বুকে ব্যথা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন আব্দুল সোবহান। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। ডাক্তার হার্টে কিছুটা সমস্যাও পেলেন। তারপর ব্যবস্থাপত্রে লিখলেন, ওজন কমাতে হবে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান ধারণ করতে না পেরে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন সিঁথি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগেই ডাক্তার শরীরের ওজন কমানোর কথা বললেন।
ওজনাধিক্য বা স্থূলতা নিয়ে এমন পরিস্থিতি শোনা যাচ্ছে ঘরে ঘরেই। এমনকি শিশু-কিশোরদের মধ্যেও বেড়েছে স্থূলতার প্রবণতা। নিজেদের সুস্থ রাখতে ডাক্তাররা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন নিয়মিত।
বর্তমানে স্থূলতা ক্রমবর্ধমান এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ১৯৭৫ সালের পরে বিশ্বে স্থূলতার হার বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে এবং ২০১৬ সালে বিশ্বে যে ১৯০ কোটি মানুষের ওজন অতিরিক্ত ছিল, তাদের মধ্যে ৬৫ কোটি মানুষের ছিল স্থূলতা। অনেকে তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থূলতার মহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
স্থূলতার নানা রকম সংজ্ঞা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে জেনারালাইজ ওবেসিটি। অনেকেই আছেন যারা সাধারণভাবে দেখতেই বেশ মোটা। সেটা একধরনের স্থূলতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ‘জেনারালাইজ ওবেসিটি মাপা যায় বিএমআই দিয়ে। কিন্তু হার্টের রোগ বা অন্যান্য রোগের সঙ্গে যেটা সম্পর্কযুক্ত সেটা হলো সেন্ট্রাল ওবেসিটি। এ ধরনের স্থূলতার ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের দেখতে বেশি মোটা মনে হয় না। কিন্তু উদরের তলদেশে যে চর্বি জমে সেটা বেশি খারাপ। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় সেন্ট্রাল ওবেসিটি। এ মেদটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর রায়ায়নিক পদার্থ তৈরি করে। যা থেকে হার্ট ডিজিজ ও অন্যান্য রোগ হয়।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমাদের সাবকন্টিনেন্টের মানুষ যারা অন্যান্য দেশে মাইগ্রেট করেছে, তাদের মধ্যেও দ্রুত হারে বাড়ছে সেন্ট্রাল ওবেসিটি।’ লক্ষ্ণৌ গবেষকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একই চেহারার আমাদের দেশের একজন ও তার মতো চেহারারই অন্য দেশের আরেকজনের পেটের সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে আমাদের দেশের মানুষের পেটে চর্বি বেশি।
স্থূলতাকে বলা হয় ‘মাদার অব মেনি ডিজিজ’। এমনকি এটি নিজেও একটি রোগ। দেশে স্থূলতা বেড়ে যাওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জীবন আমাদের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে। তাতেই এর প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে হু হু করে। লিয়াকত আলী বলেন, ‘এর আগে আমাদের যে খাদ্যাভ্যাস ছিল এবং তার সঙ্গে যে শারীরিক পরিশ্রম ছিল সেগুলো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। এখন খুব দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। এর কারণে খাদ্য ও জীবনাচরণে যত প্রভাব বাড়ছে তত বেশি মানুষের সেন্ট্রাল ওবেসিটি প্রকাশিত হচ্ছে এবং আশঙ্কাজনক হারে আমাদের স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্থূলতা বেশি দেখা যাচ্ছে শিশু ও নারীদের মধ্যে। আগে ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলত। এখনকার শিশুদের মধ্যে বসে থাকার প্রবণতা বেশি এবং খেলাধুলার অভাব রয়েছে। আগে স্কুলগুলোতে যেভাবে পিটি প্যারেড করা হতো এখন তা হয় না। এসব কারণে আমার কায়িক শ্রমবিহীন জীবনের দিকে চলে যাচ্ছি। এখন ফাস্টফুড বা এ ধরনের জীবনযাপনকে দেখা হচ্ছে স্ট্যাটাস হিসেবে। সন্তানকে ট্যাব কিনে দেয়া এখন একটি স্ট্যাটাস। নারীদের মধ্যেও এখনকার সময়ে স্থূলতা বেড়েছে মারাত্মক হারে। ছেলেরা তো তাও বাইরে কাজকর্ম করছে। কিন্তু আধুনিক নানা যন্ত্রপাতি এসে মেয়েদের কাজ কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি সিরিয়াল কালচার এবং টেলিভিশনের জন্য এ পরিস্থিতি অ্যালার্মিং হারে বেড়েছে।’
ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে বাড়ছে স্থূলতা। তাই এ সমস্যা সমাধানে সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জীবনকে আরেকটু পরিকল্পিত করলে নিজেকে সুস্থ রাখা সম্ভব হবে আরো বেশি। এ চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলেন, ‘স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সামনে অনেক বিপদ। আমাদের কিন্তু কালচারালি অনেক সুযোগ আছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। নগর পরিকল্পনাও সেভাবে সাজাতে হবে। খাবারে কীভাবে লবণ কমাবেন, জাঙ্কফুড কমাবেন সেসব পরিকল্পনা করতে হবে।’
সমস্যা এড়াতে বেশকিছু সমাধান জানান তিনি, স্থূলতা কমাতে হলে স্কুলের অনুমোদন দিতে গেলেই দেখতে হবে ইনডোর-আউটডোর খেলার ব্যবস্থা আছে কিনা। টিফিন পিরিয়েড কেউ যেন রুমে বসে না থাকে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। টিফিনে ক্ষতিকর ফাস্টফুড দেয়া যাবে না। আগেকার শিশুরা টিফিন আওয়ারে দাপিয়ে বেড়াত, পিটি প্যারেড হতো। এটাও যে পড়াশোনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে হবে সবাইকে। সুস্থ একটি শহরে ফুটপাতে হাঁটার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু ব্যবস্থা থাকলেই হবে না, মানুষজনকে উৎসাহিত করতে হবে এক বা আধা কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়ার জন্য, তিনতলা পর্যন্ত অসুস্থ না হলে লিফট ব্যবহারে অনুৎসাহিত করতে হবে। চাকরিজীবীরা অফিস সময়ের মধ্যেই কীভাবে একটু নড়াচড়া করতে পারে তা মাথায় রাখতে হবে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনও কমাতে হবে ছেলে-বড় সবার।
ট্যাক্স আরোপও একটি পদ্ধতি হতে পারে। লবণ, কোল্ড ড্রিংকের মতো খাবারে কর আরোপ করলে আয় বেশি হবে তা নয়, বরং সবাই বুঝবে যে এটা খারাপ। বইয়ে এখনো শুধু হাত ধোয়ার, দাঁত মাজার মতো গতানুগতিক কথা আছে, সেখানে খেলা কেন জরুরি, ওজন কেন বাড়াবে না এ বিষয়গুলো যুক্ত করতে হবে। স্থূলতা এখন একটি মাল্টিসেক্টরাল ইস্যু। কিছু রোগ একবার হয়ে সেরে গেল সেটা আলাদা, কিন্তু এমন জীবনব্যাপী কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হলে জীবনে সেটার অনেক প্রভাব রয়েছে। তাই তা নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সতর্ক হতেই হবে।










