আমাদের দেশে
বন্ধ্যাত্বের সমস্যা
বেড়েই চলেছে।
এ সমস্যা
শুধু নারীর
সমস্যা না,
এটি নারী-পুরুষ
উভয়েরই সমস্যা।
কাজেই বন্ধ্যাত্ব
সমস্যা নিয়ে
শুধু স্ত্রীকে
চিকিৎসকের কাছে
নিয়ে আসবে
তা কিন্তু
নয়, এক্ষেত্রে
অবশ্যই স্বামী-স্ত্রী
একসঙ্গে আমাদের
কাছে আসতে
হবে।
একটি আশার
খবর হলো
আজকাল বন্ধ্যাত্বে
আধুনিক চিকিৎসা
দেশে চালু
হয়েছে। আর
সেটি হলো
আইভিএফ (ইন
ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন)
বা টেস্টটিউব
পদ্ধতিতে গর্ভধারণ
করা। আমাদের
দেশে এটি
চালু হওয়ার
আগে অনেক
দম্পতি পাশের
দেশ ভারতসহ
বিভিন্ন দেশে
চিকিৎসা নিতে
চলে যেতেন।
দেশে সফলভাবে
আইভিএফ চিকিৎসা
শুরু হওয়ায়
সে চিত্র
পাল্টে গিয়েছে।
এক্ষেত্রে একটা
কথা বলা
দরকার, আমরা
কেন অ্যাডভান্স
এআরটি চিকিৎসায়
চলে গেলাম?
কেন আমরা
ন্যাচারাল মেডিসিন
বা শুধু
মেডিসিন দিয়ে
গর্ভধারণে সাকসেসফুল
হচ্ছি না?
এখানে যেটা
দেখা যাচ্ছে
যে, স্ত্রীর
সমস্যা ছাড়াও
স্বামীর বীর্যের
অনেক ধরনের
সমস্যা পাওয়া
যাচ্ছে। এর
মধ্যে খুবই
সাধারণ সমস্যাগুলোর
মধ্যে উল্লেখযোগ্য
কিছু সমস্যা
হলো বীর্যে
শুক্রাণুর সংখ্যা
কম, শুক্রাণুর
আকৃতি অস্বাভাবিক,
তার গতি
ঠিকমতো হচ্ছে
না, এসব
কারণে আমরা
দেখতে পাই
প্রাকৃতিক উপায়ে
বা শুধু
একটু মেডিসিন
দিয়ে প্রেগন্যান্সিগুলো
আনতে পারতাম
সেগুলো হচ্ছে
না। তখনই
দেখা যাচ্ছে
যে এসব
দম্পতির আইভিএফ
পদ্ধতির সাহায্য
নিতে হচ্ছে।
আমাদের দেশের
মানুষের মধ্যে
আইভিএফ পদ্ধতি
সম্পর্কে তেমন
ধারণা নেই।
তাছাড়া এটি
নিয়ে প্রচুর
ভুল ধারণাও
প্রচলিত আছে।
যেমন অনেকে
এসে বলে
আমার তো
আসলে ১০
বছর হয়ে
গিয়েছে আমার
বেবি হচ্ছে
না, আমার
দুটি টিউবই
ব্লক, এ
অবস্থায় আমি
কীভাবে মা
হব? তখন
আমরা বলি
দুটি টিউব
ব্লক হলে
স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ
হওয়ার সম্ভাবনা
নেই। এখানে
খেয়াল রাখতে
হবে টিউবের
মধ্যেই কিন্তু
বীর্য আর
ডিম্বাণুর মিলন
ঘটে। যেহেতু
এ পথটি
বন্ধ সেহেতু
আমরা সেখানে
আইভিএফের মাধ্যমে
ডিম ফোটাই।
অনেকে জানতে
চান তাহলে
আইভিএফ পদ্ধতিটা
আসলে কীভাবে
সম্পন্ন হয়?
ডিমের সাইজ
যখন পরিপক্ব
হয়, তখন
সেটাকে সংগ্রহ
করি। একই
সময়ে স্বামীর
বীর্যটাও সংগ্রহ
করি। বীর্য
থেকে খুব
ভালো স্পার্মগুলো
নিই। এই
স্পার্মগুলোকে ল্যাবে
নিয়ে বিভিন্ন
মেডিসিনের মাধ্যমে
এটাকে সংযুক্ত
করা হয়,
এটাকে আরো
ফার্টিলাইজ করে
আস্তে আস্তে
বিভিন্ন সেল
স্টেজে নিয়ে
গিয়ে জরায়ুতে
প্রতিস্থাপনের উপযোগী
করা হয়।
এর পরই
আমরা এটিতে
প্রতিস্থাপন করি।
এত সুন্দরভাবে
একটি কাজ
শেষ করেন
চিকিৎসকরা। অথচ
আমাদের দেশে
এক শ্রেণীর
মানুষের ধারণা
অন্য কারোর
ডিম বা
স্পার্ম দিয়ে
হয়তো টেস্টটিউব
বেবির জন্ম
দেয়া হচ্ছে।
এটি সম্পূর্ণ
ভুল ধারণা।
আমাদের কাছে
যে দম্পতি
আসছেন তাদের
স্পার্ম দিয়েই
কাজটি করা
হচ্ছে। বন্ধ্যাত্ব
সমস্যায় যারা
ভুগছেন, তাদের
যে কী
পরিমাণ মানসিক,
সামাজিক, অর্থনৈতিক
ও পারিবারিক
হেনস্তার শিকার
হতে হয়
বলার অপেক্ষা
রাখে না।
এখান থেকে
উদ্ধার করার
জন্য এই
অ্যাডভান্স টেকনোলজি
আইভিএফ চালু
হয়েছে। যার
মাধ্যমে অনেক
নিঃসন্তান দম্পতি
বাবা-মা
হতে পারছেন।
বিজ্ঞানের কল্যাণ
এটি। আমি
গর্ব করে
বলতে পারে
বাংলাদেশে এখন
যেসব আইভিএফ
সেন্টার হচ্ছে
সেখানে খুবই
উচ্চমানের যন্ত্রপাতি
বসানো হচ্ছে।
এতে ব্যাপক
সাফল্য পাওয়া
যাচ্ছে।
আইভিএফের ক্ষেত্রে
খুব গুরুত্বপূর্ণ
দিক হচ্ছে
স্ত্রীর বয়স।
দেখা যাচ্ছে
যে তারা
এটি নিয়ে
চিন্তা করতে
করতে অনেক
দেরি করে
চিকিৎসকের কাছে
আসছেন। এতে
দেখা যায়
স্ত্রীর বয়স
বেড়ে গিয়েছে।
তার যে
ওভারিয়ান রিজার্ভ
অর্থাৎ প্রতিটি
নারী জন্মের
সময় তার
মায়ের পেট
থেকে কিছু
ভ্রূণ নিয়ে
আসে। সে
সংখ্যাটাই যদি
কমে যায়,
তখন দেখা
যাচ্ছে তার
ক্ষেত্রে আমরা
ভালো ডিম
ফুটাতে পারি
না। তাই
বলতে চাই
যারা আইভিএফ
নিয়ে ভুল
ধারণা পোষণ
করছেন, তাদের
ভ্রান্ত ধারণা
থেকে বের
হয়ে আসতে
হবে। আমার
ধারণা, আগামী
১০ বছর
পর আইভিএফ
নিয়ে মানুষের
মধ্যে নেতিবাচক
ধারণা আর
থাকবে না।
কারণ দিন
দিন এর
সাফল্যের হার
বাড়ছেই।
এনাম
আইভিএফ সেন্টারেও
অত্যাধুনিক ও
সর্বোচ্চ যন্ত্রপাতি
রয়েছে। আমরা
যা কাজ
করছি আমাদের
এমব্রায়োলজিস্ট, ইমিউনোলজিস্ট,
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, ইনফার্টিলিটি
স্পেশালিস্ট ও
গাইনোকোলজিস্টসহ সবাই
মিলে একটা
টিমওয়ার্ক। এটা
ছাড়া এক
কাজ করা
অসম্ভব।
কারণ ভ্রূণ
প্রতিস্থাপনের আগে
এমব্রায়োলজিস্ট প্রয়োজন
হয়। সেটাকে
কালেক্ট করার
জন্য আইভিএফ
স্পেশালিস্টের প্রয়োজন
হয়। অনেক
সময় রোগীদের
হরমোনের সমস্যা
হয়, তার
জন্য ভালো
এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের প্রয়োজন
হয়। আবার
অনেক পুরুষের
ক্ষেত্রে দেখা
যায় তারা
অ্যাজোসফার্মিয়ায় ভুগছেন,
এটা হয়তো
কোনো প্রতিবন্ধকতার
কারণে হচ্ছে
এটি। হয়তো
সে ভ্রূণটা
নিচে আটকে
আছে, সেটাকে
কালেক্ট করে
আনা। একটি
সমন্বিত টিমের
মাধ্যমে এখানে
কাজ হচ্ছে।
এ রকম
বিভিন্ন পদ্ধতিতে
আমাদের এনাম
আইভিএফ সেন্টারের
কাজটি এগিয়ে
নেয়া হচ্ছে।
আমরা আশা
করি এ
সেন্টারের মাধ্যমে
অনেক নিঃসন্তান
দম্পতির মুখে
হাসি ফুটাতে
পারব, যাদের
কোনোভাবেই সন্তান
হয় না।
তাই আইভিএফ
সম্পর্কে ভুল
ধারণা পোষণ
না করে
এর সম্পর্কে
জানুন, আর
সেবা নিন।
আমি আগেও
বলেছি বন্ধ্যাত্ব
সমস্যা শুধু
নারীর নয়,
এটি পুরুষদেরও
হয়ে থাকে।
দেশে বন্ধ্যাত্ব
বেড়ে যাওয়ার
কারণ খুঁজতে
গেলে এর
পেছনের কারণ
বের করতে
হবে। প্রথমত
বিষয় নারীর
বয়স। আজকাল
অনেক নারীই
পড়াশোনা শেষ
করে বা
ক্যারিয়ার শুরু
করে বেশি
বয়সে বিয়ে
করছেন এবং
গর্ভধারণ করছেন।
একটি বিষয়
অনেকেই জানেন
না, ৩০
বছর পার
হয়ে গেলেই
মেয়েদের ওভারি
রিজার্ভ বা
ডিম্বাশয়ের পরিমাণ
কমতে থাকে।
তখন গর্ভধারণ
করেতে গেলে
সমস্যা হয়।
আরেকটি দিক
হলো অনেকে
তরুণ বয়সে
ক্রনিক মেডিকেল
ডিজওয়ার্ডার বা
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যাধিতে
ভোগেন। তার
মধ্যে একটি
হলো হাইপোথাইরয়েডিজম,
ডায়াবেটিস ও
হাইপারটেনশন। আগে
জানতে হবে
কেন এসব
রোগ বেড়ে
গেল। এসব
কারণ খুঁজতে
গিয়ে দেখা
যায়, বর্তমান
সময়ে ব্যাপক
পরিবেশ দূষণ
ও জলবায়ু
পরিবর্তন হচ্ছে,
এগুলো কিন্তু
নারী-পুরুষের
সন্তান জন্ম
দেয়া সিস্টেমের
ওপর প্রভাব
পড়ছে। সেটা
কীভাবে? এখন
কিন্তু আগের
মতো আবহাওয়া
নেই।
সম্প্রতি দেশের
একটি ফার্টিলিটি
সেন্টারের (অপ্রকাশিত)
তথ্য বলছে,
আমাদের খাবারে
ব্যাপক কীটনাশক
ও রাসায়নিক
প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত
কৃত্রিম সার
ব্যবহার করা
হচ্ছে। এসব
কিছু ব্যবহার
করে আমরা
যেসব খাবার
খাচ্ছি যেমন
শাকসবজি থেকে
শুরু করে
মাছ-মাংস
এমনকি বিভিন্ন
ফলের মধ্যে
এটির ব্যবহার
হচ্ছে। আপনি
দেখবেন আজকাল
বিভিন্ন ফল
ফ্রিজে না
রাখলেও বাইরে
এক মাস
রেখে দিলেও
তাজা থাকছে।
এসব খাবার
কিন্তু মানুষের
যৌন সক্ষমতা
কমিয়ে দিতে
পারে, এমন
একটি গবেষণা
চলছে।
আমি কয়েকদিন
আগে সিঙ্গাপুরে
একটা ইনফার্টিলিটি
কনফারেন্সে গিয়েছিলাম।
সেখানে ওমানের
একজন চিকিৎসক,
তার গবেষণায়
বলেছেন, যেসব
পুরুষ অনেকক্ষণ
ধরে আইটি
রিলেটেড কাজ
করছে, তাদের
ক্ষেত্রে দেখা
যায় বীর্যে
সমস্যা দেখা
দেয়। এসব
পুরুষ অনেকক্ষণ
ধরে আইটির
সামনে থাকছে,
সেখানে তারা
খুব চাপ
নিয়ে কাজ
করছে, প্রতিদিন
এ চাপের
কারণে তারা
অ্যান্টি আলসারেন্ট
বা গ্যাসের
ওষুধ খাচ্ছে।
ওই চিকিৎসক
আরো জানালেন,
যেসব পুরুষের
বীর্যের গতি
কম, বীর্যের
মান ভালো
না, শুক্রাণুর
আকৃতি অস্বাভাবিক,
বীর্যের সংখ্যা
কম, তাদের
বেশির ভাগই
আইটি রিলেটেড
কাজ করে
থাকে। অর্থাৎ
ওমানে চিকিৎসক
জানালেন, যেসব
পুরুষ বেশি
চাপ বা
আইটি নিয়ে
কাজ করে
থাকেন তাদেরই
সিমেনে সমস্যা
পাওয়া যাচ্ছে।
সবচেয়ে অবাক
করা বিষয়
হচ্ছে, বন্ধ্যাত্ব
সমস্যায় ভুগছে
এমন ৬০
ভাগ পুরুষ।
দম্পতিরা আসছেন,
দেখা যায়
পুরুষদের সমস্যা।
অথচ স্ত্রীরা
বলছেন সে
তো ভালো
স্বাস্থ্যের অধিকারী
তার এ
সমস্যা হতে
পারে না।
কিন্তু তার
দেখা যায়
সিমেন কোয়ালিটি
অস্বাভাবিক। এটা
আসলে ডায়াগনোসিসে
আসতে হবে।
এটা কিন্তু
পুরুষের কোনো
দোষ বা
সমস্যার জন্য
না। এটা
শুধু তার
লাইফস্টাইল, চাপ
নিয়ে কাজ
করা অথবা
যৌন উত্তেজক
ওষুধ ব্যবহারের
কারণে হতে
পারে। এসব
কিছু পরিহার
করা সম্ভব।
পাশাপাশি মেয়েরা
যেন সঠিক
সময়ে বিয়ে
করে, ৩০
পার হওয়ার
আগেই যেন
সন্তান জন্ম
দিয়ে ফেলে।
এসব বিষয়
মেনে না
চললে দেখা
যাবে গর্ভধারণ
করতে যেমন
সমস্যা তৈরি
হবে আবার
গর্ভধারণের পরেও
বিভিন্ন সমস্যা
দেখা দিতে
পারে।
কাজেই আমরা
যেন এ
ব্যাপারগুলো প্রতিরোধ
করতে পারি।
আমাদের প্রতিদিন
শারীরিক ব্যয়াম,
আদর্শ শরীর
থাকা, অল্প
থাকতেই মেয়েদের
বিয়ে দেয়া।
ছেলেদের ক্ষেত্রে
অতিরিক্ত ধূমপান,
মদ্যপান বা
চাপযুক্ত কাজের
অভ্যস্ততা পরিহারসহ
পরিবেশ দূষণ
থেকে মুক্ত
থাকতে পারলে
হয়তো আইভিএফ
পদ্ধতি বা
বন্ধ্যাত্বে ঝুঁকি
থেকে রক্ষা
পাওয়া সম্ভব
হবে।
ডা. সুমাইয়া বারী সুমি: সহযোগী অধ্যাপক, স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল





