সিরিয়া ও লেবাননের ‘হারিসা’ মোগলদের রান্নাঘরে ঢুকে আমূল বদলে গিয়েছিল। প্রাচ্যের মসলা মিশে ‘হারিসা’ হয়ে উঠেছিল বিখ্যাত মোগলাই হালিম! মোগলদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে আসে পোলাও, বিরিয়ানি, কোফতা, সিঙাড়া, হালিম, সমুচা ইত্যাদি।
৩৩১ বছরের শাসন শেষে ভারতে মোগল শাসনের অবসান হলেও তাদের সৃষ্টি-কৃষ্টি-সংস্কৃতি আজো আগ্রা-দিল্লি ও ঢাকায় স্বমহিমায় টিকে আছে, বিশেষ করে খাবারদাবারে মোগলাই ভাব এখনো ষোলো আনাই রয়ে গেছে। এর প্রমাণ মেলে প্রতি বছর রমজান মাসে। রোজা আসলেই পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা সাজিয়ে বসেন মোগলাই খাবারের পসরা। বাঙালির ঈদের রসনাবিলাসেরও একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকে মোগল দস্তরখানার নানান আইটেম।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছে মোগল খাবার। কেবল স্বাদেই নয়, ঘ্রাণেও অনন্য ছিল তাদের খাবার। জানা যায়, সম্রাট শাহজাহানের বাবুর্চিখানায় একশ রকমের বিরিয়ানি রান্না হতো। তবে ইফতারের সময়ে ঠিক কোন ধরনের বিরিয়ানি খাওয়া হত তার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়নি কোনো গবেষণায়।
শুধু মসলাদার খাবার নয়, এপার এবং ওপার বাংলার রন্ধনশৈলীর বিবিধ মিষ্টি তৈরিতেও মুঘলদের অবদান রয়েছে। আজকাল ইফতারিতে জিলাপি ছাড়া চলেই না। ইফতারে ছোলা মুড়ির সঙ্গে জিলাপি মাখা হবে নাকি আলাদা রাখা হবে তা নিয়ে অনলাইন অফলাইনে চলে অম্ল-মধুর বিতর্কও। অর্থাৎ ইফতারের অন্যতম প্রধান আইটেম এটি। সেই জিলাপির প্রবর্তনও হয়েছিল মোগল আমলেই।
ভারতবর্ষে রোজার মাসকে উৎসবের পরশ দিয়েছিল মোগলরাই। পবিত্র মাস রমজানকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে ইফতারের খাবারদাবারে দস্তরখানাকে স্বাদে-গন্ধে, বৈচিত্রে ভরিয়ে তুলেছিল তারাই। সেই পরম্পরাই দিল্লি থেকে লখনউ ও হায়দরাবাদের নবাবদের দরবার ঘুরে এসে ঠেকেছে বাংলায়।
মির্জা নাথান এবং হাকিম হাবিবুর রহমানের বর্ণনায় বাংলায় ইফতারের সময়ে নবাবি খানাপিনার কথা জানা যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল তরমুজের শরবত, তন্দুরি ও নান রুটি, বহু রকমের কাবাব, বিরিয়ানি, কোর্মা, কফ্তা আর হালিম। সেই সঙ্গে জিলিপি, নিমকপারা ও সমুচার মতো কিছু খাবার।
শবেবরাতের পর থেকেই রোজার ইফতার এবং সেহেরির জন্য দিন গোনা শুরু হয়ে যেত মোগলদের জমানায়। রমজান মাস শুরু হওয়ার প্রাক সন্ধ্যায় বাহাদুর শাহ জাফর হাতি নিয়ে বের হতেন চাঁদ দেখতে।
আকাশে রমজান মানের চাঁদ দেখা গেলে কামান থেকে তোপ ছুড়ে কিংবা শূন্যে গুলি করে রমজান মাসের আগমনী বার্তা জানান দেয়া হত। বাংলায় মুর্শিদাবাদের নবাবরাও তোপ-কামান দেগে রমজানের ঘোষণা করতেন। সেই সঙ্গে রমজানে বাহারি ইফতারের আয়োজন হতো মোগল হেঁসেলে।
তন্দুরি ও নান রুটি ছিল অনেক রকমের। বিভিন্ন ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি করা সুস্বাদু ও সুগন্ধী তাফতান। মুঘলদের রান্নাঘর অনুকরণ করেই বাংলায় এসেছিল বিখ্যাত শিরমাল। এখনো পুরান ঢাকার জনপ্রিয় খাবার এটি। সুজি দিয়ে তৈরি হয় শিরমাল। অনেকেই ইফতার ও সেহেরিতে শিরমাল খেতে পছন্দ করেন।
যদিও শোনা যায় শিরমালের জন্ম ইরানে, মোগলরাই এ অঞ্চলে তা নিয়ে এসেছিল। এতে কেশরও ব্যবহার করা হয়। মোগলরা কাবাব দিয়ে শিরমাল খেতেন।
কাবাবের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ছিল পারসান্দের শিক কাবাব। ভাল ও নরম গোশতের খান ১০-১২ টুকরো দিয়ে কাঠ কয়লার আগুনে পুড়িয়ে এই কাবার তৈরি করা হত। পরবর্তী সময়ে এই কাবাবকে সুলতানি কাবাবও বলা হত। এ ছাড়া ইফতারে খাওয়া হত শামি কাবাব, টিক্কা কাবাব, হান্ডি কাবাব, তাশ কাবাবও। এখনো পুরান ঢাকার চকবাজারে গেলে দেখা মিলবে মোগল রেসিপির নানান কাবাবের পসরা।
চাপাতিস, ফুলকাস, পরাটা, রুগনি রুটি, বিরি রুটি, বেসানি রুটি, খামিরি রুটি, নান, শিরমাল, গাভ দিদা, গাভ জাবান, কুলচা, বাকর খানি, গাউসি রুটি, বাদাম রুটি, পেস্তা রুটি, চালের রুটি, গাজর নান খাতাই, মিসরি রুটি, নান পাম্বা, নান গুলজার, নান কামাশ, নান টুঙ্কি, বাদাম নান খাতাই, পিস্তা নান খাতাই, খেজুর নান খাতাই এগুলো ছিল রুটির বিভিন্ন আইটেম।
পোলাও এরও ছিল বাহারি পদ- ইয়াখনি পুলাও, মতি পুলাও, নূর মাহালি পোলাও, নুকতি পোলাও, কিসমিস পোলাও, নার্গিস পোলাও, জামুরদি পোলাও, লাল পোলাও, মুজাফ্ফর পোলাও, ফলসাই পোলাও, আবি পোলাও, সুনেহরি পোলাও, রুপালি পোলাও, মুরগি পোলাও, কোফতা পোলাও, বিরিয়ানি পোলাও, চুলাভ, আস্ত ছাগল পোলাও, বুট পুলাও, শোলা, খিচুরি, কাবুলি, তেহারি, মুতঞ্জন।
এছাড়া মিষ্টি আইটেমের মধ্যে ছিল - জর্দা মুজাফফর, সেবাই, মান ও সালওয়া, ফিরনি, ক্ষীর, বাদাম ক্ষীর, কুমড়ার ক্ষীর, গাজরের ক্ষীর, কাংনি ক্ষীর, ইয়াকুটি, নমিশ, দুধের ডালমা, বাদাম ডালমা, সামোছা, শাক, খাজলে।
মজার বিষয় হলো, মোগল খাবারের তালিকায় ছিল সবজিও। বেগুন ভর্তা, আলু। ছোলা ভর্তা, ছোলার ডাল ভর্তা, আলুর ডাল, বেগুনের ডাল, করলা ডাল, এসব ডাল - এসবও ছিল কোনো কোনো মোগল বাদশাহর খাবারের মেন্যুতে।
১৮৫৭ সালে অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী ব্রিটিশবিরোধী প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয়দের পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সিলমোহর পড়ে। ওই যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের মিয়ানমারের রেঙ্গুনে নির্বাসনের মধ্য দিয়ে ভারতে মোগল শাসনের অবসান হয়। দীর্ঘ তিন শতকের শাসনের অবসানের পরও মোগল কৃষ্টি-কালচার টিকে আছে বহাল তবিয়তে, বিশেষ করে বাঙালির খাদ্যাব্যাসে মোগল প্রভাব বরাবরই বাড়াবাড়ি রকমের বেশি।










