আজ দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস উদযাপিত যাচ্ছে। বর্তমানে বৈশ্বিকভাবেই জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের মুখে। দেশেও তার প্রভাব বিদ্যমান। এ অবস্থায় গ্রাহকদের সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিতে উপায় কী?

এ বছর এমন এক সময়ে দিবসটা পালন করা হচ্ছে, যখন দেশ জ্বালানি সংকট বা অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে সময় পার করছে। আমার একটা বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে, এ সংকটের সঙ্গে অন্য কোনো অনুষঙ্গ জড়িত কিনা। আমরা জ্বালানি আমদানিনির্ভর। জাপানও আমদানিনির্ভর একটা দেশ। কিন্তু সেখানে তো বাংলাদেশের মতো এত অস্থিরতা হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে তারা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। আমাদের জ্বালানি পোর্টফোলিওকে স্বল্পমেয়াদের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত করতে পারলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। ১০, ১৫ বা ২০ বছরের পরিকল্পনা অনুসারে জ্বালানি পোর্টফোলিওকে সাজাতে পারলে বিভিন্ন সময়ের অস্থিরতাটা আর দেখা যাবে না। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবার ওপরই পড়েছে। অকটেনের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে ধনীদের ওপর। কিন্তু ডিজেলের প্রভাব সবার ওপরই পড়েছে। বিশেষ করে কৃষি খাতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বিশ্বে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। কারণ আপনি টাকা দিলে জ্বালানি পাচ্ছেন। আপনি কীভাবে জ্বালানির বিষয়টি ব্যবস্থাপনা করছেন সেটিই হচ্ছে সংকট। সম্প্রতি গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কারখানায় উৎপাদনও বন্ধ করতে হয়েছে। ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে। সার উৎপাদনে গ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ কারণে যেক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রয়োজন, সেখানে সেটি দেয়াটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান। এখন সময় এসেছে আর্ন্তজাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করার। সব ধরনের জ্বালানির দাম এক হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ একজন ঢাকায় জন্ম নিল সে ভর্তুকিসহকারে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করবে। আরেকজন একই দিনে বরগুনায় জন্মগ্রহণ করায় তাকে ব্যবহার করতে হবে এলপিজি। এটা তো বৈষম্য। এটা চলতে পারে না। সবাইকে একই দামে গ্যাস দিতে হবে। আপনি যত উন্নত দেশে যাবেন, দেখবেন মানুষের মধ্যে ব্যবধান কম। আর যত অনুন্নত দেশে যাবেন তত ব্যবধান বেশি। দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা বিশ্বে দ্রুত অর্থনৈতিক বর্ধনশীল দেশ হয়েছি। আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করছি। এখন আর মান্ধাতার আমলের পরিকল্পনা দিয়ে চলবে না। যারা জ্বালানি সম্পর্কে জানে, তাদেরই জ্বালানিবিষয়ক নীতিনির্ধারণে রাখা উচিত।

রান্নার কাছে জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহার হয়। নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষই এর সুবিধাভোগী। দেশের এলপিজি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই?

সারা বিশ্বেই সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়েছে। যখন ক্রুড ওয়েলের দাম বাড়ছে, তখন এলএনজির দামও বাড়ছে। কয়লার দাম বাড়ছে। সবকিছুর দাম বাড়ছে। শুধু নিউক্লিয়ার ছাড়া। কারণ এটি জীবাশ্ম জ্বালানি না। সরকারের সহায়তার মাধ্যমেই এলপিজি খাতের বিকাশ ঘটে। সরকারকে ধন্যবাদ যে তারা জ্বালানি পোর্টফোলিওতে এলপিজিকে রেখেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আপনি একদিকে এলপিজিকে স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসকে ভর্তুকি দিচ্ছেন। আমার জন্য তো কোনো ভর্তুকি নেই। জ্বালানির ক্ষেত্রে এই যে একটা অসমতা, এটা বাধা সৃষ্টি করছে। সারা দেশে এলপিজির দাম যেভাবে নির্ধারিত হয়, এভাবে যদি অকটেন, ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম নির্ধারিত হতো, তাহলে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এলপিজি দিয়ে গ্যাসের চাহিদা মিটিয়ে দিতে পারতাম। সাধারণ জনগণের জন্য ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। আপনি শিল্প খাতকে বাধ্য করেন এলপিজি ব্যবহার করতে। এমন হতে পারে কোনো শিল্পের বয়লার ডিজেল দিয়ে চলবে না। এলপিজি দিয়ে চলবে। এটা করা যেতে পারে। কারণ খুব সহজেই ডিজেলের জায়গায় এলপিজি রিপ্লেস করা সম্ভব। ডিজেলের বর্তমান দাম ১১৪ টাকা। অন্যদিকে বর্তমান মূল্যে আমি প্রতি লিটার এলপিজি ৯০-৯২ টাকায় দিতে পারব। এতে যে ব্যয় সাশ্রয় হতো সেটি আপনি ভর্তুকি দিয়ে জনসাধারণের জন্য ডিজেল ৮০ টাকায় দিতে পারতেন।

দেশের এলপিজি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ কত?

এরই মধ্যে এ খাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই যে সক্ষমতা সেটির কিন্তু যথাযথ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। দামের কারণেই এমনটি হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ২০-২১ জনের মতো এলপিজি আমদানি করে। আরো তিন-চারজন আসছে। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা ৩০ পার হয়ে যাবে। অন্যান্য জ্বালানিতে ভর্তুকি না থাকলে এলপিজি খাতের অবদান ২০ শতাংশে দাঁড়াত, যেটি বর্তমানে ২-৩ শতাংশ। এখন নতুন নতুন অনেকেই এ ব্যবসায় আসছে। বিদেশী দুটি কোম্পানিও আসছে। সব মিলিয়ে এলপিজির বাজার যত বড় তার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়ে গেছে।

এ খাতের ব্যবসায় কেমন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে?

সর্বশেষ গত পাঁচ বছর বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু গত এক বছরে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর ১০০ শতাংশ হারে বাজার বেড়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এলপিজি খাতের ব্যবসায় বসুন্ধরার অবস্থান কী?

বসুন্ধরা ২০ বছর আগে প্রথম এলপিজি খাতে বিনিয়োগ করে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট আমাদের। যেখানে আমরা ঘণ্টায় চার হাজার সিলিন্ডার রিফিল করতে পারি। বাজারে আমাদের ৭০ লাখের বেশি সিলিন্ডার আছে। বর্তমানে দেশের এলপিজি খাতের ব্যবসার ২০-২২ শতাংশ বসুন্ধরার দখলে। আমাদের এখন যে সক্ষমতা ৩০ মিনিটের মধ্যে দেশের যেকোনো প্রান্তে এলপিজি পৌঁছে দিতে পারি। ছয়-সাত মিলিয়ন টন বিক্রি করার সক্ষমতা রয়েছে।

এলপিজি খাতের ব্যবসায় আপনাদের মুনাফা কেমন হচ্ছে?

আমরা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেছি। ফলে এক বছরের মধ্যেই লাভ উঠিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা নেই আমাদের। আমরা দীর্ঘমেয়াদে এ বাজার থেকে রিটার্ন নিশ্চিত করতে চাই। এলপিজি খাতে সাড়ে ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারিত। অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতির হার ৬-৭ শতাংশ।

এলপিজি খাতের ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাই?

এ ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লজিস্টিকস। ধারাবাহিকভাবে লজিস্টিকসে যেমন সিলিন্ডারে বিনিয়োগ করতে হবে। এখন সিলিন্ডারের দামের যে অবস্থা তাতে ভর্তুকি দিয়ে খুব বেশি কিছু করা যাচ্ছে না। আর যেহেতু এটা আমদানিনির্ভর ব্যবসা। সেহেতু প্রাইস নিয়ে একটা চ্যালেঞ্জ সবসময় থাকে। প্রতিযোগিতাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চারটি হচ্ছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে সম্ভাবনার দিক হচ্ছে, সব ধরনের জ্বালানির দাম সমান হয়েছে—এলপিজির বাজার আরো বড় হবে। আমাদের ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই?

আমরা ব্র্যান্ডিংয়ে শতশত কোটি টাকা খরচ করেছি। এখন বসুন্ধরা এলপি গ্যাস একটা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। আমাদের যে লজিস্টিক ক্যাপাসিটি আছে তা দিয়ে আমরা মার্কেটের ৫০ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করতে সক্ষম। আমরা এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাহিদুল ইসলাম