মোটরসাইকেলের বড় একটি বাজার রয়েছে বাংলাদেশে। জাপান, ভারত, চীন, অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের নামি কিছু ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের দেখা মেলে দেশের রাস্তায়। অতীতে ইয়ামাহা বা হোন্ডার সিডিআই, আর-এক্সের প্রতি মানুষের যে ঝোঁক ছিল, দিন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তা পাল্টে গিয়েছে আর-ওয়ানফাইভ, জিএসএক্স বা সিবিআরের মতো স্পোর্টস বাইকের দিকে। নামি ব্র্যান্ডের এসব দামি বাইক কেনা অনেক সময় সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে না। তবে সম্ভব না তাও নয়। সাধ্যের মধ্যেই বিভিন্ন মডেলের পাশাপাশি স্পোর্টস ঘরানার বাইক কেনার সুযোগ করে দিয়েছে হিরো, টিভিএস ও বাজাজের মতো ভারতীয় কোম্পানিগুলো। এ দৌড়ে অবশ্য এগিয়ে আছে টিভিএস অ্যান্ড সন্স। 

টিভিএস: টিভিএস দিয়েই না-হয় শুরু করা যাক। ১২ বছর ধরে বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা করছে ভারতীয় এ কোম্পানি। মোটরসাইকেল বিক্রির দিক থেকেও দ্বিতীয়। রয়েছে অ্যাপাচি ফোর-ভি, অ্যাপাচি টু-ভি, রেইডার, এন-টর্ক, স্ট্রাইকার, ম্যাক্স এসটি, রক্স, রেডেঅন ও মেট্রো প্লাস মডেলের মোটরসাইকেল। সর্বোচ্চ ১৬০ সিসি থেকে শুরু করে ১১০ সিসি মোটরসাইকেল দেশে বাজারজাত করে কোম্পানিটি। মিরপুর ও গাজীপুরে রয়েছে তাদের বিশাল প্লান্ট। দেশের বাজারে টিভিএসের মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছে রিয়ান মোটরস। এ কোম্পানির বিভিন্ন বাইক বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৯৯ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৭৪ হাজার ৯৯৯ টাকায়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে টিভিএস অ্যাপাচি ফোর-ভি ও টু-ভি বাইক দুটি। এছাড়া টিভিএস এন-টর্ক স্কুটিও বেশ গ্রাহকপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্য মডেলগুলোও রয়েছে ক্রেতাদের পছন্দের কাতারে। রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ও অ্যান্টি ব্রেকিং সিস্টেম (এবিএস)।

টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (মার্কেটিং) মো. মারুফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে মডেলভেদে টিভিএসের বাইকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় রয়েছে। তবে রেইডার, এন-টর্ক ও এক্সএল হান্ড্রেড মডেলের ক্ষেত্রে এ ছাড় প্রযোজ্য হবে না। তিনটি বাইকের ক্ষেত্রে উপহার হিসেবে দেয়া হচ্ছে ইউনব্রেকার। এছাড়া দেশজুড়ে রয়েছে ২৫০টি ডিলার পয়েন্ট। প্রত্যেকটি ডিলার পয়েন্টকে থ্রি এস (সেলস, সার্ভিস, স্পেয়ার পার্টস) বলা হয়। কারণ সেখানে গ্রাহক সব ধরনের সেবা পেয়ে থাকেন। এছাড়া আমাদের রয়েছে এক হাজার সিএসপি (সার্টিফায়েড সার্ভিস পয়েন্ট)। গ্রামগঞ্জের মেকারদের টিভিএস বাইকের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে একদম গ্রামীণ এলাকায়ও টিভিএস বাইকের ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পেয়ে যাবেন।

বাজাজ: ভারতীয় আরেক কোম্পানি বাজাজ অটো এ দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সরাসরি বলা চলে, বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের বাজারে সবচেয়ে বেশি হিস্যা ব্র্যান্ডটির। ১৯৮৫ সাল থেকে বেশ কয়েকটি মডেলের মোটরসাইকেল বাংলাদেশের রাস্তায় নামিয়েছে কোম্পানিটি, যার মধ্যে অন্যতম পালসার। বর্তমান বাজারে পালসারের ১৬৫ সিসি স্পোর্টস বাইক তরুণদের বেশ পছন্দের। এছাড়া ব্র্যান্ডটির অন্যতম মডেলগুলো হলো বাজাজ অ্যাভেঞ্জার, ডিসকভার, সিটি ১০০, পালসার নিওন ও অন্যান্য। ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে বাজাজ পালসার ১৬৫ ও অ্যাভেঞ্জার। বাজাজের ডিলার পয়েন্ট এসকে ট্রেডার্সে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ থেকে সর্বনিম্ন ৯৭ হাজার ৫০০ টাকায় ১১টি মডেলের মোটরসাইকেল বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

হিরো: হিরো মোটোকর্পের হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলও জনপ্রিয়তার কাতারে রয়েছে বাংলাদেশে। হিরোর রয়েছে হাঙ্ক, থ্রিলার, অ্যাচিভার, ইগনিটো, গ্ল্যামার, প্যাসন, স্প্লেন্ডারের মতো জনপ্রিয় মডেলের বাইক। এছাড়া প্লেজার, ম্যাস্টেরিওর মতো জনপ্রিয় স্কুটিও বাজারজাত করে প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনেও এগিয়ে থাকা হিরোর এ দেশের বাজারে রয়েছে মোট ১৬টি মডেলের বাইক। বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, মডেলভেদে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯৩ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ৮৭ হাজার ৫০০ টাকায় মোটরসাইকেল বিক্রি করে হিরো। নতুন করে এবিএস নিয়ে এসেছে হিরো। উন্নত প্রযুক্তিও দিচ্ছে।

হোন্ডা: মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি প্লান্ট আছে জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশনের। দেশে বিক্রি হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি, ব্রেকিং সিস্টেমের হোন্ডার বাইক, স্কুটিসহ মোট ১৩টি মডেল। চাহিদার শীর্ষে বর্তমানে রয়েছে হোন্ডার হরনেট, এক্সব্লেড, সিবি শাইন, সিবি ট্রিগার, হোন্ডা ডিওর মতো স্কুটি। তবে তরুণদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে হোন্ডা সিবিআরের মডেল ও এক্স-মোশন। বাংলাদেশের বাজারে হাইপারফরম্যান্স দেয়া এসব মডেলের বাইক বিক্রি হয় সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ লাখ টাকায়, সর্বনিম্ন দাম সাড়ে ৪ লাখ টাকা। অন্য মডেলগুলো বিক্রি হয় আড়াই লাখ থেকে সর্বনিম্ন ৯১ হাজার ৫০০ টাকায়।

ইয়ামাহা: জাপানের আরেকটি সুপরিচিত ব্র্যান্ড ইয়ামাহা। বাংলাদেশে ব্র্যান্ডটি নিয়ে এসেছে এসিআই মোটরস। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে আছে ইয়ামাহার শোরুম। সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ১ লাখ ২৯ হাজার টাকায় ইয়ামাহার উন্নত প্রযুক্তি ও ব্রেকিং সিস্টেমের বাইক কিনতে পাওয়া যায়। প্রিমিয়াম, স্পোর্টস ও ক্রুজার ইয়ামাহা বাইক বিক্রি হয় দেশের বাজারে। রয়েছে সাড়ে ৫ লাখ মূল্যের স্কুটিও। গ্রাহক জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দুয়েই এগিয়ে আছে জাপানের এ ব্র্যান্ড। ভারতীয়, ইন্দোনেশীয়, থাইল্যান্ডের বিভিন্ন মডেলের বাইক ভিন্ন ভিন্ন দামেও বিক্রি হয়।

সুজুকি: জাপানের আরেকটি ব্র্যান্ডের বড় বাজার আছে দেশে, যার নাম সুজুকি। র্যানকন মোটরবাইক লিমিটেড দেশে সুজুকির একমাত্র পরিবেশক। তবে গ্রে মার্কেটেও সুজুকির বাইক বিক্রি হয়। ১২টি মডেলের উন্নত প্রযুক্তি ও ব্রেকিং সিস্টেমের বাইক বিক্রি হয় দেশে, নাম সুজুকি জিএসএক্স, জিক্সার, হায়াতে, ইন্ট্রুডার, জিক্সার এসএফ, ব্যান্ডিট। স্কুটিও বিক্রি করে সুজুকি। দেশের বাজারে কোম্পানিটির স্কুটির সর্বোচ্চ মূল্য আড়াই লাখ টাকা। স্পোর্টস সেগমেন্টে ৩ লাখ ৮০ থেকে শুরু করে ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় বাইক বিক্রি করে সুজুকি। কমিউটার সেগমেন্টে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় সুজুকির বাইক পাওয়া যায়।

রানার: জাপান-ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও মোটরসাইকেল তৈরি হয়, যার পৃষ্ঠপোষক রানার। ২০০০ সালে মূলত দেশের বাজারে রানারের যাত্রা শুরু। মোট ১৪টি মডেলের মোটরসাইকেল তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এলএমএল ফ্রিডম, রানার বাইক আরটি, বোল্ট, কাইট, নাইট রাইডার, বুলেট, টার্বো, রয়্যালসহ বিভিন্ন মডেলের বাইক গ্রাহকপ্রিয়তা পেয়েছে। সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হয় রানারের রেনেগেড স্পোর্ট বাইক। কোম্পানির সর্বনিম্ন বাইকের মূল্য মাত্র ৫৫ হাজার।

চায়না ব্র্যান্ড: চায়না বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বাইক রয়েছে দেশে। কিওয়ে, লিফান কেপিআর, জনটেস, জারাসহ নানা নামে, নানা মডেলে ভিন্ন ভিন্ন দামে পাওয়া যায় এসব বাইক। সর্বোচ্চ ৩ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় এসব বাইক। এছাড়া চায়না অ্যাসেম্বলড দামি বাইকও বিক্রি হয় দেশের বাজারে। ট্যারো জিপি, বেনেলি, রোড মাস্টার র্যাপিডোসহ নানা নামে অ্যাসেম্বলড বাইক বিক্রি হয় সাড়ে ৩ লাখ থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে। দেশে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাইকেরও দেখা মেলে, যদিও তা সর্বসাধারণের জন্য নয়।