সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী আগে পাকিস্তানি আমলে পূর্ব বাংলায় ১৯৫২, একুশে ফেব্রুয়ারির সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো—শহীদ রফিকউদ্দিনের মাথায় গুলিবিদ্ধ সম্পূর্ণ মগজ ছড়িয়ে পড়ে থাকা লাশের ছবি, কারফিউ অগ্রাহ্য করে ছাত্রদের হাতে এক রাতে নির্মিত প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদের রক্তরাঙা জামাকাপড়, ফেস্টুন, ব্যানারে রক্তিম হরফে চলমান ইতিহাসের কথকতা আর মাতৃভাষার দাবিতে উদ্বেল মিছিলে প্রতিবাদের অগ্রপথিক মওলানা ভাসানীর দৃপ্তভঙ্গি ও শহীদ মাতার অশ্রুসিক্ত আকুতি, আরো কত কী! সবই ছিল আমার ক্যামেরার ছবিতে আঁকা।

সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে একদিন আমরা যারা ছিলাম পরিশ্রমী পদাতিক, আজ তারা ন্যুব্জদেহ জরা আর বয়সের ভারে। সে কারণেই ভেবেছিলাম ১৯৯৬-এর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে আর শহীদ মিনারে যাওয়া হয়ে উঠবে না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কি আশ্চর্য, ভাষাশহীদ দিবস এবং প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘ঈদ’ একই দিনে! মনে পড়ে গেল জ্ঞান-তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অমর উচ্চারণ। ১৯৪৮ সালে তিনি ডাক দিয়েছিলেন বাঙালি মুসলমান ছাত্রসমাজকে:

‘তোমরা বাঙালি। তোমরা বাঙালি মুসলমান। বাঙালার মাটিতে, বাঙালার শস্যে, বাঙালার ফলে তোমাদের দেহ গঠিত, পুষ্ট, বর্ধিত, খুব সম্ভবত এই বাঙালার ক্রোড়ে তোমাদের শরীর চিরনিদ্রায় শায়িত হইবে...।’

তিনি আরো বলেছেন: ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা...। মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি—এই তিনটি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু।’ ধর্ম নয়, জাতীয়তাই মানবগোষ্ঠীর প্রথম ও মৌলিক পরিচয়।

নিমিষে শক্তি সঞ্চার হলো রুগ্‌ণ দেহ-মনে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’ এ গানের সুরে ধ্বনিত শহীদ মিনার, মাটিতে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নকশায় আঁকা আলপনা আর ফুল দিয়ে রচিত বাংলাদেশের মানচিত্র। ঈদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় টুপি-চিরাচরিত মুসলিম উৎসবের সাজে বাংলাদেশের যুবক-বৃদ্ধ-বালকেরা বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নগ্ন পায়ে ফুল হাতে শহীদ মিনারে সমবেত। তাৎপর্যপূর্ণ এসব দৃশ্যাবলি আমার ক্যামেরার ছবিতে যোগ করল নতুন মাত্রা।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের সামগ্রিক চেতনা এবং তার বহুমুখী প্রকাশ ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, বিশেষভাবে শহীদ। মিনারকেন্দ্রিক কার্যাবলিতে প্রকৃষ্ট রূপ লাভ করে আছে। শহীদ মিনারে আমরা সবাই সেক্যুলার, ধর্মনিরপেক্ষ। অন্যভাবে বললে শহীদ মিনার ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার প্রতীক। কোনো প্রতিক্রিয়াশীলতাই শত চেষ্টা সত্ত্বেও তার দখল নিতে পারেনি। মূলত মাতৃভাষাকেন্দ্রিক হয়েও একুশের ভাষা আন্দোলন আসলে প্রগতি আর প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।

শহীদ স্মরণে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরে সুরে, আলপনা আঁকা মিনারে আমরা বাঙালিরা যেমন পুষ্পমাল্য অর্পণ করি শ্রদ্ধাবনত মস্তকে, সবার বেলায় একই প্রথা—তিনি আটিকানের মহামান্য পোপের প্রতিনিধিই হোন অথবা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা বিভিন্ন উপজাতীয় ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের বা দেশের প্রতিনিধিই হোন। বলা যায়, শহীদ মিনার স্বমহিমায় যতদিন টিকে থাকবে, এর পাদদেশে মিলিত হয়ে আমরা উদার স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক হৃদয়াবেগে অবগাহন করে নব নব প্রতিজ্ঞা-প্রত্যাশায় অনুপ্রাণিত হব।

...ব্রিটিশ আমলে সংসদ কার্যাবলি ইংরেজি ভাষাতেই পরিচালিত হতো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি মীমাংসা না হলে সংবিধান রচনার কাজে অগ্রসর হওয়া যায় না, সেই সুযোগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ইংরেজির সঙ্গে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করে। এ পরিস্থিতিতে উর্দুর পাশাপাশি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে যিনি গণপরিষদে প্রথম প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তিনি পূর্ববাংলার কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বিরোধীদলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বললে অত্যুক্তি হয় না, ধর্মভিত্তিক মুসলিম লীগ অধ্যুষিত সরকারি দলের অধিকাংশ বাঙালি নেতাই তখন ছিলেন অবাঙালি পাকিস্তানিদের তাঁবেদার। ঘোরতর চাপের মুখে যুক্তিপূর্ণ প্রস্তাব থেকে পিছপা না হলেও ধীরেন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িক আখ্যায়িত করে বাংলা ভাষার দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রগতিশীল ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, যুব সমাজ এ কলঙ্ককে অনেকাংশে মোচন করে ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, অধিবেশন শেষে ফেরার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে ছাত্ররাই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মাল্যদান করে সমর্থন ও সম্মানিত করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংঘটিত হয় এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১১ মার্চ, ১৯৪৮ প্রথম প্রদেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয় প্রধানত ছাত্রদের উদ্যোগে। এভাবেই বাংলা ভাষার দাবিতে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। উল্লেখ্য, ১৯৫১ সাল পর্যন্ত পরপর চার বছর ভাষা দিবস পালিত হয়। এরই পরিণত রূপ ১৯৫২-এর ঐতিহাসিক বাংলা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষা আন্দোলনের বিকশিত রূপ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে জানা-অজানা ভাষাশহীদসহ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে বর্বর পাক হানাদারদের হাতে পুত্রসহ আত্মদান করে মহৎপ্রাণ এ বাঙালি বাংলা ভাষার প্রতি তার অকৃত্রিম আনুগত্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

‘উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’—গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সদম্ভ ঘোষণা। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো দেশের পূর্বাঞ্চলীয় রাজধানী সফরকালে রমনা রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় স্বভাবতই অনুগত জনগণের আধিক্যই ছিল লক্ষণীয়। তবুও মনে পড়ে মঞ্চের অনতিদূর থেকে প্রতিবাদের অনুচ্চ কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল। বিশাল জনসভার এক কোণে ক্যামেরা হাতে বসেছিলাম আমি।

3a

রফিকের রক্তে ভেজা রাজপথ, তার উপর পড়ে আছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত একটি লিফলেট ছবি: আমানুল হক

কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উপলক্ষে কার্জন হলের সভায় জিন্নাহর সেই একই সদম্ভ উক্তি। ‘উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এবারে নিছক অনুচ্চ কণ্ঠ নয়—জোর গলায় বাঙালির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর—‘না, না’।

বিরূপ প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন ধাপে ধাপে শক্তি সঞ্চয় করেছে। আমরা যারা সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্বাঞ্চলের রাজধানী ঢাকা শহরে স্থবির-পর্যুদস্ত রক্ষণশীল জীবনপ্রবাহের সঙ্গে পা মিলিয়েছিলাম তারা জানি, যেকোনো ধরনের প্রতিবাদী মন্তব্যই গণ্য হতো পাকিস্তান রাষ্ট্রবিরোধী মতামত হিসেবে। বলা বাহুল্য, সে সময় ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে এক করেই দেখা হতো। প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কল্পনার অতীত। ‘শিশু পাকিস্তান’ এই ধুয়ো তুলে পাকিস্তানের মঙ্গল ও অগ্রগতি সাধনের কথা বলত নেতারা। পূর্ব বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিনের বাংলা ভাষা বিষয়ে চুক্তি বরখেলাপ, নূরুল আমীন, তমিজউদ্দিন আহমেদ, ফজলুর রহমান প্রমুখের নানা হঠকারী কার্যকলাপ, পূর্ব বাংলায় উর্দু প্রচলনের মহড়া, বাংলা ভাষায় নির্বিচারে আরবি-ফারসি শব্দ যোগ করার অপচেষ্টাসহ রোমান, আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের চেষ্টা এবং এ ব্যাপারে ভুল স্থাপন, কারেন্সি নোট, ডাকটিকিট ইত্যাদি সরকারি দলিল-দস্তাবেজে বাংলা বর্জন—এ ধরনের নানা কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে প্রবঞ্চনার বহুমুখী চেহারাটি উন্মোচিত হতে বেশি সময় লাগেনি।

অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ক’জন লোক খুঁজে বের করা সম্ভব ছিল, যিনি পাকিস্তান আন্দোলনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করেননি? বলা যায় আমরা সবাই সমর্থন করেছিলাম।

আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলি, ওই সময় পাকিস্তানের সপক্ষে প্রচারণার কাজে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে সফরকালে ভাবী আওয়ামী লীগ নেতা ও ভাষা আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ অনেক সময় আমাকে তার সঙ্গে নিতেন। তখন আমি কলেজের ছাত্র। ঢোল-ড্যাগর, সঙ্গী-সাথি নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাকিস্তানের সপক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে দেখেছি সমর্থনের জমিন তৈরি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের বিধিলিপি। বাস্তবতাটা যখন এরকম সে অবস্থায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাত মাসের সময়সীমায় বুদ্ধিজীবী লেখক সমাজের প্রাথমিক দিকনির্দেশনায়, ছাত্রসমাজের সক্রিয় প্রচেষ্টায় ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে কী করে ভাষা আন্দোলনের সেই প্রাথমিক গতিবেগ সৃষ্টি হয়েছিল তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এই প্রথমবারের মতো পূর্ব বাংলার সাধারণ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী জনগণ তাদের রক্ষণশীল ধ্যান-ধারণার গতানুগতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে দেশ ও কাল সম্পর্কে নতুন চিন্তাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হলো। এ পরিবর্তন শুধু পরিমাণগত নয়, ক্ষেত্রবিশেষে গুণগত বললেও অত্যুক্তি হয় না।

আসলে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই এ দেশের জনগণ ক্রমে প্রতিবাদ করার সাহস ও ক্ষমতা অর্জন করতে শিখেছিল। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এটা একটা বড় কথা। ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী চরিত্রই বাঙালিকে ক্রমে সাহসী যোদ্ধায় পরিণত করেছিল।

বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান ঘটনাস্থল তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের স্থান।

একুশে ফেব্রুয়ারি যে কিছু একটা ঘটতে পারে সে সম্পর্কে আগে থেকেই আমরা আঁচ করতে পেরেছিলাম। বলা প্রয়োজন, আমি তখন চাকরিরত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আর্টিস্ট ও ফটোগ্রাফার হিসেবে। যে ক্যামেরা যন্ত্রটি আমার গলায় ঝুলত একুশের দিন সেটি আমার পকেটে লুকোনো। সকাল থেকেই চাপা উত্তেজনা। দলে দলে স্কুল-কলেজের ধর্মঘটী ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘১৪৪ ধারা মানি না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে জমায়েত হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। দেখা গেল, সকাল দশটা-এগারোটার মধ্যেই কলাভবনের আমতলা এলাকা প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত সংগঠন ও সম্মিলিত ছাত্র সংগঠনের মতভেদের পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে এ আমতলার সমাবেশেই। এদিকে সরকারি নিবর্তনমূলক ১৪৪ ধারা এক মাসের জন্য জারি করা হয়ে গেছে। যার ফলে মিছিল, বিক্ষোভ, সমাবেশ নিষিদ্ধ। গাজীউল হক, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, গোলাম মওলা প্রমুখ ছাত্রনেতার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ জন করে ছাত্রছাত্রীদের ছোট ছোট একেকটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় পুলিশ বাহিনী মোতায়েন ছিল আগে থেকেই। বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার এবং লাঠিচার্জ শুরু হয়ে যায়। দুপুরের দিকে পুরনো কলাভবন (এখন যেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ), সেখান থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণ (বর্তমান শহীদ মিনারসংলগ্ন স্থান) এবং সামনের রাস্তা ও আশপাশের এলাকাজুড়ে চলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও বেপরোয়া টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, অপরপক্ষে ছাত্র-জনতার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ—সব মিলিয়ে এক বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের কোণ বরাবর স্থাপিত হয়েছিল পুলিশ ঘাঁটি, অধিবেশনরত পরিষদ ভবনে (বর্তমান জগন্নাথ হল) যাওয়ার পথে কাঁটাতারের ব্যারিকেড। ততক্ষণে বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত দল সব বাধা অতিক্রম করে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি পেশ করার জন্যে পরিষদ (এসেম্বলি) ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। বেলা তখন ৩টা বেজে গেছে। চূড়ান্ত উত্তেজনাকর। পরিস্থিতির মধ্যে পুলিশ বাহিনী ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে এবং দুই দফায় প্রচুর গুলিবর্ষণ করে।

হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলাম, কয়েকজন ছাত্র-যুবক একজনের রক্তমাখা দেহ ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতেই ক্রোধে ও দুঃখে একজন আর্তনাদ করে উঠল—‘ওরা গুলি করেছে, ওরা মেরে ফেলেছে।’ গুলিবিদ্ধ আবুল বরকতের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, হাসপাতালে ভর্তির পর রাতে তার মৃত্যু হয়। আহত-নিহতদের লাশ নিয়ে ছাত্র-জনতা এবং ডাক্তার, নার্স, মেথরসহ সর্বস্তরের হাসপাতাল কর্মীদের মধ্যে তখন এক মহাচাঞ্চল্যকর অবস্থা। ক্ষোভে-দুঃখে নার্স ও ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও কাঁদছেন। সে এক চূড়ান্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। ছাত্রাবাস এলাকায় গিয়ে দেখলাম হোস্টেলের বারান্দাঘেঁষে এবং বাইরের নানা জায়গায় রক্ত। বাইরে যেখানে অনেকটা জায়গাজুড়ে রক্ত জমাট বেঁধে ছিল তার মাঝখানে দেখলাম ভাষা আন্দোলনের কোনো এক অজ্ঞাত কর্মী ছোট্ট একটি ইশতাহার ইটের টুকরো চাপা দিয়ে রেখে গেছে। অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলো দৃশ্যটি। কৌশলে পকেটে লুকোনো ক্যামেরাটি ঠিক করে নিমিষে ছবি তুলে দূরে চলে গেলাম। এ দেশের নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনে রক্তের ছবি তুলতে হয়েছে বারবার। বাহান্ন-পরবর্তী সময় প্রতিবারই আমার মনে হয়েছে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তই যেন জমাট বেঁধে আছে।

মনে পড়ে ওইদিন বিকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন এবং আমি তার ছবিও তুলি। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ মুসলিম লীগ পরিষদীয় দল থেকে ও ‘আজাদ’ পত্রিকা সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন পরিষদের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তও এসেম্বলিতে বলিষ্ঠ ভাষায় প্রতিবাদ জানান এবং অন্যদের সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

বাংলা ভাষার দাবি জানাতে গিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ এলাকায় শহীদ হয়েছিলেন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম ও নাম না জানা এক কিশোর। ২২শে ফেব্রুয়ারি পুরনো হাইকোর্ট ভবন ও কার্জন হলের মধ্যবর্তী রাস্তায় মিলিটারির গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান, রিকশাচালক আউয়াল এবং নাম না জানা আরো কয়েকজন। আহত ও গ্রেফতার হন অসংখ্য ব্যক্তি। পুলিশ ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির শহীদদের লাশ গোপন করে ফেলে। মিলিটারিরা হাসপাতাল মর্গ থেকে লাশ নিয়ে যায়। শুধু এক ভাষাকর্মীর সাহসী প্রচেষ্টায় আজিমপুর গোরস্তানে শহীদ বরকত ও শফিউর রহমানের কবর দুটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

২২ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বিশাল গায়েবানা জানাজা শেষে শহীদদের রক্তরঞ্জিত জামাকাপড় পতাকার মতো ঝুলিয়ে হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষের বিশাল মিছিলের দৃশ্য এ দেশে এই প্রথম। পুরনো হাইকোর্টের পাশের রাস্তায় এ মিছিলে এবং নবাবপুর, সদরঘাট, বংশাল, রথখোলা ও জনসন রোড এলাকায় মিলিটারি গুলিবর্ষণ করে। তখনকার বাংলা ভাষাবিরোধী মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিস ও প্রেসে জনতা অগ্নিসংযোগ করলে সেখানেও মিলিটারি গুলিবর্ষণ করে। মনে পড়ে বেসামাল অবস্থায় ক্যামেরা পকেটে দৌড়েছিলাম। প্রথম পর্যায়ে সচিবালয়ের কাজসহ রেল চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টিও অভূতপূর্ব ব্যাপার। একটানা চারদিন হরতাল। মফস্বলেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ২৩ ফেব্রুয়ারিও প্রতিবাদী জনতার বিক্ষোভ। ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সর্বক্ষেত্রে নেমে আসে ব্যাপক নির্যাতন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা।

তখনকার দিনে যে তিনটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র ছিল তাদের সবার নিজস্ব আলোকচিত্রী ছিল না। শুনলে অবাক লাগবে, ভাষা আন্দোলনের আগুন ঝরা ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর দলিলচিত্র শুধু আমানুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র বাংলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল-প্রফেসর রফিকুল ইসলামের ক্যামেরায় গৃহীত। ১৯৪৮-এর রাষ্ট্রভাষা দিবসের ছবি তুলেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র মুহম্মদ তকীউল্লাহ। এরা কেউই পেশাদার সংবাদচিত্রী ছিলেন না।

পূর্ব বাংলা সরকারি প্রচার দপ্তরে আলোকচিত্রী ছিলেন মাত্র একজন, যিনি পত্রিকার কাজও করতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র গ্রহণের ব্যবস্থা হয়েছিল কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা ক্যামেরাম্যানকে দিয়ে। মঞ্চের ওপর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আসনের অনতিদূরে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বিশেষ ভঙ্গিতে তার ক্যামেরা। চালনার দৃশ্য আমার মনে যথেষ্ট কৌতূহল উদ্রেক করেছিল বিধায় আজও ভুলিনি। ছোট্ট বাক্স-ক্যামেরা হাতে বিশাল জনসমুদ্রের এক কোণে বসেছিলাম আমি।

ঘটনার মূল সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় বাস্তব পদক্ষেপের অভাব, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অভাবহেতু হতাহতের নাম-পরিচয় ও সংখ্যা নিরূপণসহ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় অদ্যাবধি যেমন বিতর্কিত রয়ে গেছে তেমনি তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণে সম্ভাব্য সত্যানুসন্ধান প্রক্রিয়া অব্যাহত।

একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক শহীদ রফিকের ছবি তোলার ঘটনাটি। মেডিকেল কলেজের বারান্দার সামনেই দেখা হলো পূর্ব বাংলা প্রচার দপ্তরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক আদর্শবাদী সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের সঙ্গে। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গুলিবর্ষণের খবর শুনে ছুটে এসেছিলেন হাসপাতাল এলাকায়। শহীদ রফিকের ছবি তোলার ব্যাপারে আমাদের যৌথ প্রয়াসের বিস্তারিত বিবরণ কাজী ইদরিসের জবানিতে এখানে তুলে ধরছি:

‘...আহত ছাত্রদের অনেকে তখনো হাসপাতালের মেঝের ওপর শোয়া। চারদিকে একটা দারুণ উত্তেজনা। এই সময় নুরুদ্দিনের স্ত্রী হালিমার সঙ্গে আমার দেখা (পরবর্তীকালে গ্রীন অ্যান্ড হোয়াইটের নুরুদ্দিন আহমদের স্ত্রী ডা. হালিমা খাতুন লেখক)। সে তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। অ্যাপ্রন পরা অবস্থায় খুব ব্যস্ত। কিন্তু তার মধ্যেই সে আমাকে বলল—যে ছাত্রটির মাথার খুলি উড়ে গেছে তার দেহটা হাসপাতালের পেছন দিকে একটা ঘরে রাখা আছে। সে বলল যে, ইচ্ছে করলে মৃতদেহটা দেখাতে পারে। আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হলাম এবং সে আমাকে খুব সাবধানে পেছনের দিকে সেই নির্দিষ্ট কামরায় হাজির করল। আমি দেখলাম ছেলেটির মাথার খুলি উড়ে গেছে, দেখে আমার মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া হলো। আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। আমি তখন হালিমাকে জিগ্যেস করলাম যে, মৃতদেহটির ছবি তোলা যায় কিনা এবং সে তার ব্যবস্থা করতে পারবে কিনা। সে বলল, লুকিয়ে তাড়াতাড়ি ১ মিনিটের মধ্যে কেউ যদি সে কাজ করতে পারে তার পক্ষে ব্যবস্থা করা সম্ভব। আমানুল হক নামে একজন ফটোগ্রাফার তখন চাকরি করত, আমি মেডিকেল কলেজের বারান্দা থেকে সামনে মাঠের মধ্যে এসে আমানুলের দেখা পেলাম। তখন সে ফুলহাতা হাওয়াই শার্ট পরেছিল এবং সেই শার্টের মধ্যে তার একটা ক্যামেরা লুকানো ছিল। ছবি তোলার জন্য ক্যামেরাটি এনেছিল। কিন্তু ছবি তোলা সে সময় বিপজ্জনক হতে পারে মনে করে ক্যামেরাটি লুকিয়ে রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। আমি সমস্ত ব্যাপারটি বর্ণনা করে ছবি তোলার কথা জিগ্যেস করলাম। সে তখনই রাজি হয়ে গেল। এরপর আমি হালিমার সাথে কথা বললাম। ঠিক হলো যে, আমি আমানুলের সাথে যাব না। সে একাই যাবে এবং মেডিকেল কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হালিমা ইশারা করলে তাঁর কাছে যাবে। ইতিমধ্যে আমানুল তাঁর ক্যামেরা ঠিকঠাক করে আনতে কোনো জায়গায় গিয়েছিল। সে ফিরে এলে তাকে আমি সব বললাম এবং হালিমাকে দূর থেকে চিনিয়ে দিলাম। এরপর হালিমা একবার ইশারা করায় সে তাঁর কাছে গেল এবং ভেতরের দিকের কামরাটায় গিয়ে ছবিটি তাড়াতাড়ি তুলে আনল। এসে বলল ছবি ভালোই আসবে। সন্ধ্যের সময় আমানুলের বাড়ি গিয়ে দেখলাম ছবিটি খুব ভালো উঠেছে, ছবিটির কয়েক কপি করা হয়েছিল। তার মধ্যে এক কপি নিয়েছিল স্পোর্টস ফেডারেশনের এএসএম মহসিন (সাজু), একটি কপি দেয়া হয়েছিল মাজেদ খানকে। (ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং আরেকটি দৈনিক আজাদে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল—আজাদে ওটা ছাপাবার ব্যবস্থাও হয়েছিল। ছবিটির ব্লকও এসেছিল। কিন্তু রাত প্রায় দুটোর সময় কর্তৃপক্ষের, হয় মওলানা আকরাম খান নয়তো সদরুল আনাম খানের আপত্তিতে সেটা শেষ পর্যন্ত আর আজাদে ছাপা হয়নি। মাজেদ খানের কাছে যে কপিটি ছিল তা থেকেও ব্লক তৈরি করা হয়েছিল। সে ব্লকটি মাজেদ খানের মাধ্যমেই ছাত্রদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। ছাত্ররা একটি প্রচারপত্র লিখে তাতে ছবিটি ছেপেছিল। এই প্রচারপত্র পরে পুলিশের হাতে পড়ায় সব গুলি “‍সীজ” করে বাজেয়াপ্ত করে।’

পুলিশ বাহিনী যে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে হত্যার উদ্দেশ্যেই বেপরোয়া গুলি চালিয়েছিল ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের কপালে গুলি লেগে মাথার অর্ধেকটা খুলিসহ প্রায় সম্পূর্ণ মগজ ছড়িয়ে পড়ে থাকা ছবিটিই তা প্রমাণ করে। যা মাতৃভাষার জন্য জীবনদানের একমাত্র দলিলচিত্র।

বলাবাহুল্য, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি তুলে গোপনে ফিল্ম পরিস্ফুটন ও প্রিন্ট তৈরি করে সাগ্রহে সম্ভাব্য প্রকাশনার জন্য আমার সেসব ছবি যাদের হাতে তুলে দিতাম, হাতবদল হতে হতে ওই ছবিগুলো যে কোথায় চলে যেত তা আমরাও জানতাম না।

প্রসঙ্গত বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যাটের দশকে কলকাতায় বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার সময় তার একজন প্রধান সহকারী, বন্ধুবর নিতাই দত্তের মুখে একদিন নানা কথা প্রসঙ্গে শুনেছিলাম কেমন করে শহীদ রফিকের ছবি পোস্টারে ছেপে তারা ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। বলা প্রয়োজন, নিতাই দত্ত চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন, পরে পাকিস্তান সরকারের দমননীতির কারণে দেশত্যাগ করেন।

বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব বিজয় পাকিস্তানি চক্রান্তের ফলে ভণ্ডুল হয়ে যায়। নেমে আসে নির্যাতনমূলক নানা দমননীতি। ওয়াকেফহাল সাংবাদিক কাজী ইদ্রিস শহীদ রফিকউদ্দিনের ছবি তোলার কারণে সম্ভাব্য পুলিশি হামলার আশঙ্কায় মাঝে মধ্যে আমাকে সাবধান করতেন। শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় মধ্যবিত্তের ভরসাস্থল চাকরিটি ছাড়তে হয়েছিল। পরে সিনেমার কাজ শেখার আশায় কলকাতা চলে যাই। পরম পরিতাপের বিষয়, বিপর্যন্ত সেই দিনগুলোতে ভাষা আন্দোলনের অনেক অমূল্য ঐতিহাসিক আলোকচিত্র হারিয়ে ফেলি। আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী লুৎফা হকের ঐকান্তিক চেষ্টায় তারই বাক্সে কাপড়ের ভাঁজে দীর্ঘকাল লুকিয়ে রেখে ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মদানের একমাত্র দলিলচিত্র—শহীদ রফিকউদ্দিনের মাথায় গুলি লেগে মগজ ছড়িয়ে পড়ে থাকা ছবিটির নেগেটিভ তিনি রক্ষা করেছিলেন।

ওই সময়ে পুলিশের হুমকি থেকে রক্ষা পেলেও স্বজাতীয় এক বাঙালি সংবাদপত্র সম্পাদক আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনের ছবি তোলার অজুহাত দেখিয়ে, যখন পূর্বে তাকে দেয়া বিভিন্ন ছবির দাম বাবদ পাওনা অর্থের জন্য তার দপ্তরে গিয়েছিলাম। শুনেছিলাম তার এক আত্মীয় পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সেই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে শহীদ রফিকউদ্দিনের সদ্য তোলা ফটোর ফিল্ম পরিস্ফুটন ও প্রিন্ট তৈরির কাজগুলো গোপনে আমার এক বাঙালি বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তির ফটো স্টুডিওতে করলেও ওই প্রতিষ্ঠানের যে উর্দুভাষী অবাঙালি আলোকচিত্রী সবই জানত, একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে দখলদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় অনুচরদের উপস্থিতির বিভীষিকাময় দিনগুলোতে সে কোনোভাবে আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেনি। এতদিন পরে এই বিষয়টি নতুন তাৎপর্য নিয়ে মনে দাগ কাটে। ৫০-এর দশকে পৃথিবীর নানা আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে পূর্ব বাংলার জীবনভিত্তিক আমার তোলা ছবির প্রিন্ট নির্মাণের কাজ ঐ স্টুডিওতে করার সময় সর্বদা সে ছিল এক বিমুগ্ধ দর্শক। তাছাড়া ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে বিশেষ সংবাদচিত্র প্রতিবেদক হিসেবে আমার তোলা গণহত্যার ছবিগুলোর জরুরি প্রিন্ট তৈরির অনেক কাজও সে নিজ হাতে করে দিয়েছে। সে যে যথার্থই আমাকে মান্য করত সে কথা আজও আমি ভুলিনি।

টেলিফোন হাতে তুলে নিয়ে আস্ফালনরত পূর্ববর্ণিত সেই বাঙালি সংবাদপত্র সম্পাদকের কথা মনে হলে আমার দুঃখ হয়। অর্ধশতাব্দী পরে স্মৃতিতে সামান্য ঝাপসা হয়ে আসা বাঙালি-অবাঙালি দুই মুখ আজ রূপান্তরিত প্রতীক। ইতিহাসের উপাদানও বটে।

শহীদ মিনার নির্মাণের ঘটনাবলিও তাৎপর্যপূর্ণ। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতা গোলাম মওলার নেতৃত্বে আলোচনায় ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং অঙ্কন কাজে দক্ষ মেডিকেল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম যে নকশাটি আঁকেন, সামান্য পরিবর্তন করে তা গৃহীত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নকশাকার হিসেবে মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সাঈদ হায়দারও মিনারের নকশা অঙ্কন ও নির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন বলে ডা. বদরুল আলম ও ডা. সাঈদ হায়দারকে মিনারের যৌথ রূপকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথম দিকে একুশের নানা আলোচনায় ও কর্মকাণ্ডে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ শব্দটির ব্যবহারই লক্ষ করা যায়। প্রথম ‘স্মৃতিস্তম্ভের’ গায়ে সিমেন্টের পলেস্তারার ওপরে সাদা কাগজে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ লেখাটি তখনকার আলোকচিত্রে বিষয়টির সাক্ষ্য বহন করে। বলা বাহুল্য, আমি নিজেও প্রথম স্মৃতিস্তম্ভটির ছবি তুলেছিলাম। এই সময়ের উচ্চকিত স্লোগান ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’। সম্ভবত এর সূত্র ধরে কালক্রমে ‘শহীদ মিনার’ এ অসাধারণ নামকরণটি বাঙালির জীবনে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে।

তখনকার নবজাগ্রত চেতনাকে এই শহীদ মিনার এমন প্রবলভাবে ধারণ করেছিল যে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

সমাজ পরিবর্তনের জন্য শিল্প—একটি বৈপ্লবিক ধারণা। আজ এতদিন পরে এই কথা ভেবে বিস্ময়বোধ হয় যে গোলাম মওলা, বদরুল আলম, সাঈদ হায়দার ও তাদের সহযোগী অসংখ্য ছাত্র ও একজন মিস্ত্রি মিলে নির্মাণকাজের জন্য রাখা ইট-চুন-সুড়কি দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১১ ফুট উঁচু যে ক্ষুদে স্থাপত্যকর্মটির পরিকল্পনা এবং নির্মাণের দুরূহ কাজ সারা রাত জেগে কারফিউ এবং প্রচণ্ড হিমেল হাওয়ার মধ্যে অবলীলাক্রমে সমাধা করেছিলেন এক রাতে, পরবর্তীকালে এরই অনুসরণে নবপর্যায়ে নির্মিত বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সময়সীমায় প্রায় দুই দশকজুড়ে অতি সক্রিয়ভাবে সমাজচেতনার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এখনো যেমন শুভ কাজে এবং অশুভ কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আমরা সবাই শহীদ মিনারে সমবেত হই এবং মাল্যদান করি, নিঃসন্দেহে বলা যায়, অনাগত ভবিষ্যতে শহীদ মিনার এ দেশের মানুষের সর্বকল্যাণ প্রয়াসে অন্তহীন প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে থাকবে। এ দেশের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের নানা স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে এবং হবে, কিন্তু বলা যায় এই শহীদ মিনারের কোনো তুলনা হয় না। মূল মিনারটির প্রভাব যে কত সুদূরপ্রসারী তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে দেশজুড়ে নির্মিত ছোট-বড় শত শত শহীদ মিনার।

[লেখাটি সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত আমানুল হকের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—একুশের তমসুক’ (২০০৩) শীর্ষক গ্রন্থ থেকে এখানে সংক্ষেপে সংকলিত হয়েছে]