এটা বিস্মৃত হওয়ার উপায় নেই যে মহান ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার এবং এর বেগবান বিকাশমান হওয়ার প্রেরণা ও প্রযত্ন দানে যে প্রিন্ট মিডিয়ার অবদান ছিল সবার ওপরে সেটি সাপ্তাহিক সৈনিক। ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর ভাষা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাসেমের (১৯২০-৯১) উদ্যোগে সাপ্তাহিক সৈনিকের যাত্রা শুরু হয়। প্রফেসর আবুল কাসেমের আজিমপুর ১৯ নম্বর বাসা ছিল সৈনিক পত্রিকা ও তমদ্দুন মজলিসের অফিস। ১৯৪৮ সাল থেকেই এ পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কার্টুন প্রভৃতি শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

সাপ্তাহিক সৈনিকের প্রধান সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট কথাশিল্পী শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১)। অন্যতম সম্পাদক ছিলেন এনামুল হক। সৈনিক সম্পাদনার সঙ্গে প্রথম পর্যায়ে আর যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন সানা উল্লাহ নূরী, আবদুল গফুর, মোস্তফা কামাল প্রমুখ। পরবর্তীকালে যারা সৈনিক সম্পাদনার সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত হন তাদের মধ্যে ছিলেন হাসান ইকবাল, কবি মফিজউদ্দিন আহমদ, দিদারুল আলম খাঁ, ফারুক মাহমুদ, সৈয়দ মোস্তাফা জামাল, আজিজুর রহমান প্রমুখ। শুরুর দিকে সাপ্তাহিক সৈনিকের মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে (অধ্যাপক) মোহাম্মদ আবুল কাসেমের নাম ছাপা হলেও ১৯৫১-৫৯ পর্যন্ত আবদুল গফুরের নাম ছিল মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে। তবে সৈনিকের প্রকাশনা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বহুদিন পর্যন্ত মূল ভূমিকা পালন করেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাসেম। সাপ্তাহিক সৈনিকের মুদ্রাকর, প্রকাশক (১৯৫১-৫৯), নব পর্যায় (১৯৭০-৭১) ও স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে স্বল্পকালীন প্রকাশের সময় সম্পাদকের দায়িত্বপালনকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুরের (১৯২৯-২০২৪) মাধ্যমে জানা যায় ‘‌সাপ্তাহিক সৈনিক ভাষা আন্দোলন, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন এবং নির্যাতিত মানুষদের দাবিদাওয়ার প্রশ্নে আগাগোড়াই ছিল সোচ্চার। সাপ্তাহিক সৈনিক একই সঙ্গে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের দাবিতেও উচ্চকণ্ঠ ছিল। একই সঙ্গে ইসলাম ও বাংলা ভাষার প্রতি সমর্থন দানকে অনেকে সৈনিকের মধ্যে স্ববিরোধিতা আবিষ্কার করলে সৈনিকে তাদের পবিত্র কুরআনের সুরা ইবরাহিমের চার নম্বর আয়াতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করত, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ কোনো রসুলকে তার মাতৃভাষায় ব্যতীত বাণী পাঠাননি, যাতে তিনি তাদের সহজে আল্লাহর বাণী বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন। একইভাবে যারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিকে পাকিস্তানের সংহতির বিরোধিতা বলে অভিযোগ করত, সৈনিক তাদের পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তিরূপী লাহোর প্রস্তাবের মর্মবাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলত, লাহোর প্রস্তাবেই উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কারণ দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন একাধিক ভূখণ্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় নেই বললেই চলে।’

সৈনিকের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে কোনো সংকীর্ণতার স্থান ছিল না। সৈনিক একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কলমযুদ্ধ চালাত। সাপ্তাহিক সৈনিক বিভিন্ন সময়ে যেসব বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে তাতেও সৈনিকের আদর্শ সম্পর্কে একটা বক্তব্য উঠে আসত। যেমন সমাজকে দুর্নীতির কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ৩ জুন প্রকাশ করে দুর্নীতিবিরোধী সংখ্যা। ১৯৫০ সালে ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় পূর্ববঙ্গে দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ২ এপ্রিল ১৯৫০ প্রকাশ করে দাঙ্গাবিরোধী সংখ্যা। এ সংখ্যায় অন্যদের মধ্যে আসকার ইবনে শাইখ, কাজী ফজলুর রহমান, শওকত ওসমান, সোলায়মান খান, মাহফুজুল হক প্রমুখের লেখা প্রকাশ হয়।

সাপ্তাহিক সৈনিকের আর একটি উল্লেখযোগ্য বিশেষ সংখ্যা ছিল জমিদারিবিরোধী সংখ্যা। পুস্তক আকারে প্রকাশিত এ বিশেষ সংখ্যাটিতে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী নিবন্ধ, গল্প, নাটক, কবিতা ইত্যাদির মাধ্যমে জমিদারি প্রথার মানবতাবিরোধী স্বরূপ উন্মোচন করে বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। ১৯৫১ সালে স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট জারি তথা নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মূলে প্রবর্তিত জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পটভূমি তৈরি করে।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নির্মাণ ও এর বৃদ্ধিবৃত্তিক বলয় নির্মাণে সাপ্তাহিক সৈনিকের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন একই দিনে সৈনিক পত্রিকার কয়েকটি সংস্করণ বের হয়েছে এবং তা নিমেষেই বিক্রি হয়ে গেছে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটির তিনটি সংস্করণ বের করা হয়। মফস্বলেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সাড়া জাগায় পত্রিকাটি। সে সময় শুধু প্রেসনোট ছাপার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পত্রিকাটি সরকারি সে আদেশ মানেনি। সাপ্তাহিক সৈনিক বাংলা ভাষাবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যও খাজা নাজিম উদ্দিনের বক্তৃতার তীব্র সমালোচনা করে শীর্ষ সংবাদ শিরোনাম লেখা হয়েছিল, ‘‌উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার চক্রান্তকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে: নাজিম উদ্দিনের বক্তৃতায় প্রদেশব্যাপী বিক্ষোভ।’ নাজিম উদ্দিনের বিবৃতির প্রতিবাদ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের ঢাকা কেন্দ্রের আহ্বায়ক মাহফুজুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক শাহাবুদ্দীন খালেক সংবাদপত্রে যে বিবৃতি দেন তাও ওই সংখ্যা সৈনিকে প্রকাশ হয়।

সৈনিক পত্রিকার এ অবস্থানের ফলে সরকারের কোপানলে পড়ে পত্রিকাটি। সরকার প্রফেসর আবুল কাসেম ও আবদুল গফুরকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়। ফলে ২৩ ফেব্রুয়ারি সৈনিক অফিস তথা প্রফেসর আবুল কাসেমের বাসভবন ঘেরাও করে পুলিশ। প্রফেসর আবুল কাসেম সে রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি ও সৈনিক সম্পাদক রাতের অন্ধকারে ১৯ নম্বর বাসার পেছনে গভীর কূপের ভেতর দিয়ে দেয়াল টপকে শেখ সাহেব বাজারের মধ্য দিয়ে পলায়ন করি। আমাদের অনেকের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। গ্রেফতার এড়ানোর জন্য নুরুল ইসলাম নামে ঢাকার এক ডাক্তারের বাসায় কিছুদিন গোপনে অবস্থান করি এবং পরে ময়মনসিংহে গিয়ে আশ্রয় নিই।’

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে এবং কয়েকজন শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিকের শহীদ সংখ্যা। লাল কালিতে ও লাল বর্ডার দিয়ে প্রকাশিত এ সংখ্যায় খবরের উল্লেখযোগ্য শিরোনামগুলো ছিল ‘‌শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্রসমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ। বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত, ৩ শতাধিক আহত, ৬২ জন গ্রেপ্তার, শুক্রবারেও বহুসংখ্যক লোক হতাহত, রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ বিঘোষিত।’

তমদ্দুন মজলিস যে আদর্শবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলে, তার প্রধান মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক সৈনিকে যেমন বিভিন্ন সমস্যা কোনো রাখঢাক না করে তুলে ধরা হতো, তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ঘটনারও বলিষ্ঠ বিশ্লেষণ থাকত। সৈনিকে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় যেমন থাকত সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদকবলিত সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের আহ্বান, তেমনি অসাম্য-বৈষম্য কণ্টকিত সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামের হারিয়ে যাওয়া সাম্য-ভ্রাতৃত্বের আদর্শে কীভাবে আধুনিক বিশ্বে শোষণমুক্ত নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তার রূপরেখা তুলে ধরা হতো। সমগ্র বিংশ শতাব্দী ধরেই চলে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শোষিত, নির্যাতিত মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ সংগ্রামের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় ছিল ইসলামের সাম্য-ভ্রাতৃত্বের হারিয়ে যাওয়া আদর্শের ভিত্তিতে কীভাবে নতুন করে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তার রূপরেখা। ভাষা আন্দোলন যেহেতু সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়, তাই ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সৈনিক পত্রিকাটিও প্রথম সরকারবিরোধী পত্রিকা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচিতি লাভ করে। সরকারবিরোধী দলগুলোর বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড গুরুত্বসহকারে প্রকাশ হতে থাকে এ পত্রিকায়। ওই সময় আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) সম্পাদিত ইত্তেহাদ ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকা ভাষা আন্দোলনকে তেমন সমর্থন করেনি। সৈনিক পত্রিকা বের হওয়ার আগে আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইনসাফ আন্দোলন সমর্থন করত। সিলেট থেকে প্রকাশিত নওবেলাল পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মিল্লাত পত্রিকা ভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিল। পাকিস্তান অবজারভার ও আজাদেও ভাষা আন্দোলনের খবর মাঝেমধ্যে গুরুত্বসহকারে ছাপা হতো।

সাপ্তাহিক সৈনিক ছিল সমকালীন শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব কাগজ। সাপ্তাহিক সৈনিকের মাস্টটি এঁকে দেন খ্যাতনামা শিল্পী কামরুল হাসান। বিখ্যাত কার্টুনিস্ট দোপেয়াজা (কাজী আবুল কাসেম) সৈনিকে বিভিন্ন সমসাময়িক প্রশ্নে নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সৈনিকের প্রকাশনা ১৯৫৮-এর পর থেকে অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭০ সালে দেশে স্বাধিকার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সৈনিক নব পর্যায়ে পুনঃপ্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট থেকে নব পর্যায়ে সৈনিকের আত্মপ্রকাশে শুভেচ্ছা বাণী দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট এএসএম মোফাখখর, আবুল মনসুর আহমদ, পীর মোহসীন উদ্দিন আহমদ (দুদু মিয়া) ও আরো অনেকে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত সৈনিকে নব পর্যায়ের প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। ২৫ মার্চের ক্র‍্যাকডাউনের সময় সৈনিকের ম্যানেজার নুরুর রহমান জামালীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ফলে সৈনিকের প্রকাশনা পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে তমদ্দুন মজলিস পুনরায় সাপ্তাহিক সৈনিক প্রকাশ করে। এ পর্যায়ে মুদ্রাকর ও প্রকাশক ছিলেন মোহাম্মদ আবদুল গফুর। সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন চৌধুরী হাশমতুল্লাহ। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে অল্পদিন পর পুনরায় সৈনিক বন্ধ হয়ে যায়।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান। সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান