ভাষাসংগ্রামী ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (১৯৩৪-২০২১) বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের আলোকচিত্রকর। তার তোলা ছবি আমাদের জাতীয় জীবনে ঐতিহাসিক দলিল। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে।
রফিকুল ইসলামের জন্ম জামালপুর শহরে। পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর। পিতা রেলওয়ে হাসপাতালের ডাক্তার। পিতার চাকরি সূত্রে ‘৪৩ সাল থেকে ঢাকায় বসবাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের পেছনে রমনা রেলওয়ে কোয়ার্টার্সে থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তার কৈশোর আর যৌবনের উজ্জ্বল দিনগুলো কাটে।
১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের চরম পর্যায়। তখন ঢাকা ছিল দারুণ উত্তপ্ত। প্রকৃতি প্রস্তুত পলাশ ফোটার দিনের অপেক্ষায়। বাংলার লোককবি শামসুদ্দিন আহমেদ গান গাইলেন—‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি ঢাকার শহর রক্তে রাঙায়লি’। কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচনা করেন—‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখলেন—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ আব্দুল লতিফ সুরে সুরে দেশবাসীকে জানিয়ে দিলেন—‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। প্রভাতফেরির জন্য প্রথম গান রচনা করলেন—‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে’। ছাত্রনেতা গাজীউল হক লিখলেন—‘ভুলব না ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’। মুনীর চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম নাটক—‘কবর’। এইসব ভাষা আন্দোলনের কালজয়ী সৃষ্টির পাশে সচিত্র দলিল হিসেবে জ্বলজ্বল করছে রফিকুল ইসলামের আলোকচিত্র।
আজ যেখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনের সামনের আমতলা), সেখানে ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার সভায় সিদ্ধান্ত হয় সরকারের জারীকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল হবে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। এই ঐতিহাসিক মিছিলের স্থিরচিত্র ধরে রাখা দিয়ে শুরু করলেন। বাংলা ভাষার আন্দোলন শুরু থেকে বাংলাদেশের জন্মমুহূর্ত পর্যন্ত ছবি তুলে রাখলেন রফিকুল ইসলাম।
ছবি তোলা শুরু করেন ১৯৪৩ সাল থেকে—‘কোডাক’ সিক্স টোয়েন্টি বক্স ক্যামেরা দিয়ে। ’৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশবিভাগ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তে আনুষ্ঠানিকতার সাক্ষী এবং সেই অনুষ্ঠানের ছবি তোলা দিয়ে রাজনৈতিক ছবির যাত্রা শুরু করেন। এরপর ’৪৮ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রমনার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে বক্তব্য রাখেন সেই জনসভার ছবি তোলেন রফিকুল ইসলাম। ’৫০ সালে ঢাকা ‘আর্ট গ্রুপ’-এর উদ্যোগে ঢাকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে চিত্রকলার প্রদর্শনী হয় সেই প্রদর্শনীর আলোকচিত্রী রফিকুল ইসলাম। এরপর আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য প্রস্তুত। রফিকুল ইসলামও প্রস্তুত ‘ভয়েগ ল্যান্ডার’ ক্যামেরা নিয়ে। ঐতিহাসিক এই দিন ১৬টি ছবি তোলেন। যে ছবিগুলো আমাদেরকে আজও জাগ্রত রেখেছে। যে ছবি দেখে মুহূর্তে পৌঁছে যেতে পারি ৭৪ বছর আগের মহাবিদ্রোহের দিনে।
১৯৫২ থেকে টানা ’৫৫ সাল পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারির সব ঘটনাবলির সাক্ষী রফিকুল ইসলাম এবং এসব ঘটনাকে ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি।

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের ছাদে ছাত্রছাত্রীরা কালো পতাকা উত্তোলন করেন
ছবি: অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম

৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ প্রতিবাদ দিবসে আজিমপুরের দিক থেকে আসা ইডেন কলেজের ছাত্রীদের শোভাযাত্রা

১৯৫২ সালের ৫ মার্চ, বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল

ঢাকার নবাবপুর রোডে ছাত্রছাত্রীদের শোভাযাত্রা, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ ছবি: অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভাষা সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি ছবি: অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম








