ময়কর প্রকল্প। এটি প্রণয়ন হয় বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে। নৈতিক অনুমোদন পায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। আর কার্যকরী অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলো আওয়ামী লীগ সরকারের যুগে এসে। সত্যিই দারুণ ব্যাপার।

ঢাকায় এমন একটি প্রকল্প আরো আগেই চালু করা উচিত ছিল। রাজধানীতে বর্তমানে দুই-আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটির বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল সড়কপথে চলাচল করে এমন গণপরিবহনই একমাত্র ভরসা ছিল। অথচ একটি মহানগরীর জন্য তা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। আধুনিক শহর বিবেচনায় ঢাকার কেন্দ্রে অনেক রিকশা দেখা যায়। উন্নত বিশ্বের কোনো শহরের কেন্দ্রে তা দেখা যায় না। এসব বাস্তবতা বিবেচনা করে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) নামে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা ছিল বিশ্বব্যাংক। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লুইস বার্জার গ্রুপ ইনকরপোরেশন ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড (বিসিএল)। এ দুই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মিলে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। পরিকল্পনাটির রিভিউর জন্য আবার একটি টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কাজ হলো ওই পরিকল্পনার কোথায় ভুল আছে, কোথায় শুদ্ধ আছে, কী যোগ করতে হবে বা বাদ দিতে হবে—এগুলো রিভিউ করা। প্রায় ৩০ সদস্যের কমিটির কনভেনর ছিলেন প্রয়াত ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। অন্যতম বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে ছিলাম আমি। ভূগোলবিদ, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিবেশবিদ, রেল বিশেষজ্ঞ, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞসহ টিমের সবাই মিলে আমরা কাজে নেমে পড়লাম।

দেখলাম, ঢাকাবাসীর জন্য প্রকল্পে গণপরিবহন হিসেবে কেবল বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) আর কমিউটার ট্রেন—দুই পদ্ধতির গণপরিবহন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে মেট্রোর কোনো ধারণাই ছিল না। তখন দিল্লিতে মেট্রোরেলের কাজ চলছিল। কলকাতায় মেট্রোরেল আগেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা বললাম, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা এক কোটি। ২০৩৫ সালে বৃহত্তর ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে তিন কোটিতে। এত বিপুল জনসংখ্যার জন্য কেবল বিআরটি আর কমিউটার ট্রেন ও সাধারণ বাস যথেষ্ট নয়। তাই বললাম, এটা কেমন কথা! এত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর শহর কিন্তু মেট্রো থাকবে না, এমন উদাহরণ তো পৃথিবীর কোথাও নেই। আমরা জোর দিয়ে বললাম, মেট্রো যুক্ত করতে হবেই। আমাদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেল যুক্ত করতে তারা বাধ্য হয়। শুরুতে কিন্তু তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আপত্তি করে বলে, আমাদের চুক্তির শর্তে তো মেট্রোর কথা বলা নেই। সুতরাং মেট্রো যুক্ত করব কীভাবে? অধ্যাপক জামিলুর রেজা, আর্কিটেক্ট তানভীর নেওয়াজ ও আমিসহ আরো কয়েকজন জোর দিয়ে বললাম, ঢাকাবাসীর জন্য মেট্রো লাগবেই। তখন তারা মেট্রোর পরিকল্পনা যুক্ত করে। ছয়টি লাইন হবে। এর মধ্যে ৬ নম্বরটির আজ উদ্বোধনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা।

এসটিপি পরিকল্পনাটি রিভিউকালীন বেশ মজার ছিল। আমরা দীর্ঘ এক বছর রিভিউর কাজ করেছি। কিন্তু এ কাজের জন্য কোনো ফি পাইনি। এসটিপি পরিকল্পনার প্রধান ছিলেন তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। আমরা তার কাছে রিভিউ প্রতিবেদন জমা দিই। তিনি সেটি রাখলেন। কিন্তু এ নিয়ে তাকে খুব একটা আগ্রহী মনে হলো না। অবশ্য তখন তাদের সরকারের মেয়াদও শেষের পথে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দিলেও কাজ শুরু করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর যে কয়টি প্রকল্প গুরুত্ব দিয়ে শুরু করে এর মধ্যে মেট্রোরেল অন্যতম। তবে মেট্রোরেলের কাজ করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় সংশ্লিষ্টদের। নতুন প্রযুক্তি। কারো কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ট্রেনিং নেই। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই কাজ করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কলকাতার তুলনায় ঢাকা অনেক দ্রুতই মেট্রোরেল বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। কলকাতায় মেট্রোরেল করতে বোধ হয় ২০ বছর লেগে যায়। আমরা শুরু করেছি ২০১২ সালে, এখন ২০২২। মাত্র ১০ বছর। এ সময়ে বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। এটাও বড় সফলতা বলতে হবে।

ভাড়ার বিষয়ে আমার পরামর্শ হলো যেহেতু ঢাকাবাসী মেট্রোয় অভ্যস্ত নয়, তাই শুরুতে ভাড়া যেন বাসের চেয়ে বেশি রাখা না হয়, এটা সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও যাত্রীদের মেট্রোয় অভ্যস্ত করতে হবে। অনেকে নেতিবাচক কথা বলাবলি করছে, যাত্রী পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। কিন্তু ঢাকাকে বাঁচাতে হলে মেট্রোর বিকল্প ছিল না। আর এখানে যাত্রী সংকটও হবে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষর্থীরা এর একটি বড় ব্যবহারকারী শ্রেণী হবেন। স্টেশনের আশপাশ এলাকার সঙ্গে শাটল বাস চালু করার যে পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, তা অভিনন্দনযোগ্য। অদূরভবিষ্যতে আমরা একাধিক নতুন মেট্রোলাইনের কাজ শুরু হতে দেখব—এ প্রত্যাশা রাখছি।

 

লেখক: নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি ও স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি রিভিউ) কমিটির সদস্য।