যে মানুষটি একসময় সংসারের হাল ধরেছেন, কর্মক্ষেত্রে সামলেছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন; হঠাৎ একটি স্ট্রোক বদলে দিতে পারে তার জীবনের গতিপথ। মুহূর্তেই থেমে যেতে পারে স্বাভাবিক চলাফেরা, কথা বলা কিংবা নিজের কাজ নিজে করার সক্ষমতা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শুরু হওয়া লড়াই শেষ পর্যন্ত গড়াতে পারে দীর্ঘ পুনর্বাসন, অনিশ্চিত কর্মজীবন ও আর্থিক টানাপড়েনে।
স্ট্রোকের এমন পরিণতি বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি আলোচিত হলেও কর্মক্ষম বয়সে আক্রান্তদের সংকটও কম নয়। বরং তরুণ বয়সে স্ট্রোক হলে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় পুরো পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। আর যদি ওই তরুণই হন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম, তখন তো আরো ঘোর অন্ধকার! আবার রোগীর পরিচর্যায় পরিবারের অন্য সদস্যকেও কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়াতে হতে পারে। চিকিৎসার ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের চাপ তখন একটি স্বাস্থ্যসংকটকে রূপ দেয় অর্থনৈতিক সংকটে।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের প্রকোপ, ঝুঁকির কারণ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় এ রোগ মোকাবেলার বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, জরুরি চিকিৎসার সীমিত সুযোগ এবং পুনর্বাসনসেবার অপ্রতুলতা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে দেশে তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের হার সাম্প্রতিক সময়ে কতটা বেড়েছে, তা নিশ্চিত করতে বয়সভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
স্ট্রোকের আগে অনেক সময় শরীরে বড় কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায় না। বাইরে থেকে সুস্থ-সবল মনে হওয়া একজন মানুষও হঠাৎ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক ঘটে। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যেতে পারে, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, দৃষ্টিশক্তি বা ভারসাম্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, স্থূলতা, ধূমপান ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, রক্ত জমাট বাঁধার অস্বাভাবিকতা কিংবা রক্তনালির বিশেষ সমস্যার কারণে অপেক্ষাকৃত কম বয়সেও স্ট্রোক হতে পারে।
বাংলাদেশের কর্মব্যস্ত নগরজীবনে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, শরীরচর্চার অভাব ও তামাক সেবনের মতো অভ্যাস জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে এসব অভ্যাসের উপস্থিতি মানেই কারো স্ট্রোক হবে, এমন নয়। ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য, বিদ্যমান রোগ, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
সমস্যা হলো, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো রোগ অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নীরবে শরীরের ক্ষতি করে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো, রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও ওষুধ অনিয়মিত গ্রহণ কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষার কারণে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তরুণ বয়সে বড় কোনো রোগ হবে না—এমন ধারণা থেকেও অনেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যান।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দেয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো গেলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানোর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হতে পারে। ইস্কেমিক স্ট্রোকের কিছু রোগী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রক্ত জমাট ভাঙার ওষুধ কিংবা বিশেষ পদ্ধতিতে জমাট অপসারণের চিকিৎসা পেতে পারেন। তবে এসব চিকিৎসার উপযোগিতা নির্ধারণে দ্রুত পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এ জরুরি সেবা সব অঞ্চলে সমানভাবে সহজলভ্য নয়। রাজধানী ও বড় শহরের কিছু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগীকে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হতে পারে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একটি পরিবারের জন্য এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয়াও কঠিন। কোন হাসপাতালে নিতে হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আছে কিনা, কীভাবে যাওয়া যাবে এবং অর্থের ব্যবস্থা কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েও মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। আবার রোগীর লক্ষণকে সাধারণ দুর্বলতা বা সাময়িক অসুস্থতা মনে করলেও চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তাই অত্যন্ত জরুরি। আর সেটি মনে রাখার সহজ উপায় হলো ‘FAST’ পদ্ধতি। F—Face (মুখ): রোগীর মুখের একপাশ কি বেঁকে যাচ্ছে? তাকে হাসতে বলুন। A—Arms (হাত): একটি হাত কি নিচে নেমে যাচ্ছে কিংবা তুলতে পারছেন না? তাই দুই হাত ওপরে তুলতে বলুন। S—Speech (কথা): কথা কি জড়িয়ে যাচ্ছে কিংবা অস্পষ্ট শোনাচ্ছে? রোগীকে একটি সহজ বাক্য বলতে বলুন। T—Time (সময়): আগের লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, একটি হাত হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর সেরে গেলেও অবহেলা করা যাবে না। কারণ সাময়িকভাবে উপসর্গ কমে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়।
কোনো রোগী স্ট্রোকের পর বেঁচে ফিরলেও আগের জীবনে ফিরে যাওয়া সব সময় সহজ হয় না। কারো চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়, কেউ কথা বলতে বা খাবার গিলতে সমস্যায় পড়েন, আবার কারও স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। এসব জটিলতা রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ধরা যাক, একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন, অথচ আগের মতো আয় করার সক্ষমতা নেই। পরিবারের সঞ্চয় থেকে প্রথমে চিকিৎসার ব্যয় মেটানো হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় সে সঞ্চয়ও দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের ঋণ করতে হয়, সম্পদ বিক্রি করতে হয় কিংবা কমিয়ে আনতে হয় দৈনন্দিন ব্যয়।
এ সংকট শুধু চিকিৎসার বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর দেখাশোনার জন্য পরিবারের কাউকে সময় দিতে হয়। স্ত্রী, স্বামী, সন্তান কিংবা অন্য কোনো স্বজন নিজের কাজ কমিয়ে দিলে পরিবারের আয় আরো কমতে পারে। ফলে একজনের অসুস্থতা পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
স্ট্রোকের চিকিৎসা শুধু জরুরি অবস্থায় রোগীর জীবন রক্ষার মধ্যেই শেষ হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, বাকচিকিৎসা ও অন্যান্য পুনর্বাসনসেবা প্রয়োজন হয়। এসব সেবার লক্ষ্য হলো রোগীর চলাফেরা, কথা বলা, দৈনন্দিন কাজ এবং যতটা সম্ভব স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে আনা।
পুনর্বাসনসেবার সুযোগ ও ব্যয় যদিও অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা। বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা, বড় শহরে যাতায়াতের প্রয়োজন এবং নিয়মিত চিকিৎসার খরচের কারণে অনেক রোগীর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন না পেলে রোগীর সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
দেশে চিকিৎসাব্যয়ের বড় অংশই পরিবারকে বহন করতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত সঞ্চয়, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা, যাতায়াত ও পুনর্বাসনের সম্মিলিত ব্যয় তৈরি করে বড় ধরনের চাপ।
কর্মক্ষম বয়সে স্ট্রোকের প্রভাব তাই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত ক্ষতির চেয়েও বিস্তৃত। একজন দক্ষ কর্মী দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারলে কর্মক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ব্যবহার কমে যায়। পরিবারের অন্য সদস্যের শ্রমঘণ্টাও ব্যয় হয় তার পরিচর্যার কাজে। জাতীয় পর্যায়ে এমন ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে আরো গবেষণার প্রয়োজন হলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষার কিন্তু সুযোগ নেই।
প্রতি বছর ২৯ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ, জরুরি চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। এবারের বিশ্ব স্ট্রোক দিবস আমাদের অত্যন্ত জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রাণঘাতী এ রোগের ক্ষেত্রে ‘প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান’।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, তামাক পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে ওষুধ।
তবে প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়। স্ট্রোক চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল ও দ্রুত রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন হাসপাতালে কী ধরনের চিকিৎসা পাওয়া যায়, তা নির্ধারণ করে কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে রোগীর সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কেননা কোন বয়সে কত মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন, কোথায় চিকিৎসা পাচ্ছেন, চিকিৎসার ফলাফল কী এবং কতজন দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার শিকার হচ্ছেন—এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি কঠিন। বয়সভিত্তিক রোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসার ফলাফল নিয়মিত নথিবদ্ধ করা গেলে তরুণদের স্ট্রোকের প্রকৃত প্রবণতাও বোঝা সম্ভব হবে।
স্ট্রোকের পর একজন মানুষ কতটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে দ্রুত চিকিৎসা, রোগের তীব্রতা এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের ওপর। সময়মতো সেবা ও যথাযথ সহায়তা পেলে অনেক রোগীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব। সে সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু একটি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং একটি পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা এবং দেশের কর্মক্ষম মানবসম্পদকে সুরক্ষিত রাখারও উদ্যোগ।










