দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত সময়কাল থেকে মাত্র ৮০ বছর পেরিয়েছি আমরা। সেই যুদ্ধের পর এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল— যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া পাক্স আমেরিকানা বা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। যার ফলে কূটনীতি, সমঝোতা আর মানবিকতা অন্তত কিছু জায়গায় টিকে ছিল। কিন্তু আজ সেই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। আর এই ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে কাশ্মীর থেকে খান ইউনিস, হোদাইদা থেকে পোর্ট সুদান, আর কুরস্ক পর্যন্ত। সর্বত্রই কেবল বোমার আওয়াজ, মৃত্যু আর নৈরাজ্যের সুর।
তবে কী এক নতুন বৈশ্বিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা?
গাজার আকাশে রোজ বোমা পড়ছে। খাদ্য, পানি, ওষুধের প্রবেশপথ রুদ্ধ। ইসরায়েলের ডানপন্থী নেতারা ঘোষণা দিচ্ছে: ‘আর ছয় মাসের মধ্যে গাজা ধ্বংস হয়ে যাবে, হামাস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া— একের পর এক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান থামার নাম নিচ্ছে না; মৃতের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায়, কাশ্মীর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু ক্ষমতা নিয়ে মুখোমুখি। অথচ আন্তর্জাতিক মহল প্রায় নীরব। মানবিক আদালত, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার— এদের বাধ্যবাধকতা আজ যেন বালিতে আঁকা দাগ। একের পর এক বড় দেশ এগুলোকে উপেক্ষা করে চলেছে, আর আমরা শুধু তাকিয়ে থাকি।
ভারত আর পাকিস্তান, দুটি দেশই পরমাণু অস্ত্রধারী। এর মানে, ছোট কোনো ভুল বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে বিশাল বিপর্যয় ঘটতে পারে। তবুও দুই দেশের যুদ্ধবিমান একে অপরের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো মুহূর্তে ছোট আকারের সংঘর্ষ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে, তার প্রমাণ ইতিহাস বারবার দিয়েছে। আজকের পৃথিবীতে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষ, চীনের উত্থান, রাশিয়ার আগ্রাসন— সবই একসঙ্গে ঘটছে, তখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে তার অভিঘাত শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। যে মুহূর্তে ভারত বা পাকিস্তান বড় ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সেটি সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত করে ফেলবে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইউরোপকেও। কারণ একপাশে থাকবে ভারতের পশ্চিমা মিত্রতা, আরেকপাশে পাকিস্তানের ঐতিহ্যগত চীনা ও মধ্যপ্রাচ্য মিত্রতা।
ভারত এখন আর শুধু সীমান্ত সন্ত্রাসের দায়ে পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করছে না; বরং একে রাষ্ট্রভিত্তিক যুদ্ধ হিসেবে দেখছে। পাকিস্তান, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েও, চীন আর মুসলিম বিশ্বের একাংশের সমর্থনে শক্ত থাকার চেষ্টা করছে।
যদি এই উত্তেজনা বড় রূপ নেয়, তাহলে কেবল লাখো মানুষের মৃত্যু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চিরতরে ভেঙে পড়বে। শরণার্থী সংকট, বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক জোটগুলোর ভাঙন— সবকিছু একসঙ্গে ঘনিয়ে আসবে। কাশ্মীরের একটি ভুল ধাপ থেকে যে আতঙ্কিত বার্তা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা আমাদের সবার বোঝা উচিত।
প্রখ্যাত নীতি বিশ্লেষক ফিওনা হিল বলেছেন, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো শুরু হয়ে গেছে, শুধু আমরা তা স্বীকার করছি না।’ ভারত-পাকিস্তান ইস্যু এর বড় প্রমাণ। যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতি শূন্যে, যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভেতরে বিভক্ত, তখন এ দুই দেশের মধ্যে একটি মাত্র ভুল পদক্ষেপ সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারে। আরো ভয়ংকর হলো, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো শক্তিশালী নেতৃত্ব নেই। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন নিজেই বলেছেন, ‘আমরা যে আস্থা গড়েছিলাম, তা ভেঙে গেছে। আজ দেশগুলো আমাদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, নিজেদের মতো করে নতুন পথ তৈরি করছে।’
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাম আমরা হয়তো এখনো দিইনি, কিন্তু এর ছায়া এরই মধ্যে আমাদের ঘিরে ধরেছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ সেই ছায়ার সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ। বিশ্বকে, দক্ষিণ এশিয়াকে এখনই এ সংঘর্ষের বিপরীতে দাঁড়াতে হবে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অবলম্বনে।















