১৯৭৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, ‘দুই বছর আগে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেছেন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো। ৫ দিনের ভারত সফর শেষে টিটো ও তার স্ত্রী গতকাল ঢাকা পৌঁছেছেন। তাদের স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদউল্লাহ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। শহরের পথে পথে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।

‘ঢাকার কর্মকর্তারা বলেছেন, যুগোস্লাভিয়া বাংলাদেশের পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহী। এবং এ বিষয়ে মার্শাল টিটো প্রধানমন্ত্রী মুজিবুরের সঙ্গে আলোচনা করবেন।’

১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গিয়েছিলেন যুগোস্লাভিয়া সফরে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেদিনের সেই ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়া আমাদের সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছিল।...বঙ্গবন্ধু যুগোস্লাভিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সফরসঙ্গী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেখেছি যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো প্রটোকল ভঙ্গ করে বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কারণ, সেদিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর মার্শাল টিটো প্রেসিডেন্ট।’

স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম যে কয়টি ইউরোপীয় দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার মধ্যে তত্কালীন সোস্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়া অন্যতম। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি যুগোস্লাভিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল যুগোস্লাভিয়ার সরকার। ১৯৭২ সালের মে মাসে বাংলাদেশ বেলগ্রেডে দূতাবাস স্থাপন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে যুগোস্লাভিয়া সফর করেছিলেন।

১৯৭৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন সোস্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ ব্রজ টিটো, যিনি মার্শাল টিটো নামে খ্যাত, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সফর করেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট জোসেফ ব্রজ টিটোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বেশকিছু বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তাদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সম্পর্ক। এ দুই বিশ্বনেতা ছিলেন জোটনিরপেক্ষ নীতির সমর্থক। এবারের আলোচনায়ও তারা এ নীতির গুরুত্বের প্রতি নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও এ দুই নেতার মতামত ছিল কাছাকাছি। তারা একমত হয়েছিলেন যে বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অনেক হুমকি রয়েছে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক নীতির প্রয়োগ ও মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও অব্যাহত আছে।

এ রকম বিশ্ব পরিস্থিতিতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে নতুন নতুন দেশের যুক্ত হওয়ার ঘটনায় তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর চতুর্থ সম্মেলনে নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু ও জোসেফ টিটো তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি করতে অধিকতর পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে তারা জোর দেন। সদস্য দেশগুলোর একটি সভা ডাকার ব্যাপারেও তারা একমত হন।

বঙ্গবন্ধু দক্ষিণ এশিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জোসেফ টিটোকে অবহিত করেন। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে তার সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথাও বঙ্গবন্ধু তাকে জানান।

প্রেসিডেন্ট টিটো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকাণ্ড এবং উপমহাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে তার ভূমিকার প্রশংসা করেন।

এ সফরে ১৯৭৪ সালের ৩১ জানুয়ারি যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ভাষণ দেন। জোসেফ টিটো সেদিন তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে খুব বেশিদিন হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের দুদেশের মধ্যে আন্তরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা আপনাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেছি। আপনারা স্বাধীনতার জন্য যে বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার জন্য আমরা আপনাদের প্রতি দরদ অনুভব করি। স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধের ক্ষত ও ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আপনাদের প্রচেষ্টার প্রতিও আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

জোসেফ টিটো সেদিন আরো বলেছিলেন, স্বাধিকার ও সমতার জন্য সংগ্রাম এবং সব দেশ ও গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে।

৩০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট টিটোর সম্মানে এক প্রীতিভোজের আয়োজন করেন। ভোজে জোসেফ টিটো ও তার সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানিয়ে দেয়া বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, আপনার (মার্শাল টিটো) এ সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে আপনার প্রথম সফর। বলাই বাহুল্য, বিশেষত আপনার উপস্থিতিতে, যে দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসনের পর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের জনগণ কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়াল ছুড়ে ফেলেননি, তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাদের ইচ্ছা ও প্রেরণা অনুসারে একটি শোষণমুক্ত নতুন সমাজ গঠনের প্রথম পদক্ষেপও নিয়ে ফেলেছেন।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যুগোস্লাভিয়ার জনগণ ও সরকারের বস্তুগত ও নৈতিক সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। পাকিস্তানের ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে তাঁর জীবন রক্ষায় অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আওয়াজ তোলায় প্রেসিডেন্ট টিটোকে ধন্যবাদ জানান বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি মার্শাল টিটোর আস্থার নিদর্শন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে তার মন্তব্যেও পাওয়া যায়, ‘৭ মার্চের ভাষণের তাত্পর্য হচ্ছে, এ ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব প্রমাণ করেছেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের কোনো রকম বৈধতা নেই। পূর্ব পাকিস্তান আসলে বাংলাদেশ।’ বঙ্গবন্ধুর প্রতি ইউরোপীয় মানুষ মার্শাল টিটোর এ শ্রদ্ধার কারণটি ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে কিছুটা বোঝা যায় বৈকি। মার্শাল টিটো নিজেই ছিলেন বিপ্লবী নেতা। ১৯১৭ সালে দুনিয়া কাঁপানো রুশ বলশেভিক বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর যুগোস্লাভিয়ায় ফিরে তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টি অব যুগোস্লাভিয়ায়। একসময় তিনি লিগ অব কমিউনিস্টস অব যুগোস্লাভিয়ার সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্শাল টিটো নািস আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেন। যুগোস্লাভিয়াকে নািসদের দখল থেকে মুক্ত করতে পরিচালিত গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন তিনি। যুগোস্লাভ রেজিটেন্স নামে পরিচিত এ বাহিনী নািসদের বিরুদ্ধে ইউরোপের সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হিসেবে প্রশংসিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল টিটো সোস্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়া গঠনের মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হন এবং আজীবন এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিজে সমাজতন্ত্রী, রুশ বিপ্লবের অংশগ্রহণকারী হয়েও তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের হেজিমোনিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর কেন্দ্র কমিনফর্ম গঠনে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু মার্শাল টিটোই প্রথম কমিনফর্ম সদস্য, যিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য মানতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সোভিয়েত সুপ্রিমো জোসেফ স্ট্যালিনের সময়কালের একমাত্র নেতা, যিনি কমিনফর্ম ত্যাগ করেন। তিনি যুগোস্লাভিয়ার স্বতন্ত্র অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে দেশটিতে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি এগিয়ে নেন। জোসেফ টিটো যুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার জটিল সম্পর্ক ও উত্তেজনাকে সফলভাবে সামলেছিলেন। জীবদ্দশায় মার্শাল টিটো যুগোস্লাভিয়া এবং বৈশ্বিক পরিসরে দারুণ জনপ্রিয় পাবলিক ফিগার ছিলেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবেও তিনি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

জাতি, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং মানুষের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি মতাদর্শিক দায়বদ্ধতাই হয়তো মার্শাল টিটোকে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্বের প্রতি আকর্ষিত করেছিল। যতবারই সুযোগ, সাক্ষাৎ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জ্ঞাপনে কার্পণ্য করেননি মার্শাল টিটো।

তথ্যসূত্র: যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট ইন বাংলাদেশ, এ কে এম আতিকুর রহমান, ডেইলি সান

যে দল জন্মেছিল স্বাধীনতা আনবে বলে, তোফায়েল আহমেদ, দৈনিক যুগান্তর

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক