ইকুয়েডরের উপকূল থেকে শত শত মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে গ্যালাপাগোস নামের দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান। এখান থেকেই বিখ্যাত বিবর্তন তত্ত্বের ধারণা পেয়েছিলেন চার্লস ডারউইন। সেই দ্বীপেই এখন ঘটছে এমন এক ঘটনা, যা দেখে বিজ্ঞানীরাও হতবাক। এখানকার এক প্রজাতির টমেটো যেন সময়ের ঘড়ি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে!

২০২৪ সালে গবেষকেরা গ্যালাপাগোসের বুনো টমেটো ‘সোলানাম পেনেলি’ নিয়ে একটি পরীক্ষা শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, টমেটোর তৈরি এক ধরনের প্রাকৃতিক রাসায়নিক ‘অ্যালকালয়েড’ বিশ্লেষণ করা, যা উদ্ভিদকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখতে পান, পশ্চিমের নতুন দ্বীপগুলোর টমেটো এমন যৌগ তৈরি করছে, যা পৃথিবীতে মিলিয়ন বছর ধরে আর কোনো টমেটো তৈরি করছে না।

গবেষকেরা পরে পূর্বাঞ্চলের পুরোনো দ্বীপগুলোর টমেটোর সঙ্গে তুলনা করে দেখেন, সেখানে টমেটো আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধরে রেখেছে। অর্থাৎ নতুন দ্বীপের টমেটোরা পিছিয়ে পড়েনি, বরং এরা বিবর্তন চক্রের উল্টো পথে হাঁটছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন এক ধরনের ‘বিপরীত বিবর্তন’!

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব-রসায়নবিদ অ্যাডাম জোজভিয়াক বলেন, ‘এমন উল্টো বিবর্তন খুবই বিরল। হয়তো পরিবেশগত চাপে এসব টমেটোকে পুরোনো জিনে ফিরতে হয়েছে।’ গত জুন মাসে নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।

বিজ্ঞানীরা ৩০টিরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন, পশ্চিমের এ টমেটোগুলোর অণু কাঠামো আশ্চর্যভাবে বেগুনের মতো! আধুনিক টমেটো যেসব জিন হারিয়ে ফেলেছিল, এ টমেটো সেগুলো ফিরিয়ে এনেছে। ফলে উদ্ভিদটি আবার সেই প্রাচীন অ্যালকালয়েড তৈরি করছে, যা একসময় এদের পূর্বপুরুষরা করত।

এ পরিবর্তনের কারণ জানার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। অনুমান করা হচ্ছে, নবীন দ্বীপগুলোর অনুর্বর মাটি আর কঠোর আবহাওয়া টমেটোকে বাধ্য করেছে প্রাচীন প্রতিরক্ষা কৌশলে ফিরতে। গবেষকরা তামাক গাছেও একই জিন পরিবর্তন ঘটিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন, যাতে বোঝা যায় কিভাবে এ পুরনো যৌগগুলো আবার সক্রিয় হলো।

এ গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভিদের প্রাচীন জিন ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া যদি বের করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই কৌশল কাজে লাগিয়ে আরো শক্তিশালী ফসল, প্রাকৃতিক কীটনাশক, এমনকি ওষুধ তৈরি করাও সম্ভব হতে পারে।

করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ অনুরাগ আগরওয়াল বলেন, বিবর্তন কখনো সরলরেখায় চলে না, বরং অনেক সময় ঘুরে যায়, পেছনেও ফেরে। তার মতে, উড়ন্ত পাখি থেকে যেমন হাঁস-মুরগির মতো উড়তে না-পারা প্রজাতির জন্ম হয়েছে, কিংবা স্থলজ প্রাণী থেকে আবার সমুদ্রে ফেরা তিমি– এর সবই প্রকৃতির ‘টিংকারিং’ প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে, ইউসি সান্তা ক্রুজের অধ্যাপকের মতে, বিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট দিকে যায় না, এটি এলোমেলো। সময়ের সঙ্গে অপ্রচলিত জিনের বৈশিষ্ট্য আবার ফিরে আসতেই পারে।

তবে গবেষক অ্যাডাম জোজউয়াক ভবিষ্যতে আরো গবেষণার মাধ্যমে এ টমেটোর অদ্ভুত পরিবর্তনের কারণ এবং এর সুদূরপ্রসারী সুবিধাগুলো জানা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী।

আধুনিক কৃষি গবেষকরা এ টমেটোগুলোর ঘটনাকে বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায় বলছেন। কারণ এরা প্রমাণ করছে, বিবর্তন সব সময় সামনে এগোয় না, পরিস্থিতি চাইলে অনেক সময় সে পেছনেও ফিরে যেতে পারে।

—সিএনএন