তপন কান্তি ঘোষ
সিনিয়র সচিব
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
রফতানি ৫০ বিলিয়ন ডলারের নয়, সেবা খাতসহ ওটা ৬০ বিলিয়ন ডলারের। আমাদের পণ্য খাতের রফতানি হয়েছে ৫২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে জুন পর্যন্ত গড়ে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন হয়েছে। সুতরাং ৬০ বিলিয়নের বেশি।
কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছিল, ২০২১ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার রফতানি হবে এবং তার মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার আসবে গার্মেন্টস থেকে। ২০১৭ সালেই এ লক্ষ্যের বিষয়ে বলা হয়েছিল। কভিডের কারণে আমরা দুই বছর পিছিয়ে গিয়েছিলাম। ২০২২ সালে এসে ৬০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করল বাংলাদেশের রফতানি। এটা একটা বিশাল ঘটনা। তার মধ্যে ৪২ বিলিয়ন আসছে গার্মেন্টস থেকে। বাকিগুলো আসছে সেবাসহ অন্যান্য খাত থেকে। এ গতি অব্যাহত রেখে আমরা আশাবাদী যে ২০২৪ সালে ৮০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।
আরো চার খাতে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি হয়েছে। বিশেষ করে হোম টেক্সটাইলে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন। চামড়াজাত পণ্যও রয়েছে। আরো আছে এগ্রো প্রসেসিং। এই সবগুলোকে যদি আমরা অন্তত ৫ বিলিয়নে নিয়ে যেতে পারি, সেক্ষেত্রে আমাদের ভালো সম্ভাবনা আছে। আমরা একটা এক্সপোর্ট পাওয়ার হাউজ হিসেবে এ অঞ্চলে গণ্য হতে পারব।
গত ৫০ বছরের অগ্রযাত্রায় সরকারের অব্যাহত সহযোগিতা তো আছেই। তার সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা শ্রেণীর কথা বলতেই হবে। আমাদের রফতানির বেশির ভাগই বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের অবদান। এখানে বিদেশী উদ্যোক্তাদের অবদান খুবই কম। এছাড়া আমাদের দেশীয় শ্রমিক শ্রেণী কাজ করে, অনেকে অতিরিক্ত সময় কাজ করে। সুতরাং বলা যায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের পলিসি, উদ্যোক্তা শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর মিলিত ফল।
গত ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশ রফতানির ক্ষেত্রে যে সক্ষম দেশ, সে বিষয়ে ক্রেতাদের আস্থা আমাদের প্রতি বেড়েছে। বিশেষ করে রানা প্লাজার পরে দ্রুত আমাদের এ খাতকে সংস্কার করতে সক্ষম হয়েছি, ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। এ বছরে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রথমবারের মতো আমেরিকায়ও রফতানি ১০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। একক দেশ হিসেবে ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি, এটা একটা বড় অর্জন। সুতরাং এ আস্থা ক্রেতাদের সবার মধ্যে আছে যে ‘বাংলাদেশ ক্যান সাপ্লাই দেয়ার, হোয়াট দে ওয়ান্ট’। আর সরকারের সহায়তা, উদ্যোক্তা শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর সহায়তা তো আছেই।
আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে মার্কেট অ্যাকসেস বা বাজার প্রবেশাধিকার তো অবশ্যই আমাদের সহায়তা করেছে। কারণ আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউকেসহ যদি ধরি তাহলে প্রায় ৬০ শতাংশ রফতানি গন্তব্য। এখানে আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম এসব দেশ। পাকিস্তান জিএসপি প্লাস পায়, বাকি দুই দেশের সঙ্গে কিন্তু প্রায় ১০ শতাংশ ডিউটি বেনিফিট পায়। এটি আমাদের অনেক বেনিফিট দিয়েছে। ২০১১ সালের পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন সিঙ্গেল ট্রান্সফরমেশন করল, রুলস অব অরিজিনটা শিথিল করল, তারপরে ১০ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের রফতানি তিন গুণ হয়ে যায়। ১০ বছরে তিন গুণ হয়ে যাওয়াটা অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে। এক্ষেত্রে মার্কেট অ্যাকসেস অবশ্যই আমাদের সহযোগিতা করেছে। তবে এর বাইরেও দেখা গেছে যেমন আমেরিকায় আমরা মার্কেট অ্যাকসেস না পেয়েও ভালো করছি। কিন্তু আরো ভালো করতে পারতাম। ওখানে মার্কেট অ্যাকসেস থাকলে আমরা আরো রফতানি করতে পারতাম।
রফতানি ৮০ বিলিয়ন ডলার, এরপর ১০০, ২০০। এ অগ্রযাত্রায় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে এমন না, বরং চ্যালেঞ্জ এখনই আছে। কেননা আমরা অন্য সেক্টরগুলোতে ভালো করতে পারছি না। এটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। হাইএন্ড প্রডাক্ট করতে গেলে যে ধরনের দক্ষ শ্রমিক লাগে, সেই জায়গাগুলোতে আমাদের ঘাটতি আছে। সেটা পূরণ করতে হবে।
আর একটা হচ্ছে গার্মেন্টসের বাইরে খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য গেলে তখন কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড এবং সার্টিফিকেশন এ জায়গাগুলোতে কাজ করতে হবে। তবে আমাদের সার্টিফিকেশন বা ন্যাশনাল লেভেলের অর্গানাইজেশন অত এক্রিডিটেড হয়নি বা বিশ্বের স্বীকৃতি কম আছে। ওটার জন্য মিউচুয়াল রিকগনিশন এগ্রিমেন্ট করতে হয়। সেগুলো ইদানীং কিছু কিছু আলোচনা হচ্ছে। যেমন ভারতের সঙ্গে কিছু কিছু হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কিন্তু হয়নি। সনদের দ্বিপক্ষীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা থাকলে আমার দেশের সার্টিফিকেট ওরা অ্যাকসেপ্ট করে, তাহলে এক্সপোর্ট সহজ হয়। এ কাজগুলো করতে হবে।
যদি বিদেশী বিনিয়োগ আনা যায় তাহলে সুবিধা হয়। কারণ ওই বিনিয়োগকারীদের মার্কেটে অ্যাকসেস বা তাদের বাজার সুবিধা সম্পর্কে ধারণা থাকে। তারা নতুন টেকনোলজি আনতে পারে। যদি আমরা বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারি, তাহলে আমাদের টেকনোলজির ঘাটতিও মিটতে পারে। নতুন টেকনোলজি আনলে প্রডাক্টিভিটি বাড়বে। সেক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দিকে জোর দিতে হবে।
এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের (এলডিসি গ্রাজুয়েশনের) প্রেক্ষাপটে আমাদের আরো কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মার্কেট অ্যাকসেস যদি কোনো কোনো দেশে চলেও যায়, সেখানে আমরা কীভাবে প্রতিযোগী সক্ষম হব, প্রস্তুতি থাকলে সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এখন আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অন্যান্য ধরনের চুক্তিতে যেতে হবে।





