দেশের জ্বালানি খাতে গ্যাস, কয়লা ও খনিজ সম্পদ নিয়ে চার দশক ধরে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। জ্বালানি নিরাপত্তায় পেট্রোবাংলা কোন বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
জ্বালানি নিরাপত্তায় পেট্রোবাংলা স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তার ফলাফলও এখন দেখা যাচ্ছে। ২০০৯ সালে দেশে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ১৪টি অনুসন্ধান কূপ ও ৫৭টি উন্নয়ন কূপ খনন করেছে। মোট ৭১টি কূপ খননের ফলে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০১৭ সালে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৭৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। পরবর্তী সময়ে খনির মজুদ হ্রাস পাওয়ায় চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দৈনিক সরবরাহ হ্রাস পেয়ে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে।
পেট্রোবাংলা দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে ব্যাপক জোর দিয়েছে। তাতে ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে কী পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হবে?
সম্প্রতি কয়েকটি ওয়ার্কওভার কূপ খননের কাজ চলছে। ফলে এ বছরের শেষে বা ২০২৩ সালের প্রথম দিকে বিডিং রাউন্ড আহ্বানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অফশোরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানি অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন, পায়রায় এফএসআরইউ স্থাপন এবং মাতারবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ।
গ্যাস কূপ খননে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতাকে কাজে লাগাচ্ছে পেট্রোবাংলা। স্থানীয় কোম্পানির বাইরে বিদেশী কোম্পানিকে গ্যাস অনুসন্ধানে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা কী?
স্থানীয় কোম্পানি হিসেবে বাপেক্স দেশের তেল গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরন, রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ও চাইনিজ প্রতিষ্ঠান সিনোপ্যাক এর আগেও কূপ খনন করেছে। ২০১০-২১ পর্যন্ত যে ৭১টি কূপ খনন করা হয়েছে এর মধ্যে বাপেক্স ২৪টি, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) ২৫টি, গ্যাজপ্রম ১৮টি এবং সিনোপ্যাক ৪টি কূপ খনন করেছে। সর্বোচ্চ যতগুলো কূপ বাপেক্স করতে পারবে, সেগুলো বাপেক্স করবে। অবশিষ্ট কূপগুলোতে আগের মতো বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে স্পট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রেখেছে পেট্রোবাংলা। সেই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে এলএনজির চাহিদা পূরণ করার প্রচেষ্টা চলছে। কতটুকু সফলতা পাওয়ার আশা করছে পেট্রোবাংলা?
স্পট মার্কেটে বর্তমানে প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪৬-৪৭ ডলারে। এ মূল্যে এক কার্গো এলএনজি আমদানি করতে প্রয়োজন ১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। স্পট মার্কেট থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত এলএনজি আমদানি করা হয়েছে এবং গড়ে প্রায় ১৫০-২০০ এমএমসিএফডি হারে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে যদি একই হারে স্পট মার্কেটের গ্যাস সরবরাহ করা হয়, এক কার্গো গ্যাস ১৫-১৬ দিন সরবরাহ করা যাবে। ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। কিন্তু সম্প্রতি ওয়ার্কওভার কূপ খননের মাধ্যমে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। ওয়ার্কওভার কূপের খনন ব্যয় সবচেয়ে কম। বর্তমানে স্পট মার্কেটে এক কার্গো এলএনজির যে মূল্য তা দিয়ে ৮-১০টা অনুসন্ধান উন্নয়ন কূপ খনন করা সম্ভব।
স্থানীয় কয়লা উত্তোলন করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সেটি বৃহৎ আকারে করা গেলে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। কয়লা নিয়ে পেট্রোবাংলা কী ভাবছে?
সরকার দেশীয় কয়লা উত্তোলনেও কাজ করছে। সম্প্রতি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ১৩০৬ ফেস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়েছে। চায়নিজদের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় বছর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা যাবে। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টন হারে উত্তোলিত এ কয়লার পরিমাণ হবে বছরে ৪৫ লাখ টন। উৎপাদিত কয়লার পুরোটাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহূত হবে। ভবিষ্যতে দীঘিপাড়া কয়লাখনি থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করাও সম্ভব। ফলে দেশীয় কয়লা জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।
গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে পেট্রোবাংলার এখন চ্যালেঞ্জ কী?
গ্যাস উত্তোলন নিয়ে পেট্রোবাংলার সুচিন্তিত পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আমরা গ্যাস কূপ খননে গুরুত্ব দিয়েছি। সেক্ষেত্রে প্রতিটি কূপ খননে গড়ে ২৪-২৬ মাস সময়ের প্রয়োজন। ফলে কূপ খননে আগে থেকে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। অনুসন্ধান কূপের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিতভাবে প্রতি ৬-৭টি কূপ খনন করলে একটি সফলতা পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩:১। সেক্ষেত্রে প্রথম দুটি কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়া গেলে আর্থিক ব্যয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের গ্যাসের সম্ভাব্যতা নিয়ে গত চার দশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/সংস্থা জরিপ পরিচালনা করেছে। এখন সেই জরিপগুলো বিবেচনায় নেয়ার কথা বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সেই সমীক্ষাগুলো নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
এ ধরনের জরিপের বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থাকে, তবে সেগুলো যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসে পেট্রোবাংলার প্রতিপাদ্য কী?
এ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বহুমুখী জ্বালানি সমৃদ্ধ আগামী’। এ লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা কাজ করছে।





