চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বেইজিংয়ে এ বৈঠকের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও চীন। তবে সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ২৫তম ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলন যথেষ্ট জটিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর আল জাজিরা।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। মূলত সম্মেলনটি প্রথমে ব্রাসেলসে দুই দিনের জন্য পরিকল্পনা করা হলেও শি জিনপিং সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস সূত্রে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি সপ্তাহে ঘোষণা দেয়, শি জিন পিং, ভন ডার লেইন, কস্তা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই সম্মেলনকে ঘিরে ইতিবাচক বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো চিয়াকুন একে ‘বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘চীন-ইইউ সম্পর্ক এখন একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।’
তবে গত এক দশকে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়েছে চীন-ইইউ সম্পর্ক। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মতো ইস্যুতে। ২০২১ সালে ইইউ চীনের বিরুদ্ধে শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিম সংখ্যালঘুদের দমন-পীড়নের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জবাবে চীন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যসহ ১০ জন ইউরোপীয় নাগরিক ও কয়েকটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ওপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা দেয়। যদিও চীন সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সদিচ্ছার বার্তা দিয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দ্বন্দ্ব এখনো প্রকট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনকে রাশিয়ার ‘অঘোষিত সমর্থক’ হিসেবে দেখে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় চীন রাশিয়ার জ্বালানী পণ্য কিনে দেশটির অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে বলে অভিযোগ তাদের। ইউরোপ আরো বলছে, চীন রাশিয়াকে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’পণ্য দিচ্ছে, যেগুলো সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য।
সম্প্রতি রাশিয়ায় পণ্য সরবরাহের অভিযোগে চীনা দুটি ব্যাংক ও পাঁচটি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইইউ। জবাবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা চীন-ইইউ অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ‘গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ করবে। সেইসঙ্গে পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বেইজিং।
ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, ‘চীন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে তার কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখে এবং ইইউয়ের অভিযোগকে বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এই মৌলিক মতানৈক্যের কারণে সম্মেলন থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি প্রত্যাশা করা কঠিন।’
ইইউ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চীন ইইউর তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইইউর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দ্বিগুণ হয়ে ৩০৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিয়ে অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করে সেগুলো ইউরোপে কম দামে রফতানি করছে, যার ফলে ইউরোপের শিল্প-কারখানা টিকতে পারছে না।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে চীনের ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ ও দাম কমানোর কৌশল ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এছাড়া চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়েছে রেয়ার আর্থ মিনারেলস এবং চুম্বক, যা ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পের জন্য অত্যাবশ্যক।
অন্যদিকে চীনও ইউরোপীয় ‘ডাম্পিং’ রফতানিকে টার্গেট করে নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে—যার মধ্যে রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, ব্র্যান্ডি ও শুকনো মাংস।
চীনের মতে, ইউরোপ দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য প্রতিহত করতে চায়, অন্যদিকে আবার চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন প্রচেষ্টায় অংশ নিচ্ছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক মার্তা মুচনিক বলেন, ‘ইইউ এই সম্মেলন থেকে বড় কোনো অর্জনের আশা করছে না, তবে তারা চায় চীনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা থাকুক, যাতে ভবিষ্যতের কৌশল নির্ধারণ সহজ হয় এবং নির্ভরশীলতা কমানো যায়।’















