দারিদ্র্যবান্ধব
অর্থনীতি বাংলাদেশের
জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। একটি
রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাসংগ্রামের
মাধ্যমে ১৯৭১
সালে বাংলাদেশ
স্বাধীন ও
সার্বভৌম রাষ্ট্র
হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করে। দীর্ঘদিন
ধরে ঔপনিবেশিক
শাসনে নিষ্পেষিত
ও স্বাধীনতাযুদ্ধে
ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে
তখন একটি
‘ভিক্ষার
ঝুড়ি’ হিসেবে
গণ্য করা
হতো। গত
প্রায় পাঁচ
দশকে বাংলাদেশে
অর্থনীতির ক্ষেত্রে
বিশেষ সাফল্য
অর্জিত হয়েছে।
এ সাফল্য
জাতীয় আয়ের
প্রবৃদ্ধিতে যেমন
প্রতিফলিত, তেমনি
দারিদ্র্য নিরসনে
এর প্রভাব
সুস্পষ্ট। দেখা
যাচ্ছে যে
প্রবৃদ্ধির হারের
ত্বরণ দারিদ্র্যের
হার হ্রাসে
ব্যাপকভাবে সহায়ক
হয়েছে। যদিও
এ ব্যবস্থা
কতটুকু টেকসই
হবে, সে
সম্পর্কে এখনো
সন্দেহ রয়েছে।
এক
হিসাবে দেখা
যায়, সার্বিক
দারিদ্র্য প্রকোপ
২০১৫ সালের
২৫ শতাংশ
থেকে বর্তমানে
২০ শতাংশের
কাছাকাছি পৌঁছেছে।
একই সময়ে
চরম দারিদ্র্য
কমে এসেছে
১৩ থেকে
৯ শতাংশে।
সরকারের লক্ষ্য
২০৩০ সালের
মধ্যে চরম
দারিদ্র্যের সম্পূূর্ণ
অবসান ঘটানো
এবং ২০৪১
সালের মধ্যে
মাঝারি দারিদ্র্য
৫ শতাংশের
নিচে নামিয়ে
আনা। তবে
এ কৃতিত্ব
ও সরকারি
অভিলাষ সত্ত্বেও
দুটো বিষয়
অবশ্যই স্বীকার
করতে হয়।
এক. এখনো
এ দেশের
দুই কোটি
মানুষ প্রতিনিয়ত
দারিদ্র্যের সঙ্গে
লড়াই করছে
এবং দুই.
সময়ের বিবর্তনে
দারিদ্র্য বিমোচনের
হার কমে
আসছে। অর্থাৎ
যে গতিতে
গত দশকে
দারিদ্র্যের প্রকোপ
কমেছে, ইদানীং
সেই গতি
কিছুটা শ্নথ
হয়ে আসছে
বলে প্রতীয়মান।
গবেষকরা
বাংলাদেশে দারিদ্র্য
নিরসনে সাফল্যের
কারণ হিসেবে
কিছু উপাদানের
ওপরে জোর
দেন। সেগুলো
হলো ১.
বৃহৎ অর্থনৈতিক
নীতিমালার সাফল্য,
২. বিশ্বায়নের
ফলে উন্মুক্ত
নীতিমালা অনুসরণ,
৩. দারিদ্র্যবান্ধব
প্রকল্পে অর্থ
বিনিয়োগ, ৪.
গ্রামীণ অবকাঠামো
খাতে অর্থ
বিনিয়োগ, ৫.
বনিয়াদি শিক্ষা,
৬. প্রাথমিক
ও প্রতিরোধমূলক
স্বাস্থ্যসেবা, ৭.
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
মোকাবেলায় সাফল্য,
৮. সবুজ
বিপ্লব, ৯.
কৃষি উপকরণ
বিতরণে দারিদ্র্যবান্ধব
সংস্কার, ১০.
গ্রামীণ শ্রমবাজারে
পরিবর্তন ও
১১. পোশাক
শিল্পে কর্মসংস্থান
বৃদ্ধি।
সন্দেহ
নেই, দারিদ্র্য
বিমোচনে সরকারের
শূন্য দশকের
গোড়ার দিকে
গৃহীত পিআরএসপি
কৌশলপত্র ও
এর আলোকে
নেয়া কর্মসূচি
ব্যাপক অবদান
রেখেছে। তার
পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ
ও সম্পদ
হস্তান্তরের মাধ্যমে
দারিদ্র্য হ্রাসে
এনজিওগুলোর ভূমিকাও
কম নয়।
জীবিকা অর্জনে
বাজারমুখী নানাবিধ
দক্ষতা প্রশিক্ষণ,
আয়মূলক কর্মকাণ্ড
সৃজন ও
ক্ষুদ্রঋণসহ বিভিন্ন
সহযোগিতার মাধ্যমে
বেসরকারি উন্নয়ন
সংস্থাগুলো দারিদ্র্য
নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখে
আসছে বাংলাদেশের
জন্মলগ্ন থেকে।
তবে ক্ষুদ্রঋণ
এবং জীবিকা
উন্নয়নে মূলধারার
কর্মকাণ্ড যে
চরম দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর উপকার
করতে পারছে
না, তা
সংশ্নিষ্টদের বুঝতে
খুব একটা
দেরি হয়নি।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর
মধ্যে এ
সমস্যা সমাধানে
সম্ভবত প্রথম
এগিয়ে আসা
প্রতিষ্ঠান ছিল
ব্র্যাকসহ বড়
কিছু এনজিও।
তারা বিশেষ
অবদান রেখেছে
বলা বলে।
টেকসইভাবে চরম
দারিদ্র্য বিমোচনে
তাদের মডেল
আজ বিশ্বজুড়ে
প্রশংসিত।
রাষ্ট্রীয়
কর্মসূচিগুলোর মধ্যে
দারিদ্র্য বিমোচনে
সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচির ভূমিকা
উল্লেখযোগ্য। ‘সামাজিক
নিরাপত্তা’ নতুন
কোনো
আবিষ্কার নয়।
উন্নত বিশ্বে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
পর থেকে
সামাজিক নিরাপত্তার
রীতিনীতি ও
কার্যক্রমগুলো গড়ে
ওঠে। আমাদের
দেশে এমডিজি-পরবর্তী
সময়কে সামাজিক
নিরাপত্তা কার্যক্রমের
শুরুর কাল
হিসেবে ধরে
নেয়া যেতে
পারে। এখন
এর পরিধি
বেড়েছে। টেকসই
দারিদ্র্য বিমোচন
ও মধ্যম
আয়ের চৌকাঠে
পা রাখার
সময়কাল থেকে
‘কল্যাণরাষ্ট্র’
হয়ে ওঠার
প্রবল ইচ্ছার
বহিঃপ্রকাশ হবে
সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচির পরিসর
বৃদ্ধির যুক্তিসংগত
কারণ। তবে
এ খাতে
অনিয়ম দূর
করা গেলে
দারিদ্র্য বিমোচনে
এর কার্যকারিতা
আরো বাড়ানো
যাবে বৈকি।
আগেই
উল্লেখ করেছি,
বিদ্যমান ব্যবস্থার
স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে
সংশয় থেকে
যায়। দারিদ্র্য
পরিস্থিতির উন্নতি
ঘটাতে সমর্থ
হলেও এ
ব্যবস্থায় কিছু
চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
দেশে প্রবৃদ্ধি,
দারিদ্র্য নিরসন
ও আয়বৈষম্যের
মধ্যে আপাতবিরোধী
প্রবণতা দেখা
যাচ্ছে। তথ্য
বলছে, ১৯৮৩-৮৪
থেকে ২০১৬
সময়কালে মাথা
গণনাভিত্তিক দারিদ্র্যের
হার ৬২.৬
থেকে ২৪.৩
শতাংশে নেমে
এসেছে। অথচ
বৈষম্যের হার
জিনি সহগের
ভিত্তিতে ০.৩৬
থেকে ০.৪৮৩-এ
উঠে এসেছে।
জিনিসূচক থেকে
এ কথা
স্পষ্ট যে
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক
অসাম্য বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, বেকার
সমস্যা। কিন্তু
এ বেকার
সমস্যা সম্পর্কে
আমাদের জ্ঞান
খুবই সীমাবদ্ধ।
এর কারণ
হলো বেকারের
সংখ্যা নিরূপণের
জন্য উচ্চ
আয়ের দেশগুলোয়
যে পদ্ধতি
ব্যবহার করা
হয়, বাংলাদেশে
একই পদ্ধতি
অনুসরণ করা
হয়ে থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশের
সামাজিক পরিবেশ
উন্নত দেশগুলোর
পরিবেশের চেয়ে
সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কাজেই উন্নত
দেশগুলোকে যাকে
বেকারত্ব বলা
হয়, বাংলাদেশের
বেকারত্ব সেই
সংজ্ঞার দ্বারা
সঠিকভাবে চিহ্নিত
করা যাবে
না।
শ্রমবাজারে
বেকারত্ব নির্ণয়
করতে সাধারণভাবে
আন্তর্জাতিক শ্রম
সংস্থার নির্ধারিত
পদ্ধতি ব্যবহার
করা হয়।
এ পদ্ধতিতে
প্রথমে পরিবারভিত্তিক
জরিপে ১৫
বছরের ঊর্ধ্বের
জনসংখ্যাকে নির্দিষ্ট
করা হয়।
এ জনগোষ্ঠীর
যারা অর্থনৈতিক
পণ্য অথবা
সেবা উৎপাদনে
নিয়োজিত, তাদের
অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়
জনসংখ্যা গণ্য
করা হয়।
এ শ্রেণী
থেকে গৃহকর্মী,
বৃদ্ধ, কাজ
করতে অক্ষম
এবং যারা
পূর্ণকালীন ছাত্র,
তাদের বাদ
দেয়া হয়।
কর্মরত বা
কর্মসংস্থানে যারা
নিয়োজিত, তারা
যদি আগের
সপ্তাহে এক
ঘণ্টাও কাজ
করে থাকে,
তাহলে তাকে
কর্মরত বলে
গণ্য করা
হয়। আগের
দুই সপ্তাহে
যদি কেউ
অসুস্থতা বা
অন্য কোনো
কারণে সাময়িকভাবে
তার কাজে
উপস্থিত না
হয়ে থাকে,
তাহলেও তাকে
কাজে নিয়োজিত
বলে গণ্য
করা হবে।
অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়
জনসংখ্যার কেউ
যদি আগের
সপ্তাহে এক
ঘণ্টাও কাজ
না করে,
তাহলে তাকে
বেকার গণ্য
করা হবে।
তবে এ
ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে
কর্মসংস্থানের জন্য
উদ্যোগ নিতে
হবে এবং
তাকে সক্রিয়ভাবে
চাকরির খোঁজ
করতে হবে।
উন্নত দেশগুলোয়
বেকারদের জন্য
বেকার ভাতা
চালু রয়েছে।
সুতরাং কাজ
না করেও
একজন ব্যক্তির
পক্ষে কর্মরত
ব্যক্তিদের মতো
জীবনধারণ করা
সম্ভব। কিন্তু
বাংলাদেশের মতো
দেশে বেকারদের
জন্য বেকার
ভাতা নেই।
কাজেই জীবন
ধারণের জন্য
সবাইকে কোনো
না কোনো
কাজে অংশগ্রহণ
করতে হয়।
এজন্য বাংলাদেশে
সপ্তাহে এক
ঘণ্টাও কাজ
করেনি, এ
রকম ব্যক্তির
সংখ্যা কম।
সুতরাং পদ্ধতির
ত্রুটির ফলে
বাংলাদেশের বেকারত্বের
হার সম্পর্কে
যেসব উপাত্ত
পাওয়া যায়,
তা
বেশ বিভ্রান্তিকর।
বাংলাদেশের মূল
সমস্যা বেকারত্বের
নয়, মূল
সমস্যা হলো
প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের।
এ অবস্থায়
দারিদ্র্য দূরীকরণসংক্রান্ত
নীতির সঙ্গে
বৈষম্য ও
বেকারত্ব সমস্যা
নিরসনের নীতির
যুগপৎ সম্মিলন
ঘটাতে হবে।
এর বিকল্প
নেই।
শুধু
নীতি-কৌশলগত
সমন্বয় নয়,
দারিদ্র্য ডিসকোর্সের
পরিধি বাড়ানোও
প্রয়োজন। দারিদ্র্য
ডিসকোর্সে শিশুর
প্রসঙ্গ এযাবত্কাল
আলাদা করে
গুরুত্ব পায়নি।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার
প্রায় ২০
শতাংশ হচ্ছে
০-১০
বছর বয়সী
শিশু। এদের
একটা উল্লেখযোগ্য
অংশ খর্বকায়,
কম ওজনের
ও অপুষ্টির
শিকার। সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে
শিশুদের পুষ্টিসংক্রান্ত
উন্নতি লক্ষ
করা গেলেও
বিগত কয়েক
বছর ধরে
পরিস্থিতি অনেকটাই
অপরিবর্তনীয়। শিশুদের
মধ্যে অনুপুষ্টি
ঘাটতির হার
প্রকট। বিশেষত
ভিটামিন এ,
আয়রন, আয়োডিন
এবং জিংকস্বল্পতা
বেশি পরিমাণে
লক্ষ করা
যায়। অন্যদিকে,
শিশুর মায়ের
শরীরে পুষ্টিস্বল্পতা
শিশুর পুষ্টিতে
অবধারিত প্রভাব
ফেলে। বাংলাদেশে
মায়েদের পুষ্টিজনিত
অবস্থা যে
সন্তোষজনক নয়,
তা বলাই
বাহুল্য। পুষ্টির
ঘাটতি যেমন
দারিদ্র্যের কারণ,
তেমনি এর
পরিণতিও। পুষ্টির
অভাবে শিশুর
শিক্ষা ও
দক্ষতা উন্নয়ন
বাধাগ্রস্ত হয়ে
ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতায়
বিরূপ প্রভাব
ফেলে। শরীরে
শক্তির অভাবের
দাম পরবর্তী
সময়ে দিতে
হয়। সেই
বিবেচনায় পুষ্টি-দারিদ্র্য
বিদ্যমান ডিসকোর্সে
নতুন মাত্রায়
আবির্ভূত হয়েছে।
পুষ্টি-দারিদ্র্যের
ব্যাখ্যাটা মোটামুটি
এ রকম:
কম পুষ্টি
মানে উৎপাদনশীলতা
কম, যা
মজুরি হ্রাসের
মাধ্যমে আয়
নিম্নমুখী রেখে
দারিদ্র্য উসকে
দেয়। বাংলাদেশে
যে হারে
মাথাপিছু আয়
বাড়ছে, ঠিক
সেই হারে
পুষ্টি গ্রহণ
বাড়ছে না।
মনে
রাখতে হবে,
দারিদ্র্য বিমোচন
শুধু অর্থসহায়তা
কিংবা দয়াদাক্ষিণ্য
দিয়ে হয়
না। হয়
না শুধু
সরকার কিংবা
এনজিওর মাধ্যমে।
পুরো প্রক্রিয়ায়
সমাজ ও
পরিবারের ব্যাপক
ভূমিকা বিবেচ্য
বিষয় হওয়ার
দাবি রাখে।
এদের সম্পৃক্ততায়
সৃষ্টি হয়
‘সামাজিক
পুঁজি’, যা
দারিদ্র্য নিরসনে
ভৌত কিংবা
আর্থিক পুঁজির
চেয়ে কম
শক্তিশালী নয়।
সরকার যদি
দারিদ্র্য বিমোচনের
মূল শক্তি
হয়, তাহলে
এনজিও, সমাজ
ও পরিবার
সহশক্তির ভূমিকায়
থাকছে। কম
বা বেশি,
সবার গুরুত্ব
উপলব্ধি করা
জরুরি। কভিডের
অভিঘাত দারিদ্র্য
বিমোচনে নতুন
চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি
করেছে। সময়োপযোগী
নীতির সমন্বয়ে
একযোগে দারিদ্র্যের
বিরুদ্ধে লড়াইয়ে
শামিল হতে সবার
সম্পৃক্তিই আমাদের
এখনকার প্রাধিকার
হওয়া চাই।
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক





