রোববার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশের বাসিন্দা মাতিউল্লাহ শাহাবের। কারণ তার বাড়ি তখন প্রবলভাবে কাঁপছিল। ৬.০ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল পূর্ব আফগানিস্তানে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে হলেও, শাহাবের গ্রাম আসাদাবাদও কেঁপে উঠেছিল। ২৩ জন সদস্যের পরিবারটি ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছিল এই ভয়ে যে, কখন বুঝি মাথার ওপর ছাদ ভেঙে পড়ে! সারা রাত খোলা আকাশের নিচে বাগানে কাটিয়েছিল তারা। মাতিউল্লাহ বলেন, ‘আমরা সবাই খুব ভয়ে ছিলাম।‘

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নানগারহার এবং কুনার প্রদেশ। ভূমিকম্পের কম্পন কাবুল এবং পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদেও অনুভূত হয়েছিল।

ভোর হওয়ার পর, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী মাতিউল্লাহ গাড়ি নিয়ে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, রাস্তায় পাথর পড়ে থাকায় তাকে গাড়ি ছেড়ে দুই ঘণ্টা হেঁটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে হয়েছে।

আন্দারলাচাক গ্রামে পৌঁছে মাতিউল্লাহ দেখেন, চিকিৎসকরা রাস্তায় দাঁড়িয়েই বেশ কিছু শিশুর চিকিৎসা করছেন। দুটি ছোট শিশুকে স্ট্রেচারে শুইয়ে রাখা হয়েছে, তাদের বুক ও মুখে আঘাতের চিহ্ন।

অন্যান্য শিশুদের সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল। শুধু এই গ্রামেই মারা গেছেন ৭৯ জন। মাতিউল্লাহ বলেন, ‘আমি অনেক মৃতদেহ দেখেছি। ১৭ বার আফটারশক অনুভব করেছি।‘

মাতিউল্লাহ স্থানীয়দের অনেক মৃতদেহ কবর দিতে সাহায্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে গ্রামগুলোতে গিয়েছি, সেগুলো সব ধ্বংস হয়ে গেছে।‘

মাতিউল্লাহকে একজন বলেছিলেন, ভূমিকম্পে তার স্ত্রী এবং চার সন্তান মারা গিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। তিনি বলেন, ‘মানুষের মুখ ধুলোয় ঢাকা। সেখানে বিরাজ করছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। অনেকটা রোবটের মতো, কেউ এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারছিল না।‘

রাস্তা বন্ধ থাকায় তালেবান সরকারের উদ্ধার কাজ হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রত্যন্ত, পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় কিছু জায়গা এখনও দুর্গম রয়েছে। এমন খবরও পাওয়া গেছে যে, উদ্ধার কাজের অপেক্ষায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

মাতিউল্লাহ জানান, স্বেচ্ছাসেবীরা আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। তিনি দেখেন, ধ্বংস হওয়া একটি বাড়ি থেকে দু’জন নারীকে উদ্ধার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।‘ উদ্ধার কাজের ছবি তোলার অনুমতি তাকে দেয়া হয়নি। কারণ তালেবান নারীদের ছবি তোলার অনুমতি দেয় না।‘

মাতিউল্লাহ আরো জানান, অনেক বাসিন্দা এখন খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছে এবং তাদের তাঁবুর প্রয়োজন।

কুনারের সোকাই জেলার আরেক বাসিন্দা ইজ্জাতুল্লাহ সফি জানান, ভূমিকম্পে তার বাড়ির কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি শিশু, নারী এবং পশুর চিৎকারে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। ভূমিকম্পটি ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী, রাতটিকে মনে হচ্ছিল ছোটখাটো এক কেয়ামতের মতো! আমার সন্তানরা ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।‘

তিনি বলেন, সকালে সরকারি হেলিকপ্টার এসে আহতদের পাহাড় থেকে কুনারের প্রধান সড়কে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের গাড়িতে করে ক্লিনিকে পাঠানো হয়।

ইজ্জাতুল্লাহ বলেন, ‘এখানে বিরাজ করছে শোকের এক ভারী আবহাওয়া। বিদ্যুৎ নেই, বাজার সারাদিন বন্ধ ছিল। কিছু জায়গা এখনো দুর্গম — পাহাড়ের ৫-৬ ঘণ্টা দূরের গ্রামগুলোতে এখনো পৌঁছানো যায়নি।‘