বাংলাদেশের অন্যতম গর্বের খাত পোশাক শিল্প। বৈদেশিক মুদ্রা আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৃহৎসংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারীর স্বনির্ভরতা, জীবনযাপনের মান পরিবর্তন—এ সবকিছুর পেছনের যোগ্য অনুঘটক দেশের তৈরি পোশাক খাত। তাই তো করোনা পরিস্থিতিতে সরকারও আগেভাগে ভর্তুকি দিয়ে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ ক্ষতি বা বিপর্যয় সামলানোর কথা ভেবেছে। তাছাড়া পোশাক শিল্পের অংশীজন যারা আছেন, তারা আর কিছু হোক বা না-হোক কায়দা বা বুদ্ধি করে সরকারের কাছ থেকে নিজেদের অংশ নিয়ে আসতে পারেন। আমি জানি না, এত কায়দা ও কৌশল তারা তাদের প্রতিযোগী, বায়ার, ক্রেতাদের সঙ্গে করতে সমর্থ কিনা। যদি হন তাহলে ভালো। যাই হোক, দেশের পোশাক শিল্পের জন্য বড় অস্বস্তির নাম ভিয়েতনাম। রীতিমতো আমাদের কাঁধে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলছে। পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা হা-পিত্যেশ করছেন যে আসছে বছরই হয়তো ভিয়েতনামের কাছে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রফতানিকারকের মুকুট হারাতে হবে বাংলাদেশকে। কেননা ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রফতানি ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমেছে এবং বছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে ভিয়েতনাম। তবে চলমান করোনা পরিস্থিতি এই সব হিসাব-নিকাশই পাল্টে দেবে বোধহয়।

এবার আসল কথায় আসা যাক। পোশাক শিল্পে যে ভিয়েতনামকে প্রতিযোগী ভেবে রীতিমতো আমাদের দিন-রাতের শান্তি নষ্ট হয়, স্বাস্থ্য খাতে ওই একই ভিয়েতনামের কাছে আমরা যে হেরে বসে আছি, তার খোঁজ কি রাখি? 

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভিয়েতনামে করোনা আক্রান্ত দুজন রোগী শনাক্ত হয়। অথচ ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে চীনের উহানে ততদিনে আক্রান্তের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা ১৭০। জানুয়ারি শেষে ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ পর্যন্ত ভিয়েতনামে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০-এ। এর মধ্যে ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য দপ্তর লিফলেট বিতরণ থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনাবিষয়ক সচেতনতা তৈরির জন্য নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছে। প্রাণঘাতী করোনা ঠেকানোর জন্য করণীয় সম্পর্কে ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্মসম্পাদনের একটি রূপরেখা তৈরি করে ফেলে। ভিয়েতনামের জনসংখ্যা ১০ কোটির কাছাকাছি। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। খুব একটা কম নয়। তবুও ভাবা যায়, প্রতি বাড়িতে গিয়ে এভাবে মানুষের সঙ্গে করোনাবিষয়ক সচেতনতা তৈরির প্রচারণা চালিয়েছে তারা! করোনাকে যুদ্ধের সমপর্যায়ে বিবেচনা করে ভিয়েতনাম স্বাস্থ্য দপ্তর শুধু লিফলেট বিতরণ, মাইকিং বা টিভিতে বিজ্ঞাপন প্রচার নয়, সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমরাও যোগাযোগ  করছি, তবে সঠিক সময়ে নয়। মানুষের ভিড়ে করোনা ছড়িয়ে যাওয়ার পরে। তাছাড়া যে দেশগুলোয় করোনা আক্রান্ত মানুষের খোঁজ পাওয়া গেছে, সেসব দেশের তালিকা করে নাগরিকদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও জুড়ে দেয় ভিয়েতনাম। দেশের অভ্যন্তরেও বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে। জানুয়ারির প্রথম দিকেই বন্ধ করে দেয় বিশ্ববিদ্যায়ল, স্কুলগুলো। জাদুঘর, মল বা এ ধরনের জনসমাগমের জায়গাগুলোও ততদিনে বন্ধ ঘোষণা করা হয়ে গেছে তাদের। এভাবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভিয়েতনাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনার বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তার মানে, পোশাক খাতে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কম হলেও ভিয়েতনামের নাগরিকরা উন্নত মানসম্পন্ন পরিচর্যামূলক চিকিৎসার সুব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।

ভিয়েতনামি এক ধনবান নাগরিক ইউরোপের তিনটি দেশ ঘুরে লন্ডন হয়ে দেশে ফেরেন গত ২ মার্চ। বিমানবন্দরে পরীক্ষকদের ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে যান। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে খুঁজে বের করা হয়। তিনি যে বিমানে এসেছিলেন, তার সব যাত্রীকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। তিনি যে রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেসব রাস্তা জীবাণুমুক্ত করা হয়, সে রাস্তার পাশে বসবাসকারী প্রত্যেককে পরীক্ষা করা হয়। অথচ এত সতর্কতার পরও মার্চের শেষ কয়েক দিনে এর প্রকোপ বেড়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছে যায়। দেশটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিদেশফেরত আক্রান্তের পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এই প্রকোপ বৃদ্ধির সংযোগ আছে। কারণ করোনা জনগোষ্ঠীর মধ্যে একবার মিশে গেলে তা বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। তবে সন্দেহভাজনদের পরীক্ষার প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ, কোয়ারেন্টিন, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা—ভিয়েতনামের গড়ে তোলা এ ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভেতর দিয়েও করোনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করাটা কঠিন। তাই তো এখনো চীন কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় অনেক দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মরণঘাতী এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে লড়াইটা ভিয়েতনাম  করছে, তা বাংলাদেশের মতো দেশের কাছে শিক্ষণীয় বৈকি। ডিসেম্বরে কভিড-১৯ বহনকারী শনাক্ত হলেও এখন পর্যন্ত (১১ এপ্রিল) দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫৮। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে ১৪৪ জন, তাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে করোনার বিস্তার, আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও ১০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনামে কভিড-১৯-এর আক্রমণে এখন পর্যন্ত (১১ এপ্রিল) একটিও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

মিরাকল ঘটিয়ে দেখিয়েছে ভিয়েতনাম, যে মিরাকল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, ফান্সের মতো উন্নত দেশগুলোও ঘটাতে সমর্থ হয়নি। কেননা করোনা প্রতিরোধে বড় বড় প্রকল্প, উন্নত অর্থনীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছাড়াও আরো কিছু দরকার হয়। আর তাই তারা সরকারি নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল জায়গা বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি সন্দেহজনক সবাইকে খুঁজে খুঁজে পরীক্ষা করেছে, করছে। পরীক্ষার জন্য ভিয়েতনাম একটা সহজ, কম খরচের কিটও বানিয়েছে। তথ্যমতে, অন্য দেশগুলো তাদের বানানো সেই কিট কিনতে শুরু করেছে। তারা জোর দিচ্ছে সংক্রমিতদের খুঁজে বের করার দিকে। সঙ্গে লকডাউন ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা জোরদার করছে। অথচ আমাদের দেশের চিকিৎসকদের আমরা আক্রান্তের সেবার দিকে ঠেলে দিলেও তাদের ন্যূনতম সুরক্ষা সরঞ্জামের বন্দোবস্ত করিনি। চিকিৎসকদের বরখাস্ত করা হচ্ছে, তবুও তারা কাজে যোগ দিতে রাজি নন। কারণ সবচেয়ে অসহায় অবস্থায়ও মানুষ নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে যেতে চায় না। অথচ আমরা এমন উপায়ে করোনার মতো অসুখ সামলানোর চিন্তা করেছি। ভিয়েতনামে কোয়ারেন্টিনে কাটানো এক ইউরোপীয় নাগরিক সেখানকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছেন, ‘থাকার জন্য এত স্বাচ্ছন্দ্য আর ভালো বন্দোবন্ত আমার বাড়িতে নেই।’ ভিয়েতনাম সরকার ক্ষুদ্র, মাঝারিসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সহযোগিতা করার জন্য আপাতত কর ও জমির খাজনা বাবদ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ থেকে বিরত রয়েছে। নিজের দেশের জন্য প্রয়োজনীয় মজুদ রেখেই আমেরিকায় ৪ লাখ ৫০ হাজার সুরক্ষা স্যুট পাঠিয়েছে তারা। হো চি মিন শহরের স্বাস্থ্য বিভাগ বিমান, ট্রেন, বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি যেভাবে করেই মানুষ আসুক না কেন, তাদের কভিড-১৯-এর পরীক্ষা করছে। প্রতিটি শহরের প্রবেশদ্বারে যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তারা কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোকে ৫ লাখ ৫০ হাজার মাস্ক বিনা মূল্যে সরবরাহ করেছে।

বিপরীতে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার বিষয়গুলো উপেক্ষিত। প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই আমাদের কাছে লকডাউন সবচেয়ে সহজ পথ। রাষ্ট্রীয় ত্রাণ চুরির ঘটনা শুরু হয়ে গেছে। করোনা হেরে গেছে ক্ষুধার কাছে। দেশের সবচেয়ে অসহায়, দিন আনে দিন খায় লোকেরা ভুগছে। আমরা মনে রাখেনি যে চীন, ভিয়েতনাম কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া শুধু লকডাউন করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেনি। আনা যায়ও না। লকডাউনের সঙ্গে প্রয়োজন অতি উন্নত মানের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো। তাছাড়া ইউরোপের যেসব দেশ লকডাউন করেছে, তাদের বেশির ভাগের চিকিৎসা খাত মজবুত। ইতালি ও স্পেন বাদ দিলে বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশেই মৃত্যুহার এক শতাংশের কম-বেশি। আমাদের মনে রাখতে হবে একদিনে চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ব্যাপার। আমরা দেখছি আমাদের দেশের উন্নত বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপৎকালীন পরিস্থিতির হাল ধরতে কতটা ব্যর্থ। শুধু বাংলাদেশ কেন, ভারত বা অন্য দেশগুলো, যারা যত প্রাইভেটনির্ভর, তারা ততটা নাজুক। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রবৃদ্ধি ও উন্নতির বিপরীতে দুর্বল ভঙ্গুর অসহায় স্বাস্থ্য খাতের চিত্র।

লেখক: সাংবাদিক