সেদিন পুলিশের বর্বর হামলায় সেক্রেটারিয়েটের সামনের পথ রক্তে রঞ্জিত হয়। কারাগার ভরে যায় সংগ্রামী ছাত্রদের গ্রেফতারের কারণে। ওইদিন ভাষার দাবিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে ভিত রচিত হয়, তারই পথ ধরে আসে বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায় ক্যামেরাবন্দি করেছেন বাংলাদেশের পাঁচজন আলোকচিত্রী। মানুষ তিনজনের নাম জানে। বাকি দুজনের নাম ইতিহাসে লেখা হয়নি। ভাষা আন্দোলন-সংক্রান্ত বইপত্র কিংবা প্রকাশনায় তাদের তোলা ছবি বারবার ব্যবহার হলেও কোনো গবেষক এ দুজনের অবদানের কথা তুলে ধরেননি। ফলে ভাষা আন্দোলনে তাদের যে ত্যাগের মহিমা কিংবা অসম সাহসের গল্প সাত দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের কাছে অজানা থেকে গেছে। দুঃখের ব্যাপার এ প্রজন্মের কেউ এ সাহসী আলোকচিত্রীদের নাম পর্যন্ত জানে না।
১৯৫৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন নিয়ে যত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আলোকচিত্রী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও আমানুল হকের কথা উল্লেখ আছে। বাকি দুজনের ছবির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হলেও তাদের পরিচয় কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। কয়েক বছর চেষ্টা চালিয়ে ইতিহাসের মলিন পৃষ্ঠা খুঁড়ে আমি এ দুই আলোকচিত্রীর পরিচয় বের করে আনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আটচল্লিশের ১১ মার্চের উত্তাল সময় কোডাক ফোল্ডিং ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব। আর বাহান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত মুহূর্ত ধরা আছে মীজানুর রহমানের বক্স ক্যামেরায়। সাতচল্লিশের দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে হাতেগোনা যে কয়েকজন আলোকচিত্রীর হাত ধরে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ফটোসাংবাদিকতার গোড়াপত্তন হয়—শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব ও মীজানুর রহমান তাদের অন্যতম। ১৯৪৮ সালে ইয়াকুবের নিযুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পিআইডির ফটোগ্রাফি সেকশনের যাত্রা শুরু হয়। আর ১৯৫২ সালে মীজানুরের ছবি তোলার মধ্য দিয়ে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে প্রেস ফটোগ্রাফির সূচনাপর্ব শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাস লিখতে গেলে বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এ দুই আলোকচিত্রীকে আমলে নিতে হবে।

স্টুডিওতে তোলা রফিকের প্রতিকৃতি ছবি: লেখকের সৌজন্যে
আটচল্লিশের রক্তাক্ত অধ্যায় যে ইয়াকুবের ক্যামেরায় ধরা তার প্রমাণ পাই বাংলা একাডেমিতে পুরনো পত্রিকার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন দৈনিক বাংলার শেষ পৃষ্ঠায় একটি বিশেষ প্রতিবেদনের সঙ্গে ইয়াকুবের তোলা তিনটি দুর্লভ ছবি ছাপা হয়। প্রথম ছবিতে দেখা যায়—আহত ছাত্রনেতা শওকত আলীকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় ছবিটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র-সমাবেশের। ছবিটি ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তোলা বলে ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়। তৃতীয় ছবিটি হলো সচিবালয়ের এক নম্বর গেটে আহত ছাত্রনেতা মোহাম্মদ বায়তুল্লাহর [দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি স্পিকার]। তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। আহত শওকত আলীর ছবিটি সবার দেখা হলেও বায়তুল্লাহ ও আমতলার সমাবেশ—এ ছবি দুটি দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, যত বই প্রকাশিত হয়েছে—কোথাও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু ওইদিন যে সেক্রেটারিয়েটের সামনে আন্দোলন ঠেকাতে গুলি ছোড়া হয়—দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ছবির ক্যাপশনে সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
শওকত আলী ও শেখ মুজিবের ছবিটির একটি খণ্ডিত অংশ ফ্রেমবন্দি অবস্থায় দেয়ালে টাঙানো আছে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালায়। প্রদর্শিত ছবিটির নিচে ঘটনার উল্লেখ থাকলেও আলোকচিত্রীর নাম নেই। এছাড়া ভাষা আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত যত বই বের হয়েছে, তার কোনোটিতেই এ ছবির আলোকচিত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কোনো কোনো বইয়ে দায়সারাভাবে লেখা হয়েছে ‘সংগৃহীত’। দৈনিক বাংলায় ছবিটির ক্রেডিট না ছাপা হলে এ আলোকচিত্রীর নাম কিংবা তার অবদানের কথা অন্ধকারে হারিয়ে যেত।

আহত বায়তুল্লাহ [১১ মার্চ ১৯৪৮] আলোকচিত্র: শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব
আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের একমাত্র আলোকচিত্রী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ—এ কথা বহুল প্রচারিত। জীবদ্দশায় তকীয়ূল্লাহ ভাষাসংগ্রাম নিয়ে তার অবদানের কথা লিখে গেছেন। চিহ্নিত করে গেছেন তার তোলা ছবিগুলোও। ফলে আটচল্লিশের ভাষাসংগ্রামে অন্য যেসব ছবি বিভিন্ন প্রকাশনায় বেনামে দেখা যেত, সেগুলো কার তোলা—এ প্রশ্নের উত্তর এতদিন ছিল অমীমাংসিত। দৈনিক বাংলার পাতায় ইয়াকুবের তোলা ছবিগুলো ছাপা হওয়ায় এ অমীমাংসিত বিষয়টির সমাধানের পথ তৈরি হলো। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত তিনটি ছবি ছাড়া ইয়াকুবের বাকি ছবিগুলো আর কখনই দেখা সম্ভব নয়। কারণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে তার সারা জীবনের কাজ।
২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক দেশ রূপান্তরের মলাটে ‘প্রজন্মের অদেখা দলিলচিত্র’ শিরোনামে আমি একটি প্রবন্ধ লিখি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কেন জায়গা পেলেন না ইয়াকুব—বিষয়টি বোঝার জন্য সে সময় ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, গবেষক মফিদুল হক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সব শুনে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বললেন, ‘এখন পর্যন্ত ভাষাসংগ্রামের যে লিখিত ইতিহাস, তাতে শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের কথা উল্লেখ নেই। ওই সময় ঢাকা থেকে কোনো দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। ফলে তার ছবি ছাপানোর সুযোগও ছিল না। কিন্তু ১৯৭৪ সালে দৈনিক বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় যেহেতু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাই তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।’
মফিদুল হক বললেন, ‘আমাদের মনোযোগ বাহান্নর দিকে। অথচ আটচল্লিশ আর বাহান্ন একই সূত্রে গাঁথা। আটচল্লিশ ছাড়া বাহান্নকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কারাবরণের কারণে শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন, যা ইয়াকুবের ক্যামেরায় বন্দি। ছাত্রনেতা বায়তুল্লাহ ও শওকত আলীর ছবি দুটি প্রমাণ করে ওইদিনের বিক্ষোভ সমাবেশে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ইয়াকুব শুধু আটচল্লিশেই নয়, ছেচল্লিশের দাঙ্গার ছবি তুলেও দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। ফলে মানুষটি সম্পর্কে আরো বেশি জানা দরকার। এ বিষয়ে যত তথ্য, বিবরণ ও ভাষ্য উঠে আসবে, আমাদের ইতিহাস ততই সমৃদ্ধ হবে।’
মুনতাসীর মামুন বললেন—‘অনেক দেরিতে হলেও শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাষাসংগ্রামীকে আবিষ্কার করতে পারা এক বিশাল ঘটনা। তার তোলা আমতলার সমাবেশ ও আহত বায়তুল্লাহর ছবিটি ইতিহাসের এক নব সংযোজন। তার ছবির কারণে আমাদের ভাষা আন্দোলনের দৃশ্য-ইতিহাসের পরিধিটাও আরো বিস্তৃত হলো। ফলে এখন থেকে তার ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে ক্রেডিট লাইন ব্যবহার করা কর্তব্য বলে মনে করি।’
স্টুডিওতে তোলা রফিকের ছবি
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদের মরদেহের ছবি তোলেন মীজানুর রহমান। রফিকের যে ছবি তুলে আমানুল হক খ্যাতি লাভ করেছিলেন এ ছবিটা তার থেকে ভিন্ন। অতি সাধারণ কম্পোজিশনের সাদাকালো ছবি এটি। কিন্তু এ ছবির অন্তর্নিহিত বাণী এত তীক্ষ্ণ যে তা দেখে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী নড়েচড়ে বসে। এ ছবি ছাপার ব্যাপারে তারা আপত্তি জানায়। প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ সালে ছবিটি ছাপা সম্ভব হয়নি। পরের বছর একুশের বিশেষ সংখ্যায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ছবিটি প্রকাশ করে।
১৯৫৩ সালে ভাষাশহীদদের স্মরণে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগ একটি লিফলেট ছাপে। লিফলেটে ইত্তেফাকের ছবিটি হুবহু প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বশীর আলহেলালের ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস ও ২০০৪ সালে নিমফিয়া পাবলিকেশন থেকে সিএম তারেক রেজার একুশ: ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস (১৯৪৭-৫৬) গ্রন্থেও একই ছবি ছাপা হয়। ১৯৯১ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় আবদুল মতিন ও আহমদ রফিকের ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য। এ গ্রন্থে ছাপা হয় রফিকের মূল ছবি। বাকি প্রকাশনাগুলোয় ছাপা হওয়া ছবিটি ছিল ক্রপ করা।
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে মীজানুরের সাহসিকতার কথা লিপিবদ্ধ আছে আসিফ নজরুলের ‘সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ’ শিরোনামের প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি ছাপা হয় ১৯৯০ সালের ২০ এপ্রিল সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায়। একুশের রক্তঝরা দিনে ছবি তোলার মাধ্যমে মীজানুরের চিত্রসাংবাদিকতা জীবনের শুরু। এর আগের বছর তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী।
২১ ফেব্রুয়ারিতে দশজন দশজন করে ছাত্রমিছিল যখন গণপরিষদের দিকে রওনা হয়, তখন এ আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে মীজানুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটের কাছে অবস্থান করছিলেন। তার হাতে বক্স ক্যামেরা। পুলিশের গুলি শুরু হলে ছাত্রমিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রাণভয়ে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি করতে থাকে। পুলিশ যখন ছাত্রাবাসে ঢুকে গুলি চালায়, তখন মীজানুরের পাশেই ছিলেন রফিক। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগেই রফিকের মরদেহের ছবিটি তোলেন মীজানুর। ছবিটি প্রিন্ট করে জমা দেন ইত্তেফাক অফিসে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর চাপে ইত্তেফাক ছবিটি প্রকাশ করেনি।
ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য গ্রন্থে ছাপা হওয়া ছবিটির ক্যাপশন ক্যাপশনে লেখা হয়—‘বাহান্নর প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন।’ ছবির ক্রেডিট লাইনে ডা. হুমায়ূন কবির হাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ঘটনার বর্ণনা পড়ে প্রতীয়মান হয় ডা. হুমায়ূন কবির হাই আসলে ছবিটির সংগ্রাহক। ১৯৫২ সালে হুমায়ূন কবির হাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এ বইয়ে হুমায়ূন কবির হাইয়ের ভাষ্যও লিপিবদ্ধ আছে। গুলিবিদ্ধ রফিকউদ্দিন সম্পর্কে তার জবানবন্দি—‘বিকেল তিনটার দিকে হোস্টেলের গেটের কাছে একজনকে [আবুল বরকত] গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। আর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একজন শহীদের লাশ আমরা প্রথমে ইমার্জেন্সিতে, পরে এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় নিয়ে আসি। তার একটা ফটো নেওয়া হয় এবং সে ফটোর কপি আমার কাছেও ছিল। পরবর্তীকালে তা ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।’
ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে সাপ্তাহিক নতুন দিনের [ঢাকা, দ্বিতীয় বর্ষ, ১৬-১৭ সংখ্যা, ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭] একটি প্রতিলিপি ছাপা হয়। এ পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবির পরিচয়ে বলা হয়, ‘ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম বীর শহীদ। পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়িয়া গিয়াছে।—[ব্লক দৈনিক ইত্তেফাকের সৌজন্যে]।’ নতুন দিনের ক্যাপশন পাঠে বোঝা যায়, রফিকের ছবির ব্লকটি ইত্তেফাক থেকে প্রাপ্ত। ব্লকটিই তারা তাদের ১৯৫৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশ করে।
ইতিহাসের আবিলতা থেকে মীজানুরকে উজ্জ্বল আলোয় আনতে ইত্তেফাকের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ফটোসাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা মীজানুরের কথা স্মরণ করতে পারলেও তার পরিবার এখন কোথায় আছে—এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেন না। পরে ইত্তেফাক গ্রুপের ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউনেশনের সাবেক আলোকচিত্রী একেএম মহসীন স্মৃতি হাতরে জানালেন, মীজানুরের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। গাজীপুর প্রেস ক্লাবের কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানাতে পারি, ভাষাসংগ্রামী মীজানুর ছিলেন গাজীপুর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। গাজীপুর থেকে প্রকাশিত ভাওয়াল পত্রিকার সম্পাদক আতাউর রহমানের কাছে পাই মীজানুরের বড় ছেলে শাহরিয়ার জিয়াউর রহমানের ফোন নম্বর।
১ ফেব্রুয়ারি ওয়ারিতে গিয়ে শাহরিয়ারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। জানতে চাই, শহীদ রফিকের ছবির মূল নেগেটিভ কোথায়? শাহরিয়ার শোনালেন এক দুঃখজনক ঘটনা। তারা থাকতেন ২৮ বনগ্রাম লেনের একটি বাড়িতে। ১৯৭৪ সালে মীজানুর বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্ধ নিয়েছিলেন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করে ঢাকা দক্ষিণের এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। একদিনের মধ্যেই বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। সে সময় মীজানুরের তোলা অনেক ঐতিহাসিক ছবি-নেগেটিভ ও পেপার কাটিং নষ্ট হয়ে যায়।

ঢাকা মেডিকেলে শহীদ রফিকের মরদেহ আলোকচিত্র: মীজানুর রহমান
মীজানুরের ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাই শাহরিয়ারের কাছে। বললেন, ‘বাবা যে দিন মারা যান এর পরদিন ইত্তেফাকে তার সংক্ষিপ্ত জীবনী ছাপা হয়।’ পিআইবির আর্কাইভ ঘেঁটে সে পত্রিকা বের করি। পত্রিকার তথ্যানুযায়ী, মীজানুরের জন্ম ১৯৩১ সালে গাজীপুরের টঙ্গি উপজেলার গাজীপুরা গ্রামে। স্কুলে পড়ার সময়ই জয়দেবপুরের এক স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তোলা শেখেন তিনি। ১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও বাহান্নর ভাষা আন্দোলন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আন্দোলনের ছবি তুলতে তুলতে ফটোগ্রাফিই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক ছবি তুলে তিনি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৬৪ সালের রিপোর্টিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হন। ১৯৭২ সালে তাকে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনালের [বিপিআই] সম্পাদক ও প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই প্রয়াত হন বাংলাদেশের এ বরেণ্য আলোকচিত্রী।








